আলাওল থেকে আল মাহমুদ : বাংলা কবিতায় বসন্ত বন্দনা

পান্থজন জাহাঙ্গীর »

বাঙালির কবিতা-সংস্কৃতিতে বসন্ত এক চিরচেনা অথচ সদাবর্ণিল উৎসের নাম। শীতের দীর্ঘ অবসানের পর যখন চারদিকের নিস্তব্ধতা ধীরে ধীরে ভেঙে যায়, ঠিক তখনই আসে বসন্ত—নতুন রঙ, নতুন প্রাণ আর অনাবিল সৃষ্টির আহ্বান নিয়ে। প্রকৃতির এই রূপান্তরময় ঋতু যেন কবিদের হৃদয়ে আলোর মশাল জ্বেলে দেয়; পাতায় পাতায়, ফুলে ফুলে, বাতাসের মৃদু দোলায় তারা খুঁজে পান জীবনের নবজাগরণের অভিযাত্রা। বসন্তের কবিতায় রয়েছে মৃদুমন্দ দক্ষিণ হাওয়ার নরম স্পর্শ, কুসুম-কলির বিস্ময়, পলাশ-শিমুলের অগ্নি-রাঙা সৌন্দর্য, আর আছে অদৃশ্য আনন্দের সেই তরঙ্গ, যা মানুষের মনকে প্রেম, উচ্ছ্বাস ও আশায় ভরিয়ে তোলে।
এই বসন্তচেতনার আড়ম্বরপূর্ণ ও শৈল্পিক প্রকাশ প্রথম সুস্পষ্টভাবে দেখা যায় মধ্যযুগের বাঙালি কবি আলাওলের কবিতায়। আলাওল তাঁর কাব্যে বসন্তকে কামের ঋতু হিসেবে কল্পনা করেছেন।

‘প্রথমে বসন্ত ঋতু নবীন পল্লব।
দুই পক্ষ আগে পাছে মধ্যে সুমাধব।।
মলয়া সমীর হৈল কামের পদাতি।
মুকুলিত কৈল তবে বৃক্ষ বনস্পতি।।’

তাঁর দৃষ্টিতে বসন্ত প্রকৃতিকে যেমন নবীন পল্লবে সজ্জিত করে, তেমনি মানুষের মনে জাগিয়ে তোলে প্রেম, আকাঙ্ক্ষা ও অনুভবের উন্মেষ। আলাওলের ‘ঋতু-বর্ণন’ কাব্যে বসন্তের আগমন মানে চারপাশের বৃক্ষ ও বনস্পতির মুকুলিত হওয়া, কুসুমের রঙে বনভূমির রাঙিয়ে ওঠা এবং মলয় বাতাসের স্পর্শে কামভাবের সঞ্চার। ভ্রমরের গুঞ্জন ও কোকিলের কলরব যুবক হৃদয়ে গভীর আবেগ জাগিয়ে তোলে। ফুলের মালা, বিচিত্র বস্ত্র ও চন্দনের সৌরভ বসন্তকে এক ধরনের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও আনন্দময় উৎসবে পরিণত করে। এখানে বসন্ত প্রকৃতির সৌন্দর্যের পাশাপাশি মানবজীবনের কামনাময় উচ্ছ্বাসের প্রতীক। পরবর্তীকালে কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী তাঁর ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যের ফুল্লরার বারোমাস্যায় বসন্তকে ভিন্ন এক দৃষ্টিতে উপস্থাপন করেছেন। তিনি বসন্তকে বলেছেন ‘রমণী-দগ্ধ ঋতু’।

‘সহজে শীতল ঋতু ফাল্গুন যে মাসে।
পাড়ায় রমণীগণ বসন্ত বাতাসে।।’

