কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে মানবপাচারের ঘটনা নতুন কোনো বিষয় নয়, তবে সম্প্রতি এই অপরাধ প্রবণতা যে পর্যায়ে পৌঁছেছে তা গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি সত্ত্বেও পাচারকারী চক্রের তৎপরতা থামছে না। মূলত উখিয়া ও টেকনাফের শরণার্থী শিবিরগুলোতে আশ্রিত রোহিঙ্গা এবং স্থানীয় দারিদ্র্যপীড়িত জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করেই এই মরণফাঁদ পেতেছে পাচারকারীরা।
উখিয়া-টেকনাফ সীমান্ত এলাকা ভৌগোলিক কারণেই দুর্গম। পাহাড় আর সমুদ্রবেষ্টিত এই অঞ্চলটি পাচারকারীদের জন্য নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে এবং সাগরপথে মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ড পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে ট্রলারে করে অনিশ্চিত যাত্রায় ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। মাঝসমুদ্রে জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়, শারীরিক নির্যাতন এবং শেষ পর্যন্ত সলিলসমাধি—এ যেন এক নিয়মিত ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর থেকে উদ্ধার হওয়া মৃতদেহগুলো তারই সাক্ষী দিচ্ছে।
মানবপাচার বন্ধ না হওয়ার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে বিশাল অঙ্কের অর্থের লেনদেন। আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় প্রভাবশালী সিন্ডিকেট এই অবৈধ বাণিজ্যের সাথে জড়িত। অনেক ক্ষেত্রে সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঘাপটি মেরে থাকা কিছু অসাধু ব্যক্তির যোগসাজশও এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। এছাড়া রোহিঙ্গা শিবিরগুলোর নিয়ন্ত্রণহীনতা ও ঘনবসতি পাচারকারীদের জন্য লোক সংগ্রহের সহজ সুযোগ করে দিচ্ছে। দীর্ঘদিনের অনিশ্চিত জীবন থেকে মুক্তি পেতে রোহিঙ্গারা মরিয়া হয়ে সমুদ্রযাত্রার ঝুঁকি নিচ্ছে।
এই সংকট নিরসনে কেবল মৌসুমি অভিযান বা টহল বৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়। মানবপাচার দমনে বহুমুখী কৌশলের প্রয়োজন। পাচারকারী চক্রের মূল হোতাদের চিহ্নিত করতে গোয়েন্দা তৎপরতা আরও জোরদার করতে হবে। স্থানীয় দালালদের তালিকা করে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। স্থল ও জলপথের অরক্ষিত পয়েন্টগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নজরদারি বাড়াতে হবে। যেহেতু এটি একটি আন্তঃদেশীয় অপরাধ, তাই মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারের সাথে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক আলোচনা জোরদার করতে হবে। শরণার্থী শিবির ও স্থানীয় এলাকাগুলোতে পাচারের ভয়াবহতা নিয়ে প্রচার চালাতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করলে দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে পাচারকারীরা তাদের প্রলুব্ধ করতে পারবে না।
উখিয়া-টেকনাফ সীমান্তকে আমরা আর লাশের ভাগাড় হিসেবে দেখতে চাই না। মানবপাচার কেবল একটি অপরাধ নয়, এটি চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন। রাষ্ট্রের উচিত এই চক্রের শেকড় উপড়ে ফেলে সীমান্তকে সুরক্ষিত করা। প্রশাসনকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নীল জলরাশির গভীরে সাধারণ মানুষের এই আত্মাহুতি বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি।
এ মুহূর্তের সংবাদ















































