সুকুমার বড়ুয়া ছড়ারাজ্যের বিস্ময়

ইলিয়াস বাবর »

জনজীবনের মূল্যহীন ঘটনা বা কৃষ্টিতে সুকুমার বড়ুয়ার ছড়া রচনার প্রধান অবলম্বন। দশের চোখের ভেতরে থেকেও তিনি অনন্য হয়ে ছড়ায় আঁকতে থাকেন আমাদের শৈশব-চারপাশ-বিশ্বাস-প্রতারণার বিবিধ বেলুন। আমাদের হাহাকার তার ছড়ায় পায় মূর্ততা, আনন্দের বাড়াবাড়ি তার ছড়ায় আশ্রয় নিয়েই পায় কলহাসির সাহস। অশিতীপর এ শিল্পীর বেঁচে থাকার কিংবা শিল্পের উঠোনে বাহাদুরি ফলানোর একমাত্র মাধ্যম ছড়া; ফলে যাবতীয় মনোযোগের তীব্রতা নিয়েই সবটুকু ভালোবাসা উজার করে পায় শুধু ছড়া-ই— বাংলাসাহিত্য গর্ব করার মতোন সব পংক্তিতে নিজের নাম খোদাই করে নেন নিজেরই অজান্তে। আমাদের অভিভাবক সমাজে সন্তানদের শিক্ষিত করার জন্যে যে প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা তার নজির দেখতে পাই বিভিন্ন প্রতিযোগীতামূলক পরীক্ষায়, প্রশ্নপত্র-রেজাল্ট ফাঁসের মাধ্যমে। কমে আসছে বিনোদনের জায়গা, খেলার মাঠ। কেবলই পড়া পড়া আর পড়া। ‘এটুক শুধু চাই’ ছড়ায় দেখা যাক শিক্ষিত হওয়ার প্রবল বাসনা— ‘এটুক শুধু চাই—/ একটু আলো ছড়িয়ে পড়ুক/ যেথায় আলো নাই।/ অবুঝগুলো বুঝতে পারুক/ জানতে পারুক তারা,/ মূর্খ খেতাব গ্রহণ করে/ জীবন কাটায় যারা।/ একটু হাসি ছড়িয়ে পড়ুক/ কান্নাঝরা মুখে,/ এটুক চাওয়া রয় যেন গো/ নিত্য আমার বুকে।’ মূর্খ্যতা অবশ্যই পাপ। শিক্ষার আলোয় জ্বলে উঠতে না পারলে মানবিক সুকুমার বৃত্তিগুলোর বিকাশ হয় না। অবশ্য ছড়াটি রচনা হয় মে ১৯৬৩ সালে, তার প্রেক্ষাপট থেকে আমরা অনেক দূরে আছি, অনেক এগিয়ে আছি। দেশ স্বাধীন হয়েছে, দেশের মানুষ মুক্ত হয়েছে, বেড়েই চলছে শিক্ষার হার। তবে আরো অনেক দূর পথ পাড়ি দিতে হবে আমাদের। এত সব প্রয়োজনীয়তার ভেতরেও জেগে ওঠে আমাদের গোপন অভিলাষ। শিশুদের মানসের সাথে একাকার হয়ে যায় আমাদের মৌল চাওয়া। ‘এমন যদি হতো—/ ইচ্ছে হলেই আমি হতাম/ প্রজাপতির মতো।/ নানান রঙের ফুলের পরে/ বসে যেতাম চুপটি করে/ খেয়াল মতো নানান ফুলের/ সুবাস নিতাম কত।/ এমন হতো যদি—/ পাখি হয়ে পেরিয়ে যেতাম/ কত পাহাড় নদী।/ দেশ-বিদেশের অবাক ছবি/ এক পলকে দেখে সবি/ সাতটি সাগর পাড়ি দিতাম/ উড়ে নিরবধি।’ এমনই আজগুবি অথচ শিশুবাস্তবতার সুনিপুন ছবি দেখতে পাই ‘এমন যদি হতো’ ছড়ার শরীর জুড়ে। এক্ষণে আমাদের স্মরণে রাখা দরকার, ছড়া শুধু শিশুদের জন্যেই নয়, বড়োদের তৃঞ্চা আর জিজ্ঞাসার জবাব দিয়ে যায় একই সাথে। অভিধাননির্ভর শব্দে নয়, চলার পথের টুংটাং, চাওয়া-পাওয়ার খুচরো শব্দবন্দে অলংকৃত সুকুমার বড়ুয়ার ছড়া।
