একুশ বাঙালির অস্তিত্ব

বাবুল কান্তি দাশ »

যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী
সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।
দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে না জুয়ায়
নিজ দেশ তেয়াগী কেন বিদেশ ন যায়।
একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালিদের কাছে শুধু একটি দিন বা একটি বিশেষ দিনের ঘটনাপ্রবাহ নয়, আমাদের কাছে একুশ একটি আবেগ, একটি গর্ব, একটি ভালোবাসার অনুভূতি। ১৯৪৭ সালের সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ক’দিন পরেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ পরিষ্কার ভাবেই বুঝেছিল, পাকিস্তান রাষ্ট্র কখনওই এই বাঙালিদের জন্য কল্যাণকর হয়ে উঠবে না। হয়ওনি। সে কারণেই ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির পশ্চিম পাকিস্তানিরা বাংলার বদলে সেখানকার ভাষা উর্দুকে রাষ্ট্রের ভাষা বানানোর ষড়যন্ত্র শুরু করে। সংখ্যার দিক থেকে বাঙালিরা বেশি থাকলেও পশ্চিম পাকিস্তানিরা সেই বাঙালির সংস্কৃতিকে আঘাত করতে তার শিকড় ‘ভাষা’কেই আক্রমণ করল। কিন্তু এই জনপদের মানুষই সেই দিন হয়ে উঠেছিল প্রতিটি বাংলা অক্ষরের পাহারাদার। বুকের রক্তে রুখে দিয়েছিল পাকিস্তানিদের নষ্ট চেষ্টা। আদতে পাকিস্তানি শাসকরা ক্ষমতা রক্ষার মূল খুঁটি হিসেবে প্রথম থেকেই ধর্মের ব্যবহার করেছে। মুসলিম লীগ বিভাজনের কুমন্ত্রই সাধারণের কানে দিয়েছিল। যে মন্ত্রে হাজার বছরের ভরসা রাখা বাঙালি তাদের নিজস্ব পরিচয় ভুলে ধর্ম পরিচয়ে পরিচিত হয়ে উঠেছিল। মাস্টারদা সূর্য সেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারসহ ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবীদের যে রক্ত প্রজন্মে প্রবাহিত হয়েছিল তাঁদের নেতৃত্বে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। ১৯৪৭-এ দেশভাগের পর ’৪৮-এর মার্চ মাসে জিন্নাহ সাহেব ঢাকায় এলেন। ঘোষণা করলেন, উর্দু হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। তখনই এর তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয় । সেই সময়ে জিন্নাহ সাহেবের অবস্থানের বিরুদ্ধে মুক্তিকামী পূর্ব পাকিস্তানের দামাল ছেলেদের এটি ছিল অবিশ্বাস্য সাহসের পরিচয়। পর দিন ২৪ মার্চ জিন্নাহ গেলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে। ঘোষণাটি আবার করলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সেই ঘোষণার বিরুদ্ধে আবার তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানালেন। ভাষা আন্দোলন তখনই বেগবান হল। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি রাজপথে ভাষার দাবির মিছিলে পুলিশ যখন গুলি চালাল এবং ঢাকার রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হলো তখনই সারাদেশে সংগ্রামী ছাত্র জনতা আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করে তুলল। ১৯৫৩ সালের শহিদ দিবসের বর্ষপূর্তিতে ভাষার দাবিকে বাংলার সর্বদলীয় দাবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন দেশের সংগ্রামী ছাত্র জনতা । বাঙালির সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৫৪ সালে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বাঙালি যে উদার এবং মুক্তমনা সেটির প্রমাণ কিন্তু রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন। পঞ্চাশের দশকের শুরুতে পাকিস্তানের ৫৬ শতাংশ মানুষ বাংলায় কথা বলতেন। আর উর্দুতে মাত্র ৮ শতাংশ! উর্দু আসলে পাকিস্তানের সম্ভ্রান্ত, শাসক শ্রেণির ভাষা ছিল। সংখ্যাধিক্য থাকা সত্ত্বেও বাঙালি কখনওই বাংলাকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানায়নি। তারা বলেছিল, বাংলাকে ‘অন্যতম রাষ্ট্রভাষা’ করা হোক। এ থেকে বোঝা যায়, বাঙালি সব সময়েই কতটা মুক্তচিন্তক এবং পরমতসহিষ্ণু! সংখ্যাধিক্যের দৌরাত্ম্য নয়, বাঙালি চেয়েছে প্রতিটি মানুষকে গুরুত্ব দিতে, প্রতিটি মানুষের ভাষাকে গুরুত্ব দিতে। সেই কারণেই বাংলাদেশের ভাষা শহিদ দিবস এখন সারা বিশ্বে উদ্‌যাপিত হয় ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে। একুশ বাঙালিকে শিখিয়েছে যে কোনও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে। আমরা যখনই অন্ধকার শক্তির আক্রমণের শিকার হয়েছি, একুশ হয়ে উঠেছে তখন প্রতিরোধের সাহস, আন্দোলন সংগ্রামের প্রেরণা । অবশ্য বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতির শক্তি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতিপক্ষ অন্ধকার শক্তি হারিয়ে যায়নি। সে কারণেই মাতৃভাষার হাত ধরে থাকা মুক্তচিন্তা ও বাঙালি সংস্কৃতির উপরে হামলার ঘটনাগুলো ঘটেছে। কারণ অপশক্তিরা ভাল করেই জানে— বাঙালির শিকড় তার ভাষার লড়াই, সেই লড়াইয়ের স্মৃতি থেকেই দৃঢ় হয়ে ওঠে এই বাংলাদেশের সংস্কৃতির ঔদার্য। সে কারণেই আমরা দেখেছি, পাকিস্তানিরা মুক্তিযুদ্ধের সূচনার সময়েই গুঁড়িয়ে দিয়েছে শহিদ মিনার। তবে এই মিনার আমাদের কাছে ইট সিমেন্টের একটি অবয়বই নয়, আমাদের হৃদয়ে স্থাপিত এক বাতিঘর। সেই কারণেই এই মিনার কখনও ভেঙে ফেলা সম্ভব না। যার সূত্র ধরে বলা যায় এই চেতনার বিনাশ নেই- আছে বিকাশ। এবং যা আমাদের অস্তিত্ব। মাঝে মাঝে চারদিকের অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, বাংলা আমার দুঃখিনী বাংলা। পরক্ষণেই সম্বিত ফিরে আসে, একুশ যে অবিনশ্বর। একুশের চেতনা এখন বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বনের মতো! ফেব্রুয়ারি আসলেই আমাদের দরদ উথলে ওঠে বাংলার জন্য। অথচ সারাবছর বাংলা চলে তাচ্ছিল্যের সাথে, অবহেলা আর অনাদরে। মুশকিল হল, মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা ‘পার্বণীকরণ’ কতটা বাড়াতে পারে, সেই অস্বস্তিকর প্রশ্নটা কিছুতেই চাপা দেওয়া যাচ্ছে না। কেন জানি না, এ প্রসঙ্গে জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর ‘চোর’ নামে একটি আশ্চর্য গল্প মনে পড়ে যায়। গল্পের কেন্দ্রে আছে একটি কিশোর, ধনী সহপাঠীর বাড়িতে নিয়মিত যেতে যেতে, অঢেল আরামে অভ্যস্ত হতে হতে হঠাৎ সে অনুভব করে নিজের মা, নিজেদের গরিব শান্ত টিমটিমে সংসার থেকে তার বিযুক্তি ঘটে যাচ্ছে। “‘কাঁদছিস কেন!’ ব্যস্ত হয়ে মা শুধোয়। আমি কথা বলি না। আমি কি বলতে পারতাম রোগা ময়লা কাপড় পরা তোমার শুকনো মুখের কথা ভুলে গিয়ে ও-বাড়ির শাড়িগয়না-পরা প্রগল্ভ-স্বাস্থ্য সুকুমারের মা’র দিকে তাকিয়ে থাকতাম, আর কখন তিনি সাদা পাথরের বাটিতে করে আমাকে ও সুকুমারকে আপেল আনারস কেটে দেবেন সেই সোনা-ঝরা বিকেলের অপেক্ষায় আমি শুকিয়ে থাকতাম- থাকতে আরম্ভ করেছি।” গল্পের কিশোরটি কাঁদতে পেরেছিল, এবং তার থেকেও কঠিন একটি কাজ করে উঠতে পেরেছিল। সে আর সুকুমারদের বাড়িতে যায়নি। আমাদের সমস্যাটা অনেক জটিল। প্রতি মুহূর্তে অনুভব করছি আমাদের প্রাণের ভাষাটি জমি ছাড়তে ছাড়তে ক্রমে আরও ম্লানমুখ, বিষাদময়ী হয়ে উঠছে। প্রবল দাপটে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় স্তরে পুঁজিবাদের দোর্দণ্ড প্রতাপে ইংরেজি ভাষা পরাক্রম প্রকাশ করছে। সোনা-ঝরা ভবিষ্যতের আশায় আমরা সন্তানদের প্রাণপণে সেই শক্তিসাধনার দিকে ঠেলে দিতে কসুর করছি না। মুখে কথা ফোটার আগেই প্রায় এই প্রাণান্তকর ব্যায়াম শুরু হয়ে যাচ্ছে। শুধু এ বি সি ডি চেনা নয়- সাত রঙের বর্ণিমাকেও রেড, ব্লু, গ্রিন, ইয়েলো, ব্ল্যাক ইত্যাদি নামে যাতে শিশুরা চেনে তার প্রয়াস কম জরুরি নয়। যে শিশু চটপট বন্য জন্তুদের টাইগার, লায়ন, এলিফ্যান্ট বলে চিহ্নিত করবে, রেড রোজ, গ্রিন লিফ— এই সব বুলি কাটতে পারবে, তার ভাগ্য তত সদয় হবে। ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয় ছাড়া পড়াশোনা হয়, এই ধারণাটাই সমাজ থেকে অদৃশ্য হতে শুরু করেছে। ইংরেজি ভাষা যে শিখতে হবে না তা নয়। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই বাংলাকে বাদ দিয়ে নয়। বাংলা যে আমাদের শেকড়। মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধ সমান। শিশু যেমন মাতৃদুগ্ধ পানে পুষ্ট হয় ঠিক তেমনি মাতৃভাষায় আমাদের সমৃদ্ধি ঘটে। মাতৃভাষা ব্যতিরেক আমাদের উন্নয়ন সমৃদ্ধির পথ কখনো মসৃণ হতে পারে না। বিপন্ন মাতৃভাষা’ নিয়ে কিছু চর্বিতচর্বণ লেখা। ওই যে, “আমি বাংলায় গান গাই, আমি বাংলার গান গাই, …আমি বাংলায় কথা কই, আমি বাংলায় ভাসি, বাংলায় হাসি, বাংলায় জেগে রই…” শিল্পী প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের কথায় ও সুরে গানটা আওড়াই। অথচ বাংলায় প্রভূত চর্চা করলেও আমি তো জানি, আমি নিজেও বেশ ভাল রকম ‘খিচুড়ি’ ভাষায় কথা বলি সময় বিশেষে। ওই চ্যাট ট্যাট করতে বসলেই আর এস এম এস বার্তায় হাবিজাবি শর্ট ফর্মে কথোপকথন চালাই। এটা দস্তুর। ভেবে লাভ নেই। আমরা যতই