নদীমাতৃক বাংলাদেশে কৃষি, প্রকৃতি এবং অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো আমাদের জলাধার। দীর্ঘ সময় ধরে পলি জমে ভরাট হওয়া এবং অবৈধ দখলের কবলে পড়ে দেশের অসংখ্য খাল আজ মৃতপ্রায়। এই প্রেক্ষাপটে সরকারের উদ্যোগে সারা দেশের ৫৪টি জেলায় একযোগে খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি শুরু হওয়া একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও আশাব্যঞ্জক পদক্ষেপ। এটি কেবল একটি প্রকৌশলগত প্রকল্প নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং গ্রামীণ অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করার এক সাহসী মহাপরিকল্পনা।
বাংলাদেশের প্রধান অর্থনৈতিক ভিত্তি কৃষি। সেচ সুবিধার অভাবে অনেক এলাকায় চাষাবাদ ব্যাহত হয়, বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিনির্ভরশীলতা মাটির পানির স্তরকে আশঙ্কাজনকভাবে নামিয়ে দিচ্ছে। ৫৪ জেলায় এই ব্যাপক পুনঃখনন কার্যক্রমের ফলে খালগুলো পানি ধারণক্ষমতা ফিরে পেলে কৃষকরা সাশ্রয়ী মূল্যে এবং সহজে সেচ সুবিধা পাবেন। জলাবদ্ধতা নিরসন হওয়ার ফলে নিচু জমিগুলো চাষাবাদের আওতায় আসবে, যা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ভূমিকা রাখবে। খালের পানি রিচার্জ হওয়ার ফলে মাটির নিচের পানির স্তরের ওপর চাপ কমবে।
পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য খালের অস্তিত্ব অপরিহার্য। গত কয়েক দশকে খালগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষাকালে আকস্মিক বন্যা এবং জলাবদ্ধতা একটি নিয়মিত সমস্যায় পরিণত হয়েছে। ৫৪ জেলায় খালগুলো সংস্কারের ফলে বৃষ্টির পানির সুষ্ঠু নিষ্কাশন সম্ভব হবে, যা শহর ও গ্রামের দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা দূর করবে। পাশাপাশি, বহমান খালে দেশীয় প্রজাতির মাছের বংশবিস্তার ঘটবে এবং জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর অভয়াশ্রম তৈরি হবে। এটি গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারে সহায়ক হবে।
যেকোনো বড় প্রকল্পের সফলতার মূলে থাকে তার সঠিক বাস্তবায়ন। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অনেক সময় খাল খননের নামে কেবল নামমাত্র মাটি কাটা হয় অথবা খননের কিছুদিন পরই পুনরায় দখল হয়ে যায়। এই মহাপরিকল্পনার সুফল ধরে রাখতে আমাদের কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে খালগুলো যেন মানসম্মতভাবে এবং নির্দিষ্ট গভীরতায় খনন