গ্রাম-শহরের এ বিভেদ অথবা কঠিন বাস্তবতাকে মেনে নিয়েও আমাদের নগরমুখি হতে হয় নানা কারণেই। স্বাভাবিকভাবেই নগরের সাথে গ্রামের ফারাক আকাশ-পাতাল। অবশ্য উপশহর আর প্রযুক্তিগত সুবিধার দরুন ব্যবধান কমে আসলেও আমরা দেখে উঠি এরকম বাস্তবতা— ‘হাঁক দেয় ফেরিঅলা—ডালমুট চানাচুর,/ কড়াভাজা খেতে মজা স্বাদে ঘ্রাণে ভরপুর।’/ বুট ভাজা, ভাজা ডিম/ লেমোনেড আইসক্রিম/ নিজ নিজ পথে সবে চলে যায় সুড় সুড়/ কেউ বলে ‘একি জ্বালা কাঠাফাটা রোদ্দুর।’ ‘শহরের রাস্তা’ ছড়ায় এভাবেই নাগরিক জীবনের প্রাত্যহিক বাস্তবতাকে চিত্রিত করে যান সুকুমার বড়ুয়া। তার ছড়ার অনন্য বৈশিষ্ট্য অনুপ্রাসের দুরন্ত খেলা, শব্দ নির্বাচনের মুন্সিয়ানা; তাতে জীবনের বিপুল অভিজ্ঞতা যোগ করে বাড়তি সৌন্দর্য, যা একেবারেই অভূতপূর্ব— ছড়াসাহিত্যের দুর্লভ সংযোজন। এরপরেও সুকুমার বড়ুয়া ভুলে যান না ছড়ার সাথে জড়িয়ে থাকা শিশুআনন্দের কথা। শিশুরা দেবদূত, তারা প্রকৃতির ছন্দময়তার সাথে মিলিয়ে পড়তে চায় তাদের জীবনের প্রথম পাঠ, প্রথম শোনা ও শেখা। ছড়ার সাথে শ্রুতির অবিচ্ছেদ্য সর্ম্পক আছে বলেই ছড়াকারকে সচেতন থাকতে হয় ছন্দের ব্যাপারে, বুনন ও অন্যান্য ব্যাকরণের দিকগুলোয়। তাছাড়া ঐতিহ্যগতভাবেই আমরা বেড়ে উঠি ছড়া শুনে, ছন্দের ঝংকারে। শিল্পের অন্যান্য মহার্ঘ্য মাধ্যম থাকার পরেও ছড়াকেই কেন বেছে নেয় আমাদের মা-দিদিরা? তার প্রধানতম কারণ ছন্দশ্রুতি ও আনন্দ। উদ্ভট আনন্দের ব্যাপারটি ছড়া যেভাবে ধরতে পারে তা অন্য মাধ্যমে অপ্রতুল। ‘ব্যাঙবাবু’ ছড়াটি পড়লেই আমাদের মনে পড়ে যায় দারুন সব লৌকিক ছড়ার কথা, অর্থহীন দ্যোতনার কথা। পড়া যাক ছড়াটি— ‘আধুনিক ব্যাঙ বাবু/ বৈজ্ঞানিক উপায়ে,/ লাফ-ঝাঁপ ভুলে গিয়ে/ হাঁটে সোজা দু’পায়ে;/ বর্ষায় পথ চলে/ রাবারের ‘সু’ পায়ে,/ মনে বড় ব্যথা পেলে/ কেঁদে ওঠে ফুঁপায়ে।’ কিছুই না থাক, একটা রস আছে ছড়াটিতে যা আমাদের শৈশবকে স্বপ্ন দেখতে শেখায়, রঙিন করতে শেখায়; এমনটি যারা জীবনযন্ত্রণায় কাহিল তাদের শেখায় নতুন করে হাসতে। সময়ের বির্বতনে হয়তো উপকরণ বদলে যায় ব্যবহারের, পরিবর্তনের সাড়া দিয়ে আমাদের দাদুরাও এমন ছড়া কেটে যায় অনায়াসেই— ‘দাদু যাবেন ভিনিস/ আনতে নতুন জিনিস/ কী আনবে? কী আনবে?/ মশা মারার ‘ফিনিশ’।’ ‘দাদু-নাতি’র এ মধুর খেলা সুকুমার বড়ুয়া আত্মস্থ করেন মানবিক চোখ দিয়ে। ফলে তাদের বর্ণিল শৈশবের সাথে আমরা ফিরে যাই সুন্দর সময়ের কাছে। ছড়া হয়ে যায় যুগের সেতু, বন্ধনের পবিত্র দৃঢ়তা। কিচ্ছা-গপ্পের সময় খোকার স্বপ্নকে দূর দিগন্ত দিয়ে পর্যটন করাতে আমরা নিশ্চয়ই ‘টুনির ছা’ ছড়াটির পাঠ নিতে পারি— ‘টুনির ছা লো—টুনির ছা/ একটা কথা শুইন্যা যা/ বাগুন গাছের তলে রে/ চক্ষু দুইটা জ্বলে রে/ টুন টুনা টুন পাখির ছা…/ ফুরুৎ ফুরুৎ উইড়া যা।’ লোকাল টোনে এমন ছড়ার ফোড়ন শুনে খোকারও তখন উড়তে যাবার দশা। ক্রমাগত হারিয়ে যাওয়া সুস্থতার ভেতর এরকম বিনোদন, সুন্দর হাসি, নির্মল বেড়ে ওঠার জন্য দরকার এমনতর ছড়া। দুঃখের বিষয়, আমরা সংস্কৃতির অনেক গুরুত্বপূর্ণ দিকের সাথে ভুলে যাচ্ছি এমন সব লাইন, চমক জাগানো পঙক্তিগুচ্ছ।
সময়ের সাথে সাথে আমাদের পার্থিবতায় যোগ হতে থাকে করুণ ব্যাধি। এসব প্রতিরোধে প্রশাসনের ভূমিকার কথা অস্বিকার না করেই কবুল করে নিতে হয় ব্যক্তিগত দায়িত্বও কম নয়। যৌতুকের নেতিবাচক বিষ আমাদের সমাজকে করছে কলুষিত। কন্যাকে করতে হয় মুখ কালো, পিতাকে বয়ে বেড়াতে হয় কন্যাদায়গ্রস্থ পিতার অভিশাপ। জানুয়ারি ১৯৬৭ সালে রচিত ‘উপহার’ ছড়ায় সুকুমার বড়ুয়া প্রচলিত এ বিষবৃক্ষকে ইঙ্গিত করেই বলেন— ‘বরের বাড়ি আগরতলা/ কনের বাড়ি কটক,/ বিয়ের তারিখ পাকাপাকি/ ঠিক করেছেন ঘটক।/ শুন্য হাতে আসলে পরে/ দেয় তাড়িয়ে হেলায় ভরে/ উপহারের বাকস দেখে/ তবেই খোলেন ফটক।’ উপহারের আড়ালে জোরজবরদস্তির কথা অনায়াসেই চলে আসে উপর্যুক্ত ছড়ায়। ছড়াটির আয়তন বেশ বড় নয় কিন্তু আবেদনের ব্যাপ্তি বিশাল। উল্লেখ করার মতো ব্যাপার সুকুমার বড়ুয়ার ছড়ার অন্ত্যমিল প্রচলিত ঢঙের বাইরে, একেবারেই নতুন। তিনি নিজেই সৃষ্টি করেন অদ্ভূত সব মিল, শব্দের বশিকরণে তার প্রশ্নাতিত দক্ষতা তাকে করেছে মহান, তার ছড়াকে দিয়েছে বিশিষ্ট স্থান। ছড়া নিয়ে প্রতিনিয়তই তাচ্ছিল্য হয় আড্ডায়, চায়ের টঙে কিন্তু সুকুমার বড়ুয়ার ছড়াকে কুর্ণিশ করে। তিনি এক্ষেত্রে দ্রষ্টা, ত্রাতা।