সাধারণভাবে ফাল্গুন মাসকে শীতল ও স্নিগ্ধ বলে মনে করা হলেও বসন্তের বাতাস নারীর মনে এমন এক উত্তাপ সৃষ্টি করে, যা দহনসদৃশ অনুভূতির জন্ম দেয়। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে বসন্ত কেবল সৌন্দর্যের ঋতু নয়, বরং এক তীব্র মানসিক ও আবেগপ্রবণ সময়কাল।
বাংলা সাহিত্যে বসন্তের এক অনন্য ও সূক্ষ্ম অনুভব পাওয়া যায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টপাধ্যায়ের লেখায়। কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসে রোহিনী যখন ঘাটের দিকে এগিয়ে যায়, তখন হঠাৎ কোকিলের ডাক ভেসে আসে—এই কোকিল নিছক পাখি নয়, সে বসন্তের অন্তরঙ্গ সখা। বঙ্কিমচন্দ্র এই ডাককে প্রকৃতির আনন্দঘোষণা হিসেবে নয়, বরং মানুষের ভেতরের শূন্যতা জাগিয়ে তোলার এক গভীর সংকেত হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর ভাষায়, কোকিলের স্বর শুনলে মনে হয় যেন অজানা কোনো ক্ষতি হয়ে গেছে—কিছু একটিকে হারানো হয়েছে, যার অভাবে জীবন মুহূর্তে নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে। সেই হারানো জিনিসটি কী, তা স্পষ্ট নয়; তবু তার অনুপস্থিতি তীব্রভাবে অনুভূত হয়। মনে হয়, আর কোনোদিন তা ফিরে পাওয়া যাবে না; কোথাও যেন জীবনের সুখ অসম্পূর্ণ থেকে গেছে, যেন আহ্বান আছে অথচ সাড়া দেওয়ার শক্তি নেই। কোকিলের ডাক তাই এখানে বসন্তের উল্লাস নয়, বরং অপূর্ণতা, হাহাকার ও জীবনের বৃথা চলে যাওয়ার বেদনাকে ভাষা দেয়—যে বসন্ত আনন্দের প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু মনে করিয়ে দেয় কী গভীরভাবে তা অপূর্ণ রয়ে গেছে।
বাংলা সাহিত্যে বসন্তের উপস্থিতি কেবল মধ্যযুগেই সীমাবদ্ধ নয়। চর্যাপদের কবিদের রচনাতেও এ ঋতুর ইঙ্গিতপূর্ণ ও সংক্ষিপ্ত উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে বসন্ত আসে প্রেম ও বিরহের আবহ নিয়ে, যা কৃষ্ণুরাধার লীলাকে করে তোলে আরও আবেগময়। পরবর্তীকালে বৈষ্ণব পদাবলীতে বসন্তের বন্দনা এক বিস্তৃত ও গভীর শিল্পরূপ লাভ করে—প্রকৃতি, প্রেম ও ভক্তির সম্মিলনে যেন তা হয়ে ওঠে বাংলা সাহিত্যের এক মহাকাব্যিক বসন্ত-উৎসব।
আধুনিক বাংলা সাহিত্যে বসন্তের রূপ ও অনুভব সবচেয়ে ব্যাপকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যকর্মে। যদিও রবীন্দ্রনাথের প্রিয় ঋতু ছিল বর্ষা, তবু বসন্তের আগমনধ্বনি তাঁর অসংখ্য গান ও কবিতায় গভীরভাবে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। প্রকৃতি ও মানবমনের সূক্ষ্ম অনুভূতিকে একত্রে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ বসন্তকে নতুন তাৎপর্যে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর বিপুল সংগীতসৃষ্টির মধ্যে প্রকৃতি-পর্বের গানগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বসন্তকে কেন্দ্র করে রচিত, যা বাংলা সাহিত্যে বসন্ত-ভাবনার সর্বাধিক বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক প্রকাশ হিসেবে বিবেচিত।
মহাদেব সাহার দীর্ঘ শীতের প্রতীকী পরাজয়, তসলিমা নাসরিনের ভুল প্রেমের দহন, মাহবুব আলমের ফাগুনের স্নিগ্ধ ডাক, নির্মলেন্দু গুণের রমণীয় মুগ্ধতা, কিংবা শামসুর রাহমানের গোরস্তানে কোকিলের করুণ সঙ্গীত—সব মিলে বসন্ত হয়ে উঠেছে এক বিপুল বহুরৈব সত্য। এই প্রবন্ধে বসন্তের সেই বহুমাত্রিক চিত্রই ধরার প্রয়াস পাচ্ছি।

শুরুতেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে’ কবিতা দিয়ে শুরু করা যাক,‘আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে’ কবিতায় বসন্তের আগমন কোনো ঋতুর পরিবর্তনমাত্র নয়—এটি মানুষের অন্তরজগতের গোপন আবরণ ভেদ করে ওঠার এক গভীর আহ্বান। কবি প্রকৃতির নবজাগরণকে মানবহৃদয়ের জাগরণের সঙ্গে একাকার করে দেখিয়েছেন। বসন্ত যেন দরজায় দাঁড়ানো এক শুভ অতিথি, যাকে অবহেলা বা কুণ্ঠায় আড়াল করা মানে নিজের জীবনের উৎসবকে অস্বীকার করা। কবিতার শুরুতেই কবির স্পষ্ট উচ্চারণ—

“আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে,
তব অবগুন্ঠিত কুন্ঠিত জীবনে করোনা বিড়ম্বিত তারে।”

এ আহ্বান শুধু প্রকৃতিকে নয়, মানুষের মনের অন্ধকার কোণে গুটিয়ে থাকা দ্বিধা, ভয়, সংকোচকে সরিয়ে সত্যিকারের জীবনের দিকে হাত বাড়ানোর ডাক। কবি বলেন, আজ হৃদয়ের দ্বার খুলে দিতে হবে, ভুলে যেতে হবে অহং, বিরোধ, নিজের-পরের সীমারেখা। কারণ আজ আকাশ সংগীতে মুখর, বাতাসে বহে অদৃশ্য আনন্দের দোল। এই সময় দিশাহারা না হয়ে বরং নিজের ভেতরের মাধুর্য চারদিকে ছড়িয়ে দিতে হবে—যেমন ফুল তার গন্ধ দিয়ে বিশ্বকে সমৃদ্ধ করে। প্রকৃতির রূপান্তরও এখানে প্রতীক হয়ে ওঠে। বেদনার গহিন অরণ্যেও বসন্তের ছোঁয়া লাগে—

“অতি নিবিড় বেদনা বনমাঝে রে—
আজি পল্লবে পল্লবে বাজে রে।”

যেন দুঃখের ভিতরেও নতুন জীবনের সুর বাজতে শুরু করে। দূর আকাশ সাজে কারো প্রতীক্ষায়, দক্ষিণ বাতাস কবির পরাণে আলোড়ন তোলে—এ হাওয়া যেন নেই কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য, তবু খুঁজে চলে সেই চিরপরিচিত প্রিয়কে। সৌরভে ভরা বসন্ত রজনীও কারো পদধ্বনিতে জেগে ওঠে। এই প্রকৃতি আসলে এক সুন্দর, বল্লভ, কান্তের আগমনের জন্য ব্যাকুল—যে কেবল প্রেমিক নয়, হতে পারে জীবন, হতে পারে জাগরণ, হতে পারে সৌন্দর্যের চূড়ান্ত প্রতীক। শেষ পর্যন্ত কবিতাটি আমাদের শোনায় এক গভীর সত্য: বসন্ত শুধু বাহিরের জাগরণ নয়, এটি মানুষকে তার ভেতরের নিস্তব্ধতা থেকে জাগিয়ে তোলে। বসন্তের সুর প্রকৃতি ও হৃদয়ের দুই প্রান্তকে এক করে দেয়, আর মানুষকে শেখায়—জীবন যতই কঠিন হোক, নতুন করে ফুটে ওঠার সুযোগ সবসময়ই আছে।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের কবিতায় বসন্তের রক্তিম উপস্থিতি ততটা প্রত্যক্ষ না হলেও তাঁর কবিতার সামগ্রিক অবয়ব বসন্ত-উচ্চকিত।
কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় বসন্ত কোনো কোমল, স্নিগ্ধ ঋতু নয়; তা উষ্ণ, দেহঘন, প্রবল ও প্রায় হিংস্র। তাঁর ফাগুন প্রেমের সঙ্গে রক্ত, আগুন ও যন্ত্রণাকে মিশিয়ে দেয়। তিনি লিখছেন—

“এল খুন-মাখা তৃণ নিয়ে খুনেরা ফাগুন!”