লোক দেখানো বাংলা ও বাঙালিত্ব নিয়ে শ্লাঘা দেখাই—আমরা কিন্তু এক অর্থে বেজায় হিপোক্রিট। অথচ দেখুন, এই ‘আমি’ ‘আপনি’ আমরা মনে প্রাণে বাঙালিই। আমাদের মাতৃভাষা নিখাদ বাংলা। যদিও তাতে মিশে থাকে কিছু বিদেশি শব্দ বা বাকধারা। ভাষা হল পরস্পরের ভাব প্রকাশের মাধ্যম। যদিও এটা বলা কঠিন যে মানুষ কবে থেকে প্রথম কথা বলতে শিখেছে। প্রস্তর যুগে যখন প্রাচীন মানুষ কেবলমাত্র গাছের ফলমূল আর শিকার করে আনা বনের পশুপাখির মাংস খেয়ে দিব্যি বেঁচে থাকত, তখন থেকেই নিজেদের মধ্যে অনুভূতি প্রকাশ বা ভাব বিনিময়ের জন্য বাধ্য হয়েই তারা ভাষা তৈরি করেছিল। ক্রমে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হতে লাগল ভাষা ও তার বিস্তার। দিনকালের গতিময়তার সঙ্গে পরিবর্তিত হয়ে এক ভাষা থেকে সৃষ্টি হল আরও। ইতিহাসের পাতা উল্টিয়ে দেখা যায় প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে প্রাচীন ব্রাহ্মী লিপির প্রচলন ছিল। এরও বহু পরে খ্রিস্টপূর্ব ২৫০ অব্দের প্রায় কাছাকাছি সময়ে সম্রাট অশোকের লিপি সৃষ্টি হয়েছিল। তারও পর কুণাল লিপি, গুপ্ত আমলে গুপ্ত লিপি, মৌর্য লিপি, আর্যলিপি, কুটিল লিপি ইত্যাদির সৃষ্টি হয়েছিল। এক হাজার খ্রিস্টাব্দের সময় নাগাদ প্রাচীন বাংলা লিপির সৃষ্টি হয়েছিল। অনেক পরিবর্তনের পথ বেয়ে বাংলা লিপিরও সৃষ্টি হয়। বাংলা ভাষার নিজস্ব বর্ণমালাও আছে। যেখানে বহু ভাষারই নিজস্ব কোনও বর্ণমালা নেই, তারা অন্য ভাষার বর্ণমালা ব্যবহার করে লেখে সেখানে বাংলা ভাষার নিজের বর্ণমালা থাকা বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে অবশ্যই বিরাট শ্লাঘার বিষয়। সমগ্র বিশ্বে এখন প্রায় পাঁচ হাজার ভাষায় মানুষ কথা বলেন। যার মধ্যে এক তৃতীয়াংশই হল আফ্রিকার ব্যবহৃত ভাষা। উচ্চারণ, শব্দের ব্যবহার ও বাক্য নির্মাণের দিক থেকে যা একটা অন্যটার সঙ্গে সম্পর্কিত। ভাষাবিদরা এই ভাষাগুলিকে মোটামুটি কুড়িটির মতো পরিবারে ভাগ করেছেন। তবে একটা লক্ষণীয় মজার ব্যাপার হল আফ্রিকারই সিয়েরলিওন দেশের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হল বাংলা। অন্য দিকে ক্রমবিকাশের ফলে পরিবর্তিত হতে হতে প্রাচীন ইংরাজি ভাষারও নতুন অনেক ব্যবহারিক পরিবর্তন হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন ইংরাজি ভাষা ছিল ইংল্যান্ডের বিভিন্ন আঞ্চলিক ও দেশজ ভাষার সংমিশ্রণ। স্ক্যন্ডিনেভিয়ান আঞ্চলের দেশসমূহের মানুষের সঙ্গে সহাবস্থানে ভাষায় ব্যবহৃত ব্যাকরণ ও শব্দাবলি অনেক সহজতর রূপ লাভ করে। ইংরেজি ভাষার সঙ্গে রোমান জার্মান গ্রিক ল্যাটিন শব্দের মিশ্রণ জড়িয়ে আছে। পনেরোশো শতক আধুনিক ইংরাজির সূচনা হয়। শেক্সপীয়ারের রচনার মধ্য দিয়ে ষোড়শ শতকে আধুনিক ইংরেজির গ্রহণযোগ্যতা আসে। এবং ১৬০৪ সালে প্রথম ইংরাজি শব্দভাণ্ডারের সঙ্গে এখানকার আধুনিক ইংরেজি শব্দের প্রচুর ফারাক আছে। শুনলে আশ্চর্য হতে হয় যে পৃথিবীতে একশো কোটিরও