
বিপ্লব বড়ুয়া »
বন্দরনগরীর একজন নিঃস্বার্থ, নির্লোভ, নিঃস্ব রাজনীতিকের নাম স্বপন সেন। ত্যাগ ও সংগ্রামী চেতনার মধ্যে দিয়ে মৃত্যুর পূর্বমুহুর্ত পর্যন্ত একজন আদর্শবাদী রাজনীতির আইডল হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন। মনেপ্রাণে বামপন্থী চেতনার মানুষ হলেও গণতান্ত্রিক সকল আন্দোলন সংগ্রামে তিনি ভূমিকা রাখতেন। কর্ম কুশলতায় মানুষের মনে গেঁথে আছেন যা এক বিস্ময়কর। রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং সংবাদপত্র জগতের সাথে সম্পৃক্ত এমন কোনো মানুষ নেই প্রিয় স্বপন সেনকে চিনতেন না। গুটি গুটি পায়ে হেলেদুলে হেঁটে চলতেন।
চেরাগী চত্বর, আন্দরকিল্লা, জামালখান, লালদীঘি, দোস্ত বিল্ডিং, কোতোয়ালির মোড়, নিউমার্কেট, দারুল ফজল, নন্দনকানন, ডিসিহিল এলাকাসহ সর্বত্র সরব পদচারণা ছিল। আউলা-ঝাউলা শ্বেতশুভ্র চুলের হাসিমুখের মানুষটি গভীর নিঃশব্দে ৯ অক্টোবর চট্টগ্রামবাসীকে শোকসাগরে ভাসিয়ে পরলোকের পথে পাড়ি জমিয়েছেন। পরেরদিন সকল সংবাদপত্র তাঁর মৃত্যু সংবাদ ফলাওভাবে প্রকাশ করে। চট্টগ্রামে অনেক খ্যাতিমান অধ্যাপক, বুদ্ধিজীবী এবং বিত্তশালী রাজনীতিক ছিলেন যাঁরা মারা যাওয়ার সংবাদ সংবাদপত্রের পাতায় স্থান পায়নি সেখানে একজন স্বপন সেন আলোর বাতিঘর হিসেবে প্রচার মাধ্যমে এসেছেন। নির্লোভ নিভৃতিচারী রাজনীতিক স্বপন সেন মৃত্যুর সংবাদ স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিক এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার চ্যানেলগুলোতে প্রচার করেছেন এতেই বোঝা যায় তিনি সকলের কত আপন ছিলেন। চট্টগ্রাম মহানগরের যেখানে প্রগতিশীল চিন্তার সভা-সমাবেশ কিংবা সাহিত্য-সংস্কৃতির আয়োজন হতো সেখানে এই স্বপন সেনের উপস্থিতি ছিল অবশ্যম্ভাবী। মরণের পরেও তিনি আরেকবার দেখিয়ে দিয়েছেন একজন আদর্শবান মানুষ হলে মানুষের অন্তরে কীভাবে ঠাঁই নেয়া যায়। ২৬ নভেম্বর চট্টগ্রাম নগরীর টিআইসি মিলনায়তনে তারই প্রমাণ মিললো। শিল্পী আইরিন সাহা যখন তাঁকে নিবেদন করে ‘তুমি কি কেবলি ছবি’ ও ‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন’ গান দু’টি পরিবেশন করছিলেন তখন আশ্চর্যজনক নিরব নিস্তব্দতা নেমে এলো। কারো কারো চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিলো। এই মানুষটিকে নিয়ে চিত্র সাংবাদিক কমল দাশের পরিচালনায় কয়েক মিনিটের তথ্যচিত্রটি যখন দেখছিলাম তখন দ্বিতীয়বার একই আবহ সৃষ্টি হয়। তাঁকে নিয়ে রচিত কবি-সাংবাদিক ওমর কায়সারের একটি কবিতা শুনতে গিয়ে আরেকবার মানুষ ডুকরে কেঁদে ওঠে। একজন নিঃস্ব, রিক্ত মানুষের জন্য এরকম ভালোবাসা চট্টগ্রামের বুকে আর কোথাও দ্বিতীয়টি দেখেছি বলে আমার জানা নাই। প্রত্যেক বক্তা যখন তাঁকে নিয়ে দু’চার কথা বলছিলেন মনে হলো যেন অবারিত নয়নজলে ভেসে যাচ্ছিল পুরো শোকসভা অঙ্গন। সে এক অকল্পনীয় মূহূর্ত।
