একুশ আমার অহংকার

জনি সিদ্দিক »

আমাদের গৌরবের একুশ
বন্ধুরা, তোমরা কি জানো? পৃথিবীতে খুব কম জাতির মধ্যে আমরা একটি, যারা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় জীবন দিয়েছে। আমাদের এই প্রিয় বাংলা ভাষা, যাতে আমরা মা-বাবাকে ডাকি, মনের কথা বলি, তা কিন্তু এমনি এমনি আসেনি। এর পেছনে আছে অনেক সংগ্রাম আর অনেক বীরের রক্ত। একুশে ফেব্রুয়ারি বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বায়ান্ন সালের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা। একুশ মানেই তো আমাদের গর্ব, একুশ মানেই আমাদের পরম অহংকার।

কেন শুরু হয়েছিল এই লড়াই?
ঘটনাটা শুরু হয়েছিল অনেক আগে, ১৯৪৭ সালে। তখন বাংলাদেশ মানে পূর্ব পাকিস্তান আর বর্তমান পাকিস্তান মানে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান মিলে একটা দেশ ছিল। কিন্তু শাসন চলত পশ্চিম পাকিস্তান থেকে। পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা ছিল বাংলা ভাষা আর পশ্চিম পাকিস্তানের ভাষা ছিল উর্দু। তারা আমাদের ওপর অন্যায়ভাবে তাদের ভাষা উর্দু চাপিয়ে দিতে চাইল। আমরা সবাই চাইতাম আমাদের রাষ্ট্রভাষা হোক বাংলা। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকরা বাঙালির এই ন্যায্য দাবি মানতে নারাজ ছিল। তারা আমাদের সংস্কৃতি আর ভাষাকে কেড়ে নিতে চেয়েছিল। তাই শুরু হয় আন্দোলন সংগ্রাম।

সেই উত্তাল দিনগুলো
ভাষা রক্ষার এই আন্দোলনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল ছাত্র সমাজের। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের বড় নেতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় এসে ঘোষণা দিলেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। তখন ছাত্ররা সাথে সাথে ‘না, না’ বলে প্রতিবাদ জানিয়েছিল। এর কয়েক বছর পর ১৯৫২ সালে আবারও যখন একই ঘোষণা এল, তখন সারা দেশের মানুষ খেপে উঠল। রাজপথে শুরু হলো মিছিল আর স্লোগান।
এই আন্দোলনের শুরুতেই ‘তমুদ্দুন মজলিস’ নামের একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রিন্সিপাল আবুল কাশেম ও অধ্যাপক শাহেদ আলীর মতো মানুষরা তখন ছাত্রদের উৎসাহিত করেছিলেন যেন তারা নিজেদের মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষা করে। তবে তোমাদের জানার জন্য বলে রাখি, ভারতীয় উপমহাদেশ তথা পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশের ভাষা শুনতে প্রায় অনেকটাই একই রকম। এই অঞ্চলের ভাষাগুলো একই ভাষা পরিবারভুক্ত হলেও একে অপরের থেকে আলাদা।

রক্তে ভেজা একুশে ফেব্রুয়ারি
১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ছিল আট ফাল্গুনের এক সুন্দর দিন। কিন্তু সরকার মিছিল-মিটিং নিষিদ্ধ করে ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে। আমাদের সাহসী ছাত্ররা সেই ভয়ংকর নিষেধাজ্ঞা মানেনি। তারা দশজন করে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে দিয়ে মিছিল বের করল। তাদের মুখে একটাই স্লোগান ছিল ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’।
কিন্তু স্বৈরাচারী সরকারের পুলিশ বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে হঠাৎ ছাত্রদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো শুরু করল। সেই বুলেটের আঘাতে রাজপথে লুটিয়ে পড়লেন রফিক, সালাম, জব্বার, বরকত আর শফিউরসহ আরও অনেক নাম না জানা বীর। ঢাকার পিচঢালা কালো রাস্তা সেদিন আমাদের ভাইদের লাল রক্তে ভিজে গিয়েছিল। সারা পৃথিবী অবাক হয়ে দেখল, ভাষার জন্য কোনো জাতি কীভাবে অকাতরে প্রাণ দিতে পারে। আর এই ঘটনার পরই রচিত হয়েছে বিখ্যাত ভাষার গান “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/ আমি কি ভুলিতে পারি।” গানটি লিখেছেন প্রখ্যাত গীতিকার আব্দুল গাফফার চৌধুরী।

আমাদের বিজয় ও বিশ্ব স্বীকৃতি
ভাইদের সেই রক্ত বৃথা যায়নি। পাকিস্তানি শাসকরা শেষ পর্যন্ত মাথা নত করতে বাধ্য হলো এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নিল। এই একুশ থেকেই আমাদের মনে স্বাধীনতার স্বপ্ন দানা বাঁধে, যা আমাদের পরবর্তীতে ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, পরে ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং তারপর সর্বশেষ জুলাই ২৪ এর ছাত্রদের গণঅভ্যুত্থানের প্রেরণা দেয়।
আমাদের এই মহান ত্যাগের কথা এখন সারা পৃথিবী জানে। ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘ থেকে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই স্বীকৃতির পেছনে কানাডা প্রবাসী রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালাম নামে দুই বাঙালির অনেক বড় অবদান ছিল। এখন সারা বিশ্বের সব দেশের মানুষ এই দিনে নিজ নিজ মাতৃভাষাকে শ্রদ্ধা জানায় এবং আমাদের দেশের শহীদদের কথা স্মরণ করে।

একুশ আমাদের শেখায়
বন্ধুরা, একুশ আমাদের শেখায় কীভাবে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হয়। এই দিনটি এলে আমরা খালি পায়ে প্রভাতফেরিতে যাই, শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাই। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, শুধু ফুল দিলেই হবে না। কারণ কবরে ফুল দেয়া ইসলাম ধর্মে সমর্থন করে না। বরং আমাদের উচিত মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে তাদের পরকালীন শান্তির জন্য দোয়া করা। আর আমাদের এই প্রাণের বাংলাকে ভালোবাসতে হবে, শুদ্ধভাবে বাংলা বলতে ও লিখতে হবে। ভাষার জন্য যারা প্রাণ দিয়েছেন, আমরা যেন সবসময় তাদের আদর্শকে মনে রাখি। একুশ আমাদের প্রাণের স্পন্দন, একুশ আমাদের অন্তরের ভালোবাসা এবং একুশ আমাদের অহংকার।