বেশি মানুষ যে ভাষায় কথা বলেন, সেটি হল চীনা ভাষা। একটা সময় পর্যন্ত তো পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি বই ছাপানো হত চীনা ভাষায়। চিনা শব্দে প্রায় সত্তর হাজার চিহ্ন ব্যবহৃত হয়। প্রধানত তাইওয়ান ও চিনে এই ভাষার প্রচলন বেশি। ও দিকে ফরাসি ভাষায় বিশ্বে প্রায় দশ কোটি মানুষ কথা বলেন। ফ্রান্স তো বটেই, সুইজারল্যান্ড, জার্মান, বেলজিয়াম, কানাডা, আফ্রিকা, ইতালি দেশের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রায় ফরাসি ভাষা ব্যবহৃত হয়। আবার ব্রাজিল, এশিয়া ও আফ্রিকার কিছু অংশে এবং পর্তুগালে, পতুর্গিজ ভাষায় কথা বলেন সাড়ে তেরো কোটিরও কিছু বেশি মানুষ। রোমান ভাষায় কথা বলেন বলকান ও রোমানিয়ার আড়াই কোটি মানুষ। মায়া সভ্যতার যুগে গ্রিক ভাষার প্রচলন হলেও মায়া সভ্যতা ধ্বংস হয়ে গেল। পরে খ্রিস্টপূর্ব আট শতকের শেষ দিকে গ্রিক ভাষার অক্ষরমালা লিখিত হয়। আধুনিক গ্রিক ভাষা ১৮৩০ সালে গ্রিসের স্বাধীনতা লাভের মাধ্যমে গড়ে ওঠে নতুন করে। হালের স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলেন পৃথিবীর প্রায় তেত্রিশ কোটিরও বেশি মানুষ। চিলি, মেক্সিকো, পানামা, আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া, কলম্বিয়া, কোস্টারিকা, কিউবা, গুয়েতামালা, গিনি, নিকারাগুয়া, প্যারাগুয়ে, ভেনেজুয়েলা, এল সালভাদর ইত্যাদি দেশের রাষ্ট্রভাষাই হল স্প্যানিশ। এমনকী কানাডা মরক্কো ফিলিপাইন ও যুক্তরাষ্ট্রেও স্প্যানিশ ভাষার চর্চা হয়। স্পেন নানা দেশে তাদের উপনিবেশ বিস্তার করতে শুরু করার সঙ্গে তাদের ভাষাও ক্রমশ ছড়িয়ে পড়তে থাকে আমেরিকার প্রায় সব জায়গায়ই। আরও কিছু পরে আঠারোশো শতকে স্পেন আমেরিকার উপনিবেশ শাসনে পরাভূত হলেও লাটিন আমেরিকায় স্প্যানিশ ভাষা প্রায় সব জাতির রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রয়োগ হয়। আরবি ভাষা সেমেটিক ভাষা পরিবারের অন্যতম সদস্য। যেমন হিব্রু গিজ সিরিকা আরামিক পুনিক মোয়াবাইট নাবাটিয়ান ইত্যাদি বহু সহস্র বছর ধরে এই ভাষা চলছে। আমরা এমন যে অবাঙালি পেলেই নিজের মাতৃভাষা বেমালুম ভুলে অন্য ভাষায় কথা বলি যা শংকর ভাষার নামান্তর। বাংলা বিজ্ঞাপনে অ-বাংলা শব্দগুচ্ছের বিরুদ্ধে আমাদের তেমন ক্ষোভ নেই। অথচ ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ ভাষাদিবস নিয়ে লিখতে বসি। ভারী যত্নে, পরম আবেগে কবি একদা লিখেছিলেন, “মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা…”। আমাদের এই বাংলা ভাষা এমনই এক ঐতিহ্য আছে যা কিনা বৃহৎ এক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে আগলে রেখেছে নিজস্ব বনেদিয়ানায়। বস্তুত ভাষাকে মাধ্যম করেই এক একটি অঞ্চল বিশেষে এক একটি জনজাতির সৃষ্টি হয়। নিজেদের কথিত মাতৃভাষার গর্বেই একটা অঞ্চলের অধিবাসী নিজেদের মধ্যে একাত্মতা অনুভব করেন। এ ভাবেই ক্রমান্বয়ে একই অঞ্চলবাসী, যারা