একুশের পাঠশালা

ফারুক হোসেন সজীব »

অজয় পাল ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষক। ওনার সততা ন্যায়পরায়ণতায় সবাই মুগ্ধ হতো। তিনি ক্লাসে শিশুদের অনেক মজার মজার গল্প বলতেন। সেই গল্পগুলো ছিল বাস্তবধর্মী। এজন্য সমস্ত শিশুরাই উনার গল্প পছন্দ করত এবং ভালোবাসত। একদিন অজয় পাল শিশুদের একটি বিশেষ গল্প বলার জন্য ক্লাসে এলেন। বললেন, আজকে আমি তোমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ গল্প বলব। এই গল্প থেকে তোমরা অনেক কিছু শিখতে পারবে। গল্পের কথা শুনে শিশুরা ভীষণ খুশি হলো। সবাই উৎসুক মনে শিক্ষকের মুখের দিকে তারিয়ে রইল।
শিক্ষক বললেন, এটা শুধু গল্প নয়! আমাদের ভাষার অতীত ইতিহাসও বলতে পারো। শিশুরা নিশ্চুপ হয়ে শিক্ষকের কথা শুনতে লাগল।
অজয় স্যার বললেন, একটা সময় ছিল। যখন আমরা এই বাংলা ভাষায় স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারতাম না।
বাংলা ভাষায় কথা বলতে আমাদের নিষেধ করা হতো। নির্যাতন করা হতো। আমাদের অন্য ভাষায় কথা বলতে বাধ্য করা হতো। কিন্তু এই অন্যায় দাবি বাংলার আপামর জনসাধারণ এবং ছাত্রসমাজ কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি। আর কীভাবে-ই বা মেনে নিবে সবাই? এটা যে আমাদের মায়ের ভাষা! জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সবাই তো নিজের মায়ের ভাষাকে ভালোবাসে তাই না? সমস্ত শিশুরা বলল, হ্যাঁ তাই! আমরা আমাদের মায়ের ভাষাকে ভালোবাসি! বাংলা ভাষাকে ভালোবাসি। এই ভাষায় কথা বলতে ভালোবাসি। অজয় স্যার বললেন, আজ যেমন তোমরা কত সুন্দরভাবে এই ভাষায় কথা বলো! আমরা তখন এভাবে কথা বলতে পারতাম না। শিশুরা অবাক হয়ে বলল, আমরা আমাদের ভাষায় কথা বললেন তাদের কী সমস্যা শুনি ?
অজয় স্যার বললেন, এটা তাদের স্বার্থের জন্যই এমন করেছিল। ওরা চাইত ওদের ভাষায় ওদের আইনে সমস্ত কিছু পরিচালিত হোক।
শিশুরা বলল, তারপর কি হলো? তারপর বাংলার আপামর জনসাধারণ জেগে উঠল। সবার প্রাণের দাবী রক্ষার জন্য ১৯৫২ সালে ছাত্র ভাইয়েরা প্রাণ দিল। রফিক, শফিক, সালাম, বরকত, জব্বার আরও অনেক নাম না জানা ভাইদের হত্যা করা হলো! তাদেরই এই আত্মত্যাগের জন্যই আজকে আমরা এই ভাষা পেয়েছি। তাদের স্মরণেই আমরা একুশে ফেব্রুয়ারি পালন করে থাকি।
শহিদ মিনারে ফুল দিই। এই দিনটি আমাদের ভাষার সংগ্রামের ইতিহাস। আমাদের মাতৃভাষার জন্য আত্মত্যাগের দিন। শুধু তাই নয়, এই দিনটি পৃথিবীজুড়ে আন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবেও স্বীকৃতি লাভ করেছে। পৃথিবীতে এমন কোন জাতি নেই, যারা তাদের ভাষার জন্য এত ত্যাগ স্বীকার করেছে।
শিশুরা প্রশ্ন করল, যদি সবাই সংগ্রাম না করত তবে কি হতো?
অজয় স্যার বললেন, যদি শহিদরা সংগ্রাম না করত। প্রাণ না দিত। তাহলে তুমি আমি আজকে এই বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারতাম না বুঝেছ? আমরা আজকে যে বাংলা ভাষায় কথা বলি, এটা তাদেরই অবদান। এজন্য আমাদের বাংলা ভাষার প্রতি সম্মান এবং মর্যাদা প্রদর্শন করা উচিত।
শহিদদের সম্মান করা উচিত। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।
শিশুরা বলল, আমরা কিভাবে এই ভাষার প্রতি সম্মান জানাতে পারি? অজয় স্যার বললেন, তোমরা সবচেয়ে সহজ কাজটি করতে পারো।
যেমন, একুশে ফেব্রুয়ারির গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারো। শুদ্ধভাবে এই ভাষায় কথা বলতে পারো। শুদ্ধ ভাষায় লিখতে পারো। ভাষা কখনো বিকৃতি করবে না! বুঝেছ? শিশুরা শিক্ষকের কথা শুনে সবাই একসঙ্গে বলল, আমরা আমাদের বাংলা ভাষাকে অবশ্যই রক্ষা করব। কখনো এই ভাষাকে বিকৃতি করব না। আমরা কখনো আমাদের মাতৃভাষাকে হারিয়ে যেতে দেবো না!
অজয় স্যার শিশুদের এমন আগ্রহ দেখে ভীষণ খুশি হলেন। মনে মনে ভাবলেন, এখন হয়ত এই শিশুরা এই বাংলা ভাষার মর্যাদা তেমন বুঝতে পারছে না। কিন্তু এই ভাষাকে নিয়ে ওরা যত গবেষণা করবে, ততই এই ভাষার প্রতি ওরা আরও যত্মবান ও শ্রদ্ধাবান হয়ে উঠবে। এভাবেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই বাংলা ভাষা রক্ষা পাবে! কারণ একুশে ফেব্রুয়ারি নিজেই একটি পাঠশালা। বাঙালির হৃদয় থেকে এই পাঠশালা কোন দিন মুছে যাবার জন্য! ম্লান হবার নয়!