অভিলাষ মাহমুদ »
সময়ের চাকা ঘোরে অবিরাম। ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে প্রতিবছরই আমাদের দ্বারে ফিরে আসে পবিত্র ঈদুল ফিতর। এটি কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি বাঙালির সংস্কৃতি, আবেগ এবং সামাজিক মেলবন্ধনের এক পরম লগ্ন। কিন্তু উৎসবের রঙ যেন সময়ের সাথে সাথে অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে, রূপ নিয়েছে এক যান্ত্রিক আনুষ্ঠানিকতায়। আজ চারদিকে প্রযুক্তির জয়জয়কার। স্মার্টফোনের স্ক্রিনে টুং করে ওঠা একটা ‘ইমোজি’ বা ফরওয়ার্ড করা একঘেয়ে মেসেজেই সেরে ফেলা হয় ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়। মুহূর্তের মধ্যে হাজারো মানুষকে একই বার্তা পাঠিয়ে আমরা দায়িত্ব শেষ করি। অথচ মাত্র দুই দশক আগেও ঈদের আনন্দটা ছিল একেবারে অন্যরকম—প্রাণবন্ত, আন্তরিক এবং অপেক্ষায় ভরা। তখন ঈদ মানে ছিল কেবল একদিনের উৎসব নয়; ঈদ ছিল দীর্ঘ প্রতীক্ষা, গভীর আবেগ এবং একমুঠো হাতে ছোঁয়া স্মৃতির কোলাজ, যা আজও আমাদের নস্টালজিক করে তোলে।
হারিয়ে যাওয়া সেই ঈদ কার্ডের সোনালী দিনগুলো
সেই সময় রমজান মাসের মাঝামাঝি থেকেই পাড়ায় পাড়ায় শুরু হতো এক অন্যরকম উত্তেজনা। ছোট ছোট দোকানগুলোতে, এমনকি ফুটপাথেও সারি সারি সুতোর ওপর ঝুলত বাহারি সব ঈদ কার্ড। কোনোটিতে রঙিন ঝকঝকে মসজিদের ছবি, কোনোটিতে ফুটে থাকত একগুচ্ছ টকটকে গোলাপ, আবার কোনোটিতে ছিল দুই বন্ধুর আন্তরিক কোলাকুলির দৃশ্য। স্কুলের টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে বা মা-বাবার কাছ থেকে বায়না করে নেওয়া টাকায় সেই কার্ড কেনা ছিল এক বিশাল প্রাপ্তি। কার্ডের দোকানগুলোতে ভিড় জমাত সব বয়সের মানুষ।
কার্ড কেনার পর চলত গভীর গোপনীয়তার পালা। কাকে কী লেখা যায়, কার জন্য কোন ডিজাইনটি সবচেয়ে মানানসই—এ নিয়ে চলত বিস্তর গবেষণা। নীল বা লাল কালির কলমে কার্ডের ভেতরে কাঁপাকাঁপা হাতের লেখায় ফুটে উঠত অকৃত্রিম ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা। ‘ঈদ মুবারক’ লেখার পাশাপাশি নিচ দিয়ে ছোট করে লিখে দেওয়া হতো—”ইতি, তোমার বন্ধু” বা ুতোমার শুভাকাঙ্ক্ষী”। সেই একটা কার্ড খামে ভরে, তাতে টিকিট লাগিয়ে ডাকবাক্সে ফেলার পর শুরু হতো অধীর অপেক্ষা। বন্ধু বা প্রিয়জন কবে কার্ডটি পাবে, আর পাল্টা উত্তর কবে আসবে—সেই প্রতীক্ষার মধুরতা আজকের ‘ইনস্ট্যান্ট মেসেজিং’-এর যুগে খুঁজে পাওয়া কল্পনাও করা অসম্ভব। ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘন্টির আওয়াজ শুনলেই বুকটা ধক করে উঠত—হয়তো কোনো প্রিয়জনের কার্ড এসেছে! সেই সময়ের ঈদ কার্ড ছিল কেবল কাগজ নয়; তা ছিল হৃদয়ের এক টুকরো আবেগ, যা আজও অনেকের পুরোনো বাক্সে সযত্নে রাখা আছে।
বিবর্ণ ডাকবক্স ও ডাকপিয়নের স্মৃতি
ঈদ কার্ডের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে ছিল ডাকব্যবস্থা। পাড়ার মোড়ে মোড়ে ঝুলন্ত সেই লাল ডাকবক্সগুলো যেন ছিল আবেগের আধার। রমজান মাসে ডাকবক্সগুলো চিঠিতে উপচে পড়ত। ডাকপিয়নদের ব্যস্ততা বেড়ে যেত বহুগুণ। সাইকেলের পেছনে বিশাল চামড়ার ব্যাগ ঝুলিয়ে তারা বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঈদ কার্ড পৌঁছে দিতেন। রোজা রেখেও তাদের এই নিরলস পরিশ্রম উৎসবের আনন্দকে সবার দ্বারে পৌঁছে দিত। আজ সেই ডাকবক্সগুলো বিবর্ণ, মরিচা ধরা। ডাকপিয়নরা আর আগের মতো ঈদ কার্ডের বোঝা নিয়ে আসেন না। প্রযুক্তির আগ্রাসনে ডাকব্যবস্থার সেই সোনালী অধ্যায় আজ ইতিহাস। ঈদ কার্ডের সাথে সাথে হারিয়ে গেছে ডাকপিয়নের সাইকেলের সেই পরিচিত ঘন্টির আওয়াজ এবং আত্মীয়-স্বজনের হাতের লেখার উষ্ণতা।
পোশাকের ভাঁজে লেগে থাকা অনাবিল আনন্দ
আজকের দিনে আমরা সারা বছরই টুকটাক কেনাকাটা করি; শপিং মলগুলোতে বারো মাসই ভিড় থাকে। তাই ঈদের পোশাকের সেই বিশেষ মাহাত্ম্য যেন খানিকটা কমে গেছে। কিন্তু শৈশবে ঈদের নতুন জামা ছিল এক পরম আরাধ্য বস্তু, যা প্রাপ্তির আনন্দ ছিল অতুলনীয়। রমজানের শুরুর দিকেই জামা কেনা হয়ে গেলেও ঈদের দিন সকালের আগে তা পরার বা এমনকি ভালোভাবে দেখার অনুমতি থাকত না। আলমারির এক কোণে বা বাক্সের ভেতরে সযত্নে রাখা সেই নতুন কাপড়ের সুবাস আজও অনেকের নাকে লেগে আছে। দিনে অন্তত দশবার গিয়ে সেই জামাটি লুকিয়ে দেখে আসা ছিল ছোটদের নিয়মিত রুটিন। সেই সময়ে জামার জৌলুসের চেয়ে বড় ছিল তা প্রাপ্তির আনন্দ এবং বন্ধুদের দেখানোর উত্তেজনা। কার চেয়ে কার জামার পকেট বেশি, কার জুতোতে ‘লাইট’ জ্বলে বা শব্দ হয়—এসব ছিল পাড়ার ছোটদের মূল আলোচনার বিষয় এবং আভিজাত্যের প্রতীক। দর্জির দোকানগুলোতে চলত দিনরাত কাজ, শেষ মুহূর্তে জামা ডেলিভারি নেওয়ার জন্য ভিড় জমাত মানুষ। নতুন পোশাকের সেই গন্ধ আর ভাঁজ খোলার আনন্দ শৈশবের ঈদের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
রান্নাঘর থেকে আসা সেই ম ম সুবাস
ঈদের আগের রাত বা চাঁদরাত ছিল উৎসবের আসল সূচনা। চাঁদ দেখার সাথে সাথেই পাড়ায় পাড়ায় আনন্দ-উল্লাস শুরু হয়ে যেত। রেডিও বা টেলিভিশনে বেজে উঠত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই কালজয়ী গান—”ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশীর ঈদ”। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা সেমাই ভাজার সুবাস আর পোলাও-মাংসের ম ম গন্ধে ভরে থাকত সারা বাড়ি। মা-চাচিদের ব্যস্ততা থাকত তুঙ্গে। আধুনিক এই সময়ে অনেক সময় রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার অর্ডার করা হয় কিংবা ক্যাটারিং সার্ভিসের ওপর নির্ভর করা হয়। কিন্তু বাড়ির বড়দের নিজ হাতে তৈরি সেই হাতে কাটা সেমাই, দুধ-সেমাই, জর্দা বা মাটির উনুনে ধীর আঁচে রান্না করা ফিরনির স্বাদ কোনো ফাইভ স্টার হোটেলও দিতে পারবে না। ঈদের দিন সকালে নামাজ শেষে ঘরে ফিরলেই টেবিল ভরা থাকত নানা পদের খাবার। সবাই মিলে একসাথে বসে খাওয়ার সেই আনন্দ আজ ডাইনিং টেবিলের একাকীত্বে হারিয়ে গেছে। রান্নাঘরের সেই সুবাস আর স্বাদের স্মৃতি আজও আমাদের ক্ষুধার্থ করে তোলে।
চাঁদরাতের রেডিও ও টেলিভিশন: বিনোদনের কেন্দ্রবিন্দু
চাঁদরাতে বিনোদনের প্রধান মাধ্যম ছিল রেডিও ও টেলিভিশন। বিশেষ করে বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) অনুষ্ঠানমালা দেখার জন্য সবাই উন্মুখ হয়ে থাকত। ‘আনন্দমেলা’ বা বিশেষ ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানগুলো ছিল বিনোদনের কেন্দ্রবিন্দু। হানিফ সংকেতের ‘ইত্যাদি’ বা অন্যান্য জনপ্রিয় অনুষ্ঠানগুলো পরিবারের সবাই মিলে একসাথে দেখার রেওয়াজ ছিল। রেডিওতে ঈদের বিশেষ নাটক ও গান সম্প্রচারিত হতো। আজকের মতো শত শত স্যাটেলাইট চ্যানেল বা ইউটিউব ছিল না, কিন্তু সেই সীমিত বিনোদনের মাঝেই ছিল অপরিসীম আনন্দ ও তৃপ্তি। চাঁদরাতে রেডিও বা টিভির সামনে বসে থাকা ছিল উৎসবের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সালামি ও মাটির ব্যাংক: ছোটবেলার সঞ্চয়
ঈদের দিন ছোটদের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল ‘সালামি’ বা ‘ঈদী’। ঈদের নামাজ শেষে বড়দের পা ছুঁয়ে সালাম করার পর মিলত কাঙ্ক্ষিত সালামি। কড়কড়ে নতুন নোটের সালামি পাওয়া ছিল এক বিশাল বিজয়। সেই টাকা খরচ করার নানা পরিকল্পনা চলত ছোটদের মনে। কেউ কিনত খেলনা, কেউ বা আতশবাজি। আবার অনেকেই সালামির টাকা সযত্নে রাখত মাটির ব্যাংকে। সারা বছর ধরে সালামি ও অন্যান্য খুচরো টাকা জমিয়ে ব্যাংক ভর্তি করা এবং পরে তা ভেঙে টাকা গোনার আনন্দ ছিল অতুলনীয়। সালামির টাকা দিয়ে বন্ধুদের সাথে ভাগ করে খাওয়ার মাঝে ছিল সম্প্রীতির ছোঁয়া। আজ সালামির সংস্কৃতি আছে, কিন্তু সেই নতুন নোটের উষ্ণতা আর মাটির ব্যাংকের স্মৃতি আজ প্রায় বিলীন।
যান্ত্রিকতা বনাম আন্তরিকতা: এক বিশাল ব্যবধান
আজ আমরা প্রযুক্তির চূড়ায় বসে আছি। আমাদের হাতে এখন স্মার্টফোন, আঙুলের ডগায় সারা পৃথিবী। ঈদের দিন সকালে এখন ঘুম ভাঙে সোশ্যাল মিডিয়ার অবিরাম নোটিফিকেশনে। ফেসবুকে শত শত মানুষের জন্য একটা ‘কমন’ স্ট্যাটাস বা হোয়াটসঅ্যাপে একঘেয়ে মেসেজ ফরোয়ার্ড করে আমরা দায়িত্ব শেষ করছি। অথচ আগে ঈদের নামাজ শেষে পাড়ার প্রতিটি ঘরে ঘরে যাওয়া ছিল এক অলিখিত নিয়ম। সেমাই-চিনির লোভে নয়, বরং সবার সাথে দেখা করা, কুশল বিনিময় করা এবং বড়দের পা ছুঁয়ে সালাম করার মধ্যে যে শিষ্টাচার ও আন্তরিকতা ছিল, তা আজ ক্রমে বিলীন হচ্ছে। আজ আমরা পাশাপাশি বসে থেকেও একে অপরের চোখের দিকে না তাকিয়ে ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকি। প্রযুক্তির এই যান্ত্রিকতা আমাদের যোগাযোগ বাড়ালেও মনের দূরত্ব কমিয়ে আনতে পারেনি। আগে মানুষ মানুষের সাথে ঈদ উদযাপন করত, আর এখন আমরা ঈদ উদযাপন করি ক্যামেরার সাথে। কার ছবি কত সুন্দর হলো, কতগুলো ‘লাইক’ বা ‘কমেন্ট’ পড়ল—সেটাই যেন এখন ঈদের মূল সার্থকতা ও আনন্দ।
সম্প্রীতির পাড়া-সংস্কৃতি: এক হারানো অধ্যায়
সেই সময়ে ঈদের আনন্দ কেবল নিজের পরিবারের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকত না। পাড়ার প্রতিটি ঘরে ঘরে চলত ঈদের আমেজ। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সবার বাড়িতে সেমাই-মিষ্টি খাওয়ার এক অসাম্প্রদায়িক পরিবেশ ছিল। ঈদের দিন পাড়ার সবাই মিলে কোলাকুলি করা এবং একে অপরের ঘরে যাওয়া ছিল এক সুন্দর রেওয়াজ। এই সম্প্রীতির পাড়া-সংস্কৃতি আজ ফ্ল্যাট সংস্কৃতির আড়ালে হারিয়ে গেছে। আজ আমরা পাশের ফ্ল্যাটের মানুষের খবরও রাখি না, ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মানসিকতা কমে গেছে।
ফিরিয়ে আনা যায় কি সেই সারল্য?
শৈশবের সেই ধুলোমাখা, সারল্যমাখা দিনগুলো হয়তো আর ফিরে আসবে না। সময় বদলেছে, বদলেছে মানুষের রুচি ও জীবনযাত্রা। কিন্তু উৎসবের মূল সুর তো মানুষের সাথে মানুষের মেলবন্ধন ও সম্প্রীতি। যান্ত্রিকতার এই প্রবল চাপে আমরা যেন আমাদের শেকড়কে ভুলে না যাই। এই ঈদে অন্তত একটা দিন ফোনের জগত থেকে বেরিয়ে এসে পাশের মানুষটির সাথে কথা বলা যেতে পারে, তার চোখের দিকে তাকিয়ে হাসি বিনিময় করা যেতে পারে। দামী গিফটের বদলে নিজের হাতে লেখা একটা সাধারণ চিরকুট কি প্রিয়জনকে দেওয়া যায় না? সেই হাতে লেখা চিঠির টান আর কার্ডের গন্ধের মাঝে যে প্রাণের ছোঁয়া ছিল, তা ফিরিয়ে আনা হয়তো পুরোপুরি সম্ভব নয়, কিন্তু তার নির্যাসটুকু আমরা আমাদের যান্ত্রিক জীবনের মাঝেও আগলে রাখতে পারি।
স্মৃতি ও বর্তমানের মেলবন্ধন
স্মৃতির জানালা দিয়ে যখন পেছনের দিকে তাকাই, তখন মনে হয়—ঈদের সেই ধুলোমাখা দিনগুলোই ছিল শ্রেষ্ঠ। যেখানে কৃত্রিমতা ছিল না, ছিল না দেখানোর প্রতিযোগিতা। ছিল কেবল বুক ভরা ভালোবাসা, আন্তরিকতা আর এক আকাশ আনন্দ। আজকের এই প্রযুক্তিনির্ভর যুগে দাঁড়িয়ে আমাদের উচিত সেই হারানো সারল্যকে কিছুটা হলেও বর্তমানের মাঝে বাঁচিয়ে রাখা। ঈদ হোক কেবল সোশ্যাল মিডিয়ার স্ট্যাটাস বা ছবির জন্য নয়, ঈদ হোক হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের মিলনের জন্য। যান্ত্রিকতার ভিড়ে আমরা যেন হারিয়ে না ফেলি উৎসবের মূল চেতনা—ভালোবাসা, ত্যাগ ও সম্প্রীতি। শৈশবের ঈদের সেই স্মৃতির নির্যাসটুকু বুকে ধারণ করেই আমরা যেন বর্তমানের ঈদকে আরও অর্থবহ ও আনন্দময় করে তুলতে পারি।






















