একই ভাষা ব্যবহার করেন, তারা নিজেদের এক জাতি এক প্রাণ বলে বিবেচনা করেন। মাতৃভাষাই সমস্ত গোষ্ঠীকে এক জাতিতে একত্রীভূত করে। বাংলা ভাষার ব্যবহার এখন পৃথিবীর এক বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর দ্বারা ব্যবহৃত ভাষা। পৃথিবীর জনসংখ্যার নিরিখে প্রায় ২৮ থেকে ২৯ কোটি মানুষের মাতৃভাষা বাংলা। বিশ্বে বহুল প্রচারিত ভাষাগুলির মধ্যে সংখ্যানুসারে বাংলা ভাষার স্থান চতুর্থ থেকে সপ্তমের মধ্যে। ইংরাজি, চৈনিক, স্প্যানিশ ইত্যাদির পরই বাংলা ভাষার স্থান। দক্ষিণ-এশিয়ার পূর্বপ্রান্তে বাংলা ভাষাটি মূলত ইন্দো-আর্য ভাষা। সংস্কৃত পালি ও প্রাকৃত ভাষার মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার উদ্ভব হয়েছে। উৎকর্ষগত দিক দিয়ে কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, গান, গদ্যে বাংলা ভাষার বনেদিয়ানা অন্য ভাষাকে ম্লান করে দেয়। মাতৃভাষার জন্য একটা অন্য ধরনের আস্বাদ, শ্লাঘা, অনুভবের ভূমি তৈরি হয় বাঙালি মননে।
আমাদের নিজস্ব এই ভাষার একটা বুদ্ধিপ্রদ আভিজাত্য আছে। আমরা শুধু বাংলা সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী এই গর্ববোধ আমাদের দুই বাংলারই। ভাষা আন্দোলনের ফলে যেমন বাঙালি জাতি হারিয়ে ফেলে তাদের আত্মীয়-স্বজনকে, অন্যদিকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলা ভাষা ও সাহিত্য। বর্তমানে বাংলা সাহিত্যের উন্নতির পেছনে রয়েছে ভাষা আন্দোলন।
তবে বর্তমানে বাংলা সাহিত্য পড়ুয়া শিক্ষার্থী পাওয়া দুষ্কর। কারণ, বর্তমান সমাজব্যবস্থায় বিদেশি ভাষার প্রতি অনেক ভালোবাসা লক্ষ করা যাচ্ছে। মাতৃভাষার প্রতি ভালোলাগা ও ভালোবাসা কমে যাওয়ার ফলে বাংলা সাহিত্য আজ হতাশার দিকে যাচ্ছে। পাশাপাশি, অফিস-আদালতে বর্তমানে ইংরেজি ভাষার প্রচলন বেশি। জাতি হিসেবে আমরা লজ্জিত। আমাদের নিজস্ব ভাষা থাকার পরও অফিস-আদালতে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারিনি। বাংলাকে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে এর পাশাপাশি অন্যান্য ভাষা চালু রাখা যায়। একুশে ফেব্রুয়ারি ইতিহাস চর্চা করা খুবই জরুরি। ফেব্রুয়ারির ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয় বিদ্রোহের, অধিকার আদায়ের এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে। অতএব, ফেব্রুয়ারির ইতিহাস কে কাজে লাগিয়ে আমাদের আদর্শ ও দক্ষ নাগরিক হতে হবে। সমসাময়িক বিশ্লেষণে এটা দেখা যায়, বাংলা ভাষার ঐতিহ্য সম্বন্ধে বাঙালির যে অতীত গৌরব ছিল, তা এখন অনেকখানি ইতিহাসে পরিণত। সমালোচকরা প্রশ্ন তুলতেই পারেন, ভাবের ঘরে চুরি করার মতোই এই ‘মহান একুশে ‘ পালন করে সত্যিই কী বাংলা ভাষার ব্যবহার বা প্রয়োগের ব্যবহারিক দিক মসৃণ হচ্ছে। বিভিন্ন সাহিত্যসভা বা সেমিনারে প্রথিতযশা সাহিত্যিককে সংশয় প্রকাশ করতে দেখা যায় বাংলা ভাষাটাই আদৌ ‘মোদের গরব মোদের আশা’ আছে কিনা।