কারাগারের রাতদিন

রিয়াজ মোরশেদ সায়েম »

কারাগারের দেয়ালগুলো ধূসর। স্যাঁতসেঁতে গন্ধে ভরা। ওপরে ছোট্ট একটি লোহার জালি। সেটা দিয়ে আকাশ দেখা যায় না, শুধু আলো-অন্ধকারের ফারাক বোঝা যায়। দিনের বেলায় আলো একটু উজ্জ্বল, রাতে নিভে আসে। এভাবেই সময় মাপে সামির।
তার বয়স চৌদ্দ। প্রায় এক বছর হলো সে, তার বাবা-মা আর ছোট বোন লায়লাকে এখানে আটকে রাখা হয়েছে। সেই ভোরবেলা, যেদিন হঠাৎ সাঁজোয়া গাড়ির শব্দে কেঁপে উঠেছিল পুরো গ্রাম। সামির এখনো ভুলতে পারেনি। দরজা ভাঙার শব্দ, চিৎকার, ধোঁয়া, আগুনের লেলিহান শিখা। তাদের জলপাই গাছের বাগান পুড়ে গিয়েছিল। দাদার বানানো পাথরের ঘর ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। সবাইকে এক জায়গায় জড়ো করে হাত বেঁধে ট্রাকে তোলা হয়েছিল। তারপর শুধু অন্ধকার।
কারাগারের এই কক্ষে চারজন মানুষ। একটি পরিবার। একটা ছোট্ট কামরার ভেতর আটকে আছে। মা ভাঙা কম্বলের কোণে বসে চুপচাপ তসবিহ গোনেন। বাবা দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকেন, যেন সেখানে লুকিয়ে আছে মুক্তির দরজা। লায়লা মাঝেমধ্যে মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে। আর সামির দেয়ালে নখ দিয়ে দাগ কাটে।
প্রথম মাসে সে গুনেছিল দিন। পরে বুঝল দিন গোনা কঠিন। তাই মাস গোনে। দেয়ালের এক কোণে বারোটি লম্বা দাগ। প্রতি মাসে একটি করে। এখন সেখানে এগারোটি দাগ। আঙুল বুলিয়ে সে ভাবে, এই মাসেই তো রমজান হওয়ার কথা।
রমজান মানেই চাঁদ দেখা। ছাদে উঠে দূরের আকাশে সরু এক ফালি আলো খোঁজা। তার বন্ধু নাফিসের সঙ্গে দাঁড়িয়ে চিৎকার করা-“দেখেছি! দেখেছি!” তারপর মসজিদে তারাবিহ। ইফতারের আগে দৌড়ে গিয়ে আবু সালেম চাচার দোকান থেকে খেজুর আনা। সেসব স্মৃতি এখন কারাগারের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে।
নাফিস কোথায় সে জানে না। সেদিন গ্রাম থেকে আলাদা করে কিছু ছেলেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। হয়তো নাফিসও তাদের মধ্যে ছিল। হয়তো অন্য কোনো কারাগারে। হয়তো আরও দূরে। সামির জানে শুধু একটাই, দখলদার ইজরায়েল বাহিনী তাদের সবাইকে কোথাও আটকে রেখেছে।
রাতে যখন পাহারাদারের বুটের শব্দ দূরে মিলিয়ে যায়, সামির দেয়ালের কোণে বসে ফিসফিস করে।
“আল্লাহ, নাফিসকে তুমি ভালো রেখো।” মা ছেলের এ অসহায় আর্জি শুনে ফেলেন। কাছে এসে বলেন,
“তুই নিজের জন্যও দোয়া কর, বাবা।”
সামির মাথা নাড়ে,
“আমি ঠিক আছি মা। নাফিস একা আছে। নাফিসের কেউ নেই। তোমার মনে নেই মা, গতবার এ শকুনরা এসে নাফিসের মা-বাবাকে মেরে ফেলে!” মা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন।
“আল্লাহ একা কাউকে রাখেন না।”
একদিন সকালে কারাগারের খাবার এল দেরিতে। পাতলা স্যুপ, শুকনো রুটি। বাবা রুটিটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর বললেন,
“যদি আজ থেকে রমজান শুরু হয়?” মা বিস্ময়ে তাকালেন।
“কী করে বুঝব?”
সামির দেয়ালের দিকে এগিয়ে গেল। আঙুল দিয়ে দাগগুলো ছুঁয়ে বলল,
