এম আব্দুল হালীম বাচ্চু »
লক্ষ্মীপুর গ্রাম। রাত নামলে এখানকার অন্ধকারে একধরনের অদ্ভুত আলোর খেলা জমে উঠত। এখানকার স্থায়ী বাসিন্দারা বিশ্বাস করত এসব সত্য-মিথ্যার মরীচিকা! মাঝে মধ্যেই আলোর হাসি চোখে পড়ত আবার নিস্তব্ধতাও নেমে আসত। সবকিছুই আজ বিশ্বাস অবিশ্বাসের জনশ্রুতি হয়ে গ্রামের বাসিন্দাদের মনে ভর করে আছে।
গ্রামের শেষ প্রান্তে একটি লক্ষ্মীপুকুর। পুকুরটা খুব বড়ো নয়, কিন্তু তার চারপাশে একটা আলাদা নীরবতা লেগেই থাকত। দিনের বেলাতে সেটা ছিল সাধারণ জলাশয়। কচুরিপানাতেও ছিল অর্ধেক পরিপূর্ণ। ব্যাঙের ডাকের জন্যেও ছিল বেশ নামকরা। এমনকি মাঝে মাঝে সেখানে গরুকে স্নান করানোও হতো।
পূর্ণিমার রাতে পুকুরের জল নাকি হেসে ওঠত। হেসে ওঠার মানে চাঁদের আলো জলের গায়ে এমনভাবে নড়ে উঠত যেন মনে হতো কেউ দাঁত বের করে মুচকি মুচকি হাসছে। এই গল্প শুনে বেশিরভাগ মানুষ হেসে উড়িয়ে দিত। শুধু বিশ্বাস করত বারো বছরের একটা মেয়ে, তার নাম আলফিয়া।
আলফিয়ার মা বলতেন,— “চাঁদ হাসে না মা, মানুষই চোখের আয়নায় চাঁদের ভেতর থেকে হাসি খুঁজে নেয়।” আলফিয়া মায়ের কথা চুপ করে শুনে একটু পর জিজ্ঞেস করল,— “কিন্তু মা, সবকিছুর কি মানুষের ব্যাখ্যাই সঠিক হয়? চাঁদের কি নিজের মন থাকতে পারে না?” আলফিয়ার চোখে প্রশ্নে ভরা। সে বুঝতে পারত না কেন বড়োরা সবকিছুকে যুক্তির খাঁচায় পুরে ফেলতে চায়। তার মনে হতো, সহজ উত্তরগুলোর আড়ালেই লুকিয়ে থাকে সবচেয়ে গভীর সত্যগুলো। বাবার অনুপস্থিতি, মায়ের ক্লান্ত মুখ, ঘরের এক কোণে পড়ে থাকা বাবার পুরনো চেয়ারের দিকে তাকালেই তার মনে হতো- ‘কিছু প্রশ্নের উত্তর কেউ দিতে পারে না, শুধু সময়ের জন্য রেখে দেয়।’
ঘটনার রাতে পূর্ণিমা ছিল। আকাশ পরিষ্কার, বাতাসে শিউলি ফুলের গন্ধ। গ্রাম তখনও ঘুমোচ্ছে, শুধু ঝিঁঝিঁপোকার শব্দ আর দূরে কুকুরের ডাক। আলফিয়া চুপিচুপি বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। তার হাতে ছিল ছোট্ট একটা কাচের বোতল— একসময় তাতে সরিষার তেল রাখা ছিল, এখন একদম খালি। সে ঠিক করল আজ সে চাঁদের হাসি ধরে আনবে। পুকুরপাড়ে দাঁড়াতেই তার শরীর কেঁপে উঠল। ভয় নয়, অজানা এক অনুভূতিতে। জলের ওপর চাঁদের প্রতিবিম্ব নড়ে উঠল। হঠাৎ সে শুনল একটা মৃদু হাসি। মানুষের হাসির মতো নয়, আবার ঝর্ণার শব্দও নয়। যেন আলোই হাসছে।
আলফিয়া ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, “কে?”
