ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ, বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এখন এক অগ্নিকুণ্ড। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান প্রত্যক্ষ সামরিক সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতে যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার—হরমুজ প্রণালী। সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই প্রণালী বন্ধের যে হুমকি বা আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার দেশগুলোর জন্য এক অশনিসংকেত।
বিশ্বের মোট খনিজ তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (LNG) এক-তৃতীয়াংশ এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি যদি কোনো কারণে রুদ্ধ হয়, তবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম রাতারাতি আকাশচুম্বী হবে। মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলের সিংহভাগ এবং এলএনজির একটি বড় অংশ কাতার, ওমান ও সৌদি আরব থেকে আমদানি করে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার অর্থ হলো সরবরাহ লাইনে সরাসরি আঘাত। এর প্রভাব হবে বহুমুখী। এর ফলে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের গ্যাস ও ফার্নেস অয়েলের সংকট দেখা দেবে। পরিবহণ খরচ বাড়লে নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হবে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে কেবল ভাগ্যের ওপর ভরসা করে বসে থাকার সুযোগ নেই। সরকারকে একটি ‘ইমার্জেন্সি এনার্জি প্রটোকল’ বা জরুরি জ্বালানি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে অন্যান্য উৎস (যেমন- রাশিয়া বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া) থেকে জ্বালানি সংগ্রহের পথ প্রশস্ত করতে হবে। পাশাপাশি আমাদের বর্তমান মজুদ সক্ষমতা বাড়াতে হবে যাতে অন্তত ২-৩ মাসের ধাক্কা সামলানো যায়।
বছরের পর বছর ধরে পড়ে থাকা স্থল ও সমুদ্রভাগের গ্যাস ব্লকগুলোতে অনুসন্ধান ও উত্তোলনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বিদেশি কোম্পানির ওপর অতি-নির্ভরশীলতা কমিয়ে দেশীয় সংস্থাকে শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি। সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের মতো টেকসই উৎসে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এটি দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমাবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে জ্বালানি সাশ্রয়ে কঠোর নির্দেশনা প্রয়োজন। অপচয় রোধে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা বা বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
ইরান ও ইসরায়েলের এই সংঘাত কেবল দুটি দেশের বিষয় নয়, এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির স্নায়ুযুদ্ধ। বাংলাদেশ একটি উদীয়মান অর্থনীতি হিসেবে এই ধাক্কা সামলানোর জন্য কতটা প্রস্তুত, তা এখন বড় প্রশ্ন। ভূ-রাজনৈতিক সংকটে আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেই, কিন্তু ঘরের প্রস্তুতিতে আমাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আছে। দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এখন থেকেই কূটনৈতিক তৎপরতা ও অভ্যন্তরীণ উৎস অনুসন্ধানে আপসহীন হতে হবে। সংকট আসার আগে বাঁধ না বাঁধলে প্লাবন ঠেকানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।