শ্রোতার আসনে বসে যে সব ব্যক্তিবর্গ শোকসভাকে আলোকিত করেছেন চট্টগ্রামে স্মরণাতীতকালে এরকম উচ্চমানের বিদগ্ধ শ্রোতামন্ডলীর উপস্থিতি চোখে পড়েনি। দলে দলে তাঁরা এক নিঃস্ব মানুষের জীবনের গল্প শুনতে এসেছিলেন। পুরো মিলনায়তন কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। ফুলে ফুলে ভরে যায় তাঁর শৈল্পিক প্রতিকৃতি। এটি ছিল সময়ের এক বিরল শোকসভা। “পদাতিক স্বপন সেন” নামের একটি স্মারক পুস্তিকা বের করেন নাগরিক শোকসভা কমিটি। পুস্তিকাতে শীর্ষস্থানীয় লেখকরা গদ্য, পদ্যের সংমিশ্রন ঘটিয়ে মৃত স্বপন সেনকে সতত জাগ্রত রাখার চেষ্টা করেছেন। নাগরিক কমিটি এই আয়োজনের মধ্যে দিয়ে সার্থক দায়বোধের পরিচয় দিয়েছেন যা সকলের কাছে প্রশংসিত হয়েছে।
চট্টগ্রামবাসীর কল্যাণ মিত্র স্বপন সেন ১৯৫৩ সালের ৫ অক্টোবর চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলাধীন ব্রিটিশ বিরোধীদের স্মৃতি বিজড়িত স্থান ঐতিহাসিক ধলঘাট গ্রামের একটি উচ্চবংশীয় সম্ভ্রান্ত সেন পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন চিরকুমার। বাবা হৃদয় রঞ্জন সেন ছিলেন ব্রিটিশ আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক, প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন চট্টগ্রাম রেলওয়ে হাইস্কুলে। মা’র নাম নীলিমা সেন। ৪ ভাই ১ বোনের মধ্যে স্বপন সেন ছিলেন চতুর্থ। তাঁরা প্রত্যেকে ছিলেন উচ্চশিক্ষিত এবং সবাই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এবং সরকারি উচ্চ পদে কর্মরত ছিলেন। চট্টগ্রাম কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রী সম্পন্ন করেন স্বপন সেন। রেলওয়েতে সরকারি চাকরিও পেয়েছিলেন কিন্তু রাজনীতির পোকা মাথা থেকে নামাতে না পারার কারণে দুই মাসের মধ্যে চাকরিকে বিদায় জানিয়ে দেন। একটি মর্যাদাশীল পরিবারে জন্ম নিলেও তাঁর জীবনযাপন ছিল অতি সাদামাটা। যা বর্তমান সময়ে খুঁজে পাওয়া দ্স্কুর। বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ), গণতন্ত্রী পার্টি, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, প্রীতিলতা ট্রাস্টসহ অসংখ্য সংগঠন এবং ছাত্র থাকাকালীন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাথে যুক্ত ছিলেন। সবশেষে, কবি ওমর কায়সারের কবিতার একটি পংক্তিমালা দিয়ে শেষ করছি-
লালদীঘিতে ঐতিহাসিক জনসভায়
চলবে তুমুল শুভ্র কথার বৃষ্টি ভারী
একটা কথা সবার কানে বলছি শোনো
স্বপন সেনতো গুটায়নি তার তারবারি।
লেখক : প্রাবন্ধিক




















