এখানে বসন্ত যেন প্রাণ সঞ্চার করে, কিন্তু সেই প্রাণ উল্লাসের নয়—উন্মত্ততার। ফুল ফোটে, কিন্তু তা “ফেটে পড়ে”; প্রেম আসে, কিন্তু তা “হুল” হয়ে বিঁধে। বিরহিণীর ক্ষতস্থানে বসন্ত নুন ছিটিয়ে দেয়—

“যত বিরহিণী নিম্খুন-কাটা ঘায়ে নুন!”

নজরুলের চেতনায় বসন্ত তাই বিপ্লবী, কামনাময় ও রক্তপিপাসু—জীবনকে জাগায় বটে, কিন্তু ব্যথা দিয়েই।
এবার কাজী নজরুল ইসলাম ‘এলো বনান্তে পাগল বসন্ত’ বিশ্লেষণে আসা যাক। নজরুলের এই কবিতায় বসন্তকে আবির্ভূত করা হয়েছে এক দুরন্ত তরুণের রূপে—চঞ্চল, প্রাণবন্ত, রঙউচ্ছ্বাসে ভরপুর এক রূপক-ব্যক্তিত্ব। বসন্ত যেন বনের পথ ধরে প্রবেশ করে, আর প্রবেশ করেই মন ও প্রকৃতির পরতে পরতে রঙ ছড়িয়ে দেয়। বাঁশির সুরে বাজে “বিধুর পরজ”, যা একদিকে যেমন আনন্দের উল্লাস, তেমনি গভীর আবেগ ও অনুরাগের সুরও বইয়ে আনে। বসন্তের এই আগমনে ধূসর দিগন্ত রঙে রাঙা হয়ে ওঠে, পাতায় পাতায় কিশলয় ও কলির অস্থির আন্দোলন প্রকৃতির নবজন্মকে স্মরণ করিয়ে দেয়। পলাশকলির মধ্যে সে তার ফুলধনু সাজিয়ে ছুটে চলে, আর ফুলেরা হাসির ঝলমলে রূপে তাকে সাড়া দেয়। দক্ষিণা হাওয়াও যেন আজ এলোমেলো আনন্দে ভেসে বনভূমিতে প্রলাপ বকে, প্রকৃতির প্রতিটি কোণ যেন উচ্ছ্বাসে পূর্ণ। কিন্তু সেই উচ্ছ্বাসের মাঝেও মানুষের মনে কোথাও এক অকারণ বিরহের বেণু বাজতে থাকে—যেন আনন্দের ভেতরেও বেদনার লুকোনো সুর আছে। বসন্তের উচ্ছ্বাস যেমন গভীর প্রাণস্পন্দন জাগায়, তেমনি ঘুমন্ত বেদনাকেও আলতো করে জাগিয়ে তোলে। এই দ্বৈত অনুভূতিই নজরুলের বসন্তকে করে তোলে সবচেয়ে মানবিক ও সবচেয়ে রঙিন।

সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতায় বসন্ত আবার অন্যরকম। এখানে বসন্ত প্রকৃতির দয়ার ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং মানুষের দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। তাঁর সেই বিখ্যাত ‘ফুল ফুটুক না ফুটুক’ কবিতায় বসন্ত কোনো রোমান্টিক প্রকৃতি-উৎসব নয়; বরং একটি শহুরে বাস্তব, মানুষের কঠিন জীবন, সময়ের নির্মমতা এবং অভাব-দুঃখের মধ্যে সৌন্দর্য খোঁজার সংগ্রামকে তুলে ধরে। কবি বলেন— “ফুল ফুটুক না ফুটুক / আজ বসন্ত।” অর্থাৎ বসন্তের প্রচলিত সৌন্দর্য উপস্থিত না থাকলেও সময়ের ক্যালেন্ডার তার আগমন ঘোষণা করে। এই বসন্ত প্রকৃতির নয়—এটি মানুষের জীবনের ক্লান্ত দিনগুলোর ভেতর চাপা পড়ে যাওয়া স্মৃতি ও বেদনার প্রতিধ্বনি।