“এগারো মাস পূর্ণ। গত বছর আমরা শাবান মাসে গ্রাম ছাড়লাম। তার পরের মাসেই তো রমজান।” লায়লার চোখ জ্বলে উঠল।
“তাহলে আজ থেকে রোজা?” মা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর ধীরে বললেন,
“হ্যাঁ, আমরা নিয়ত করতে পারি। চাঁদ দেখা না গেলেও আল্লাহ তো জানেন।”
সেদিন ভোরে তারা সবাই চুপচাপ বসে রুটি ভাগ করল। অল্পটুকু স্যুপ। মা বললেন,
“এটাই আমাদের সাহরি।”
সামির মনে মনে নাফিসের কথা ভাবল। হয়তো সে-ও কোথাও রুটি ভাগ করছে। হয়তো সে-ও দেয়ালে দাগ কাটছে।
রোজা রাখার দিনটা দীর্ঘ ছিল। কারাগারের ভেতরে সময় থেমে থাকে, তবু ক্ষুধা থামে না। দুপুরে লায়লা কেঁদেই ফেলল।
“পানি চাই” মা তাকে বুকে টেনে নিলেন।
“আর একটু ধৈর্য, মা। সূর্য ডুবলেই ইফতার।”
সামির চোখ বন্ধ করে কল্পনা করল, সমুদ্রের ওপর লাল সূর্য ডুবে যাচ্ছে। মসজিদের মিনার থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে। সে আর নাফিস পাশাপাশি বসে খেজুর হাতে অপেক্ষা করছে।
হঠাৎ তার মনে হলো, কারাগারের ছোট্ট জালির ফাঁক দিয়ে আজ আলো একটু ভিন্নরকম। হয়তো সূর্য ডুবছে। সে ফিসফিস করে বলল,
“মা, সময় হয়েছে।” তারা চারজন মিলে রুটির ছোট্ট টুকরো ভাগ করল। বাবা দোয়া পড়লেন। কণ্ঠ কাঁপছিল।
“হে আল্লাহ, আমাদের ধৈর্য দাও। যারা অন্যায় করেছে, তাদের হেদায়েত দাও। আমাদের ঘরে ফিরিয়ে দাও।”
মা দীর্ঘ মোনাজাতে ভেঙে পড়লেন। তার কণ্ঠে শুধু কান্না আর প্রার্থনা।
“হে প্রভু, আমাদের জমিন ফিরিয়ে দাও। আমাদের জলপাই গাছগুলো আবার সবুজ করো। আমাদের সন্তানদের মুক্তি দাও।” সামির চোখ বন্ধ করে শুধু একটি নাম বলল,
“নাফিস।”
এভাবে তাদের কারাগারের রমজান কাটে। প্রতিটি সন্ধ্যায় তারা ইফতার করে অল্প খাবার নিয়ে। লায়লা রোজা রাখতে চায়, কিন্তু মা তাকে অর্ধেক দিন রাখতে দেন। বাবা মাঝে মাঝে কারাগারের দেয়ালে হেলান দিয়ে সূরা ইয়াসিন পড়েন। তেলাওয়াতে এক অদ্ভুত শান্তি। পুরোটা পড়তে পারেন না। ইজরায়েলি বাহিনীরা তেলাওয়াত শুনে তেড়ে আসেন। সামিরের বাবাকে কয়েকটা জোরে লাথি মারেন। সামির বাবার ওপর লুটিয়ে পড়েন। কয়েকটা বুটের লাথি তার পিঠেও পড়ে। লায়লা ভয় পায় খুব। তারপর একসময় চুপ হয়ে যায় ওরা। পিঠ যেমন সয়ে যায়, তেমনি।
এক রাতে হঠাৎ পাশের সেল থেকে একজনের কান্নার শব্দ শুনে। গত এগারো মাসে এমন কন্ঠ শোনেনি সে। এতোদিন তারা জানতোই না, তাদের পাশে যে আরও মজলুম বন্দী আছে। সামির জালির ওপর বরাবর কান খাড়া করে। ভাঙা গলায় একটা আওয়াজরে অস্পষ্ট শব্দ আসে,
“আম্মি” সামিরের বুক কেঁপে উঠে। নাফিস? সে জোরে ডাকতে চাইল, কিন্তু ইজরায়েলি জালিম পাহারাদারদের পায়ের শব্দ সামিরের দীর্ঘ প্রতিক্ষা, দীর্ঘ অপেক্ষাকে থামিয়ে দেয়। অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বুটের আঘাতে মুখ দিয়ে অনবরত রক্ত পড়া বাবার চেহারার দিকে।

(কুদস নেটওয়ার্কের একটা প্রতিবেদন প্রকাশ পায় ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে। যেখানে বলা হয়, ইজরায়েলি কারাগারে বন্দী হওয়া ফিলিস্তিনিরা জানেই না যে, রমজান শুরু হয়েছে। এ প্রতিবেদনকে সামনে রেখে লেখা গল্প।)