ঈদের মাহাত্ম্য যেন সমাজে প্রতিফলিত হয়

এক মাস সিয়াম সাধনার পর আমাদের দ্বারে এসেছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। আনন্দ ও উৎসবের এই মহালগ্নে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আমরা সবাই এক পরম তৃপ্তিতে অবগাহন করছি। রমজানের দীর্ঘ এক মাস আত্মসংযম, ত্যাগ এবং ইবাদতের মধ্য দিয়ে মুমিন মুসলমানরা যে পরিশুদ্ধি লাভ করেছে, তার পূর্ণতা পায় ঈদের এই আনন্দ ভাগাভাগির মাধ্যমে। ঈদ মানেই সাম্য, ঈদ মানেই মিলন। তবে এই আনন্দের মাঝে আমাদের স্মরণ রাখতে হবে উৎসবের ভেতরের গভীর দর্শন ও সামাজিক দায়বদ্ধতাকে।

ঈদের আনন্দ কেবল নিজের এবং নিজ পরিবারের জন্য নয়। ইসলামের মূল দর্শনই হলো বিত্তবান ও দরিদ্রের মধ্যে দূরত্ব ঘুচিয়ে দেওয়া। রমজানের শেষে ‘ফিতরা’ এবং ‘যাকাত’ প্রদানের যে বিধান, তার প্রধান উদ্দেশ্যই হলো সমাজের পিছিয়ে পড়া ও অভুক্ত মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। আমরা যখন নতুন পোশাকে সজ্জ্বিত হয়ে সুস্বাদু খাবারে তৃপ্তি খুঁজি, তখন আমাদের পাশেই হয়তো কোনো শিশু অভুক্ত চোখে চেয়ে আছে। তাদের সেই অভাব দূর করে আনন্দকে সর্বজনীন করার মধ্যেই ঈদের প্রকৃত সার্থকতা নিহিত।
ঈদের আনন্দ উদযাপনে মানুষের নিরাপত্তা এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। প্রতিবছর ঈদের ছুটিতে ঢাকা, চট্টগ্রামের মতো বড় নগরী থেকে কোটিরও বেশি মানুষ নাড়ির টানে গ্রামের বাড়ি ফেরেন। যাতায়াতের এই পথে জীবনের ঝুঁকি, দুর্ঘটনা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত বিড়ম্বনা থেকে মুক্তির জন্য প্রশাসন যেমন দায়িত্ব পালন করে, তেমনি নাগরিকদেরও সচেতন হওয়া জরুরি। আনন্দ যেন কোনোভাবেই বিষাদে পরিণত না হয়, সেদিকে আমাদের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। এছাড়া ঈদ পরবর্তী সময়ে রাস্তাঘাটে ও বিনোদন কেন্দ্রে শৃঙ্খলা বজায় রাখা আমাদের নাগরিক দায়িত্বের অংশ।
বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের সোপানে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু উন্নয়ন তখনই টেকসই হয় যখন মানুষের মনে শান্তি থাকে এবং সমাজে ভেদাভেদ থাকে না। আজকের এই উৎসবের দিনে আমাদের সমবেত প্রার্থনা হোক দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য। হিংসা, বিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িকতা পরিহার করে আমরা যেন এক উদার ও প্রগতিশীল বাংলাদেশ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখতে পারি। সিয়াম সাধনার মাধ্যমে আমরা যে ধৈর্য ও সহমর্মিতার শিক্ষা পেয়েছি, তা যেন বছরের বাকি এগারো মাসও আমাদের কর্ম ও আচরণে প্রতিফলিত হয়।
ঈদুল ফিতর আমাদের ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে দৃঢ় করার শিক্ষা দেয়। ধনী-নির্ধন নির্বিশেষে কাতারবন্দি হয়ে নামাজ পড়ার মাধ্যমে আমরা যে ঐক্যের বার্তা দিই, তা যেন সমাজ ও রাষ্ট্রে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। ঈদ আসুক আনন্দের বার্তা নিয়ে, প্রতিটি ঘরে ঘরে বয়ে আনুক প্রশান্তি। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ ক্ষুধা, দারিদ্র‍্যমুক্ত এবং একটি মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক— এই হোক এবারের ঈদের প্রার্থনা।

ঈদ মোবারক