এক কাঠখোট্টা গাছ শহরের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে থাকে—শুকনো, শক্ত, প্রাণহীন—কিন্তু তার বুক চিরে কচি পাতার হাসি ফুটে ওঠে। শহরের অন্ধকার, দুঃসহ বাস্তবতা সত্ত্বেও তার ভেতরে জীবনের জেদ টিকে থাকে। কবি এখানে দেখান আলোকে ঠুলি পরানো, মৃত্যুতে মানুষকে শুইয়ে রাখা, আবার সেই মৃত্যু থেকে দিনগুলোকে তুলে নিয়ে যাওয়া—এ যেন সময়ের নিষ্ঠুরতার এক ঘূর্ণি। কখনো গায়ে হলুদ লেগে থাকা সন্ধ্যার ভেতর হারিয়ে যায় হরবোলা ছেলেটি, যার কণ্ঠে ছিল কোকিলের ডাক। তার স্বপ্ন, তার সুর—সবটুকু গ্রাস করে নেয় সময়। একইভাবে এক কালো, অবহেলিত, একা মেয়ে আকাশের হলদে চিঠির নিচে জীবনের হিসাব কষতে থাকে। আর ঠিক সেই সময়ে তার ওপর আছড়ে পড়ে মৃত্যুুরূপী এক “পোড়ারমুখ লক্ষ্মীছাড়া প্রজাপতি” —যেন মৃত্যুও আজ তুচ্ছ, অবহেলিত প্রজাপতির মতো মানুষের জীবনে উড়ে আসে। শেষে দেখা যায়—দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দের পর পৃথিবী অন্ধকারে ডুবে যায়, কিন্তু ফুটপাথের সেই জেদি, দড়িপাকানো গাছটি তখনো হাসে। হাসে জীবনের বেঁচে থাকার এক-ফোটা শক্তির দম্ভে, হাসে সময়, মৃত্যু ও বেদনার মুখে দাঁড়িয়ে। এই কবিতা শেখায়—বসন্ত শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য নয়; মানুষের ভিতরের অবিনশ্বর বেঁচে থাকার শক্তিও বসন্তেরই আরেক রূপ। তাঁর সেই বিখ্যাত পঙ্তি-

“ফুল ফুটুক না ফুটুক, আজ বসন্ত।”

সমর সেনের কবিতায় বসন্ত আরও নিষ্ঠুর ও নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়ায়। তাঁর বসন্ত আসতে চায়—

“সবুজ উদ্দাম বসন্ত!”

কিন্তু শহুরে ক্লান্ত জীবন, যান্ত্রিক সময়, সামাজিক অবক্ষয় তাকে বারবার আটকে দেয়। এখানে সময় “মরে” যায় ঘড়ির কাঁটায়, প্রেম হারিয়ে যায় কৃত্রিম মিষ্টতার ভিড়ে, আর দৈনন্দিন দৃশ্যপট হয়ে ওঠে মৃত্যু ও ক্লান্তির প্রতীক—

“ডাস্টবিনের সামনে / মরা কুকুরের মুখের যন্ত্রণায় / সময় এখানে কাটে।”
এই কবিতায় বসন্ত কেবল হত্যাকারী নয়, বরং নিজেই বারবার নিহত হয়। শেষ পর্যন্ত যে “এপ্রিলের বসন্ত” দেখা দেয়, তা
“উজ্জ্বল, ক্ষুধিত জাগুয়ার”—

একটি ক্ষুধার্ত, আক্রমণপ্রবণ শক্তি, যা ভালোবাসা ও জীবনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্যত।
ফলে দেখা যায়, নজরুলের বসন্ত রক্তাক্ত ও কামনাময়, সুভাষের বসন্ত প্রত্যয়ী ও অদম্য, আর সমর সেনের বসন্ত শহুরে জীবনের চাপে ক্ষুধিত ও হিংস্র। তিনজনের কবিতায় বসন্ত প্রকৃতির ঋতু নয়—এটি সময়, সমাজ ও মানুষের চেতনার এক তীব্র রূপক।
মহাদেব সাহা ‘বসন্তের একটি বাংলা উদ্ধৃতি’ কবিতায় বসন্ত কোনো উজ্জ্বল ঋতুর নাম নয়; বরং মানুষের দীর্ঘ শীতের মতো দহনময় জীবনের প্রতীক। কবি দেখান, প্রকৃতির বার্ধক্য ও রিক্ততায় চৈত্রের মতো উজ্জ্বল ঋতুও মুছে দিতে পারে না মানুষের অভ্যন্তরের দুর্দশা। শীত মানে শুধু আবহাওয়ার ঠান্ডা নয়; এটি জমে থাকা দুঃখ, যন্ত্রণা, মনখারাপের এক মানসিক স্তব্ধতা। তিনি লিখেছেন—

“চুনা ওঠা দেয়ালের মতো
প্রকৃতির এই খসখসে গালে
আর কী রং মাখাবে চৈত্র?”