জল থেকে ভেসে এলো এক কণ্ঠ,—“আমি চাঁদের হাসি।”
আলফিয়া ভয় পেল না বরং তার বুকের ভেতর জমে থাকা প্রশ্নগুলো একে একে জেগে উঠল— “তুমি হাসো কেন?” পুকুর থেকে আবার বলল,— “মানুষ যখন খুব দুঃখ পায়, তখন আমি হেসে উঠি। যাতে তারা মনে রাখে— আলো কখনো মরে না। আলো ফুরোয় না, আলো অফুরন্ত।” আলফিয়ার চোখে তখন বাবার শূন্য চেয়ারটার ছবি ভেসে উঠল। সে বুঝতে পারল, দুঃখ শুধু কান্না নয়— দুঃখ কখনও নীরবতা, কখনও অসমাপ্ত কথাও।
এবার সে বোতলের দিকে তাকাল, তারপর জলের দিকে। চাঁদের হাসিকে বলল,— “আমি তোমাকে এই বোতলে একটুখানি রাখব,— “আমার মাকে দেখাব।”
এমন কথা শুনে চাঁদের হাসি থেমে গেল। চাঁদের হাসি তখন ধীরে ধীরে বলল,— “আমাকে ধরে রাখা যায় না, আমি থাকি চলমান জলে, খোলা আকাশে, আর তোমাদের মুক্ত চোখে।” তবু চাঁদের হাসির এক ফোঁটা আলো পুকুর থেকে উঠে এসে বোতলের মুখে ঢুকে পড়ল। বোতলটা তখন নিজে নিজেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ভেতরে কিচ্ছু নেই, শুধুই আলো।
আলফিয়া বোতলটা বুকে চেপে ধরল। তার মনে হলো, আলো আজ তার দায়িত্বে। বাড়ি ফিরে সে বোতলটা টেবিলে রাখল। ঘরটা ধীরে ধীরে আলোকিত হয়ে উঠল; চাঁদের মতো নরম, শান্ত। মা তাকিয়ে রইলেন। চোখে জল, ঠোঁটে হালকা হাসি। এবার প্রশ্ন করলেন— “এটা কী?” আলফিয়া বলল,— “চাঁদের হাসি, মা।”
সেই রাতের পর থেকে বাসায় অদ্ভুত রকমের পরিবর্তন শুরু হলো। আলোয় শুধু বাসার দেওয়াল নয়, স্মৃতিগুলোও যেন ধুয়ে যাচ্ছিল। গ্রামের মানুষ বলতে লাগল, লক্ষ্মীপুকুরের জল আগের চেয়ে স্বচ্ছ। কেউ কেউ বলতে লাগল, রাতের আকাশে আজকাল চাঁদ একটু বেশিই উজ্জ্বল মনে হচ্ছে; আলফিয়ার মা, সকালে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইতে শুরু করলেন, সাধারণত তিনি সকালে কখনও গান গাইতেন না! সবকিছুই কেমন যেন অস্বাভাবিক মনে হচ্ছিল!
কয়েকদিনের মধ্যেই আলোটা ম্লান হতে শুরু করল। আলফিয়া বুঝল, হাসি আটকে রাখলে তা ফুরিয়ে যায়। সে আবার পুকুরে গেল এবং বোতলের মুখটা খুলে দিলো। আলোটা হালকা বাতাসে মিলিয়ে গেল। পুকুরের জল আবারও হেসে উঠল।
ফেরার পথে আলফিয়ার বুকটা হালকা হয়ে গিয়েছিল। সে জানত, কিছু জিনিস নিজের আনন্দের জন্য বন্দি করে রাখলে মরে যায়। সেই থেকে লক্ষ্মীপুকুরে আর কেউ বোতল নিয়ে আসে না। এখন সবাই জানে, সত্যিকারের আলো ধরে রাখার জন্য নয়— ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য। ছড়িয়ে দিতে পারলেই কেবল অশুভ আঁধার দূর করা সম্ভব।




















