জাতির পিতাকে নিয়ে আমাদের সৃজনশীল মানুষদের নানা মাধ্যমের কাজ অনেকেই করছে। কেউবা রঙ-রেখায়, কেউবা ভাস্কর্যে, কেউবা নাটক-মঞ্চে। বাদ যায়নি গল্পের দুনিয়া, কবিতার বিকিরণ। কিন্তু অতি মাত্রায় ব্যবহারে, বলা ভালো, অমেধাবীদের চর্বিত চর্বনে তা অনেক সময় হারিয়ে ফেলে শিল্পের ন্যুনতম মান। অথচ সুকুমার বড়ুয়া অনেকভাবেই আনেন প্রিয় নেতাকে, পিতাকে— তারই প্রিয় মাধ্যম ছড়ায়। ‘বিশাল মুজিব’ ছড়ায় যেমন দেখা যায়— ‘সাড়ে সাত কোটি মানুষের নেতা/ জনতা দ্বিগুন আজ/ স্বদেশে বিদেশে মানব চিত্তে/ জীবন্ত মহারাজ।/ সোনার বাংলা সোনার মানুষে/ একদিন যাবে ভরে/ স্বাধীন স্বদেশে পিতার স্বপ্ন/ পৌঁছাবে ঘরে ঘরে।’ কিংবা ‘মহামানব’ ছড়ায় দেখা যাক— ‘মানব জীবন ধন্য তোমার/ ধন্য মুজিব ধন্য/ জীবন মরণ পণ ছিল এই/ বাংলাদেশের জন্য।’ যদিওবা ‘মহামানব’র আঙ্গিকে আমাদের শৈশবেই পড়ে উঠি অসাধারণ এক ছড়া সুকুমার বড়ুয়ার— ‘ধন্য সবাই ধন্য/ অস্ত্র ধরে যুদ্ধ করে/ মাতৃভূমির জন্য।’ এতসব ঢামাঢোলের ভেতরেও তিনি ভোলেন না নেতা নামের অনেক অমানুষের চরিত্র। নানা সময়ে আমাদেরই স্বাধীন বাংলাদেশে বিচিত্র রকমের নেতাদের দেখি, যারা দেশপ্রেমের ভাওতাবাজি করে নিজের আখের গুছিয়েছেন। ‘বন্ধু’ নামের ছড়ায় এটাই যেন মূর্ত হয়ে ওঠে— ‘দিনের বেলায় দীনের বন্ধু/ রাতের বেলায় কার?/ কী-যে বলেন কী-যে করেন/ বোঝাই হোল ভার।’ নিজের সমাজকে, স্বকালকে চেনেন বলেই; সমাজের নানা কিছিমের জিজ্ঞাসা তাকে তাড়িত করে বলেই তিনি অন্যদের চেয়ে আলাদা হয়ে যায় ছড়ার সন্ন্যাসে, ছড়ার সাধনা ও নির্মাণে। বর্তমানে রচিত অনেক ছড়াই তেমন করে পাঠককে আর টানে না অথবা চর্বিত চর্বনের দোষে অনেক ছড়াকারই প্রায় মৃত অথচ সুকুমার বড়ুয়া বিশ্বসংঘ নিয়ে যখন এভাবে ছড়া লেখেন তখন শিক্ষিত কি গেঁয়ো, বড় কর্তা কি মুচি সবারই সমান তৃঞ্চা, সবারই সমান দৃষ্টি কাড়েন— ‘জগৎ সেরা ভূতের বাসা ওয়াশিংটন ডি.সি.-তে/ কেউটে সাপের বিষ ভরে দেয় খাঁটি মধুর শিশিতে/ নাম ফাটাতে জগৎ জোড়া/ বানায় বিরাট পাথর গোড়া/ ট্রেনিং চালায় সেই নোড়াতে মানবশিশু পিষিতে।’ এভাবে অনেক লেখায়, বলতে গেলে সুকুমার বড়ুয়া তার দীর্ঘ ছড়াযাপনে জীবনকে নানা দিক দিয়ে পর্যবেক্ষণের সুযোগ নিয়েছেন। ছড়ার জয় হোক, জয়তু সুকুমার বড়ুয়া।