কবি জানেন, পকেটে লুকিয়ে থাকা শতবর্ষের শীতকাল কোনো সহজ বসন্তে শেষ হবে না। শিশুর মতো হামাগুড়ি দিয়ে তিনি কতকাল শীত পেরিয়েছেন, তবু বসন্ত যেন তার কাছে পৌঁছোতেই চায় না। গুনগুন করা দুপুর কিংবা চৈত্রসন্ধ্যার হাতছানি তাকে আর ডাকতে পারে না। কারণ তার ভেতরের শীত এখনো অপসৃত হয়নি। তাই তার প্রশ্ন—কবে আসবে মুক্তি? কবির আশা-আকাঙ্ক্ষা জেগে ওঠে ক্ষীণ আলোর মতো—হয়তো কোনো প্রেম, কোনো শরীরী উষ্ণতা, কোনো নবজাগরণ শীতকে সরিয়ে দেবে। তিনি বলেন—

“হয়তো তবু সদ্যফোটা স্তনের গন্ধে,
ঠোঁটের লাবণ্যে জেগে উঠবে ঝিমিয়েপড়া দিনরাত্রি।”

শেষে কবি জানেন, বসন্তই হয়তো তাকে তার দীর্ঘ হিমযুগ পার করে দিতে পারে। তাই তিনি বসন্তকে আহ্বান করেন—

এসো, আমরা একসঙ্গে নদী-নদী পেরিয়ে যাই,
বসন্তের বাংলা উদ্ধৃতি শোনাতে শোনাতে।

তসলিমা নাসরিন ‘ভুল প্রেমে কেটে গেছে তিরিশ বসন্ত’ তসলিমা নাসরিনের কবিতায় বসন্ত কোনো সৌন্দর্যের ঋতু নয়; বরং প্রেমের ভুল, প্রতারণা, এবং আবেগগত দুর্বলতার এক জীবনব্যাপী ব্যথার সাক্ষী। তিন দশক ধরে ভুল প্রেমের আগুনে পুড়ে তিনি বার বার বুঝেছেন, প্রেমের টানে মানুষ কতটা অসহায়। কবি বলেন—

“ভুল প্রেমে কেটে গেছে তিরিশ বসন্ত,
তবু এখনো কেমন যেন হৃদয় টাটায়।”

এই টানা প্রতারণার মাঝেও তিনি দেখতে পান মানুষের হৃদয়ের অদ্ভুত দুর্বলতা—প্রতারক পুরুষেরা যখনই ডাক দেয়, তখনই তিনি সব ভুলে আবার নতুন ভুলের দিকে পা বাড়ান। অভিজ্ঞতা, বেদনা, স্মৃতি—কিছুই তাকে থামাতে পারে না। তার পুরো অস্তিত্ব আবার শিশুর মতো কেঁদে ওঠে, ভালোবাসার জন্য তৃষ্ণার্ত হয়ে ওঠে। তিনি বলেন—

“একবার ডাকলেই ভুলে যাই মেঘলা আকাশ,
না ফুরানো দীর্ঘ রাত।”

এ ধারাবাহিক ভুল তাকে ক্লান্ত করে, ক্ষতবিক্ষত করে, তবুও তাকে শিক্ষা দেয় না। তসলিমার দৃষ্টিতে এই নির্বোধি মেয়েলিপনা যেন অন্তহীন। তিনি জানেন—হাজার বছর গেলেও হয়তো এই নির্বোধ বালিকার বোধ জন্মাবে না। বসন্ত এখানে প্রতারণার মতোই ফিরে ফিরে আসে—অজান্তেই, এক ভুলের পর আরেক ভুলের অপেক্ষায়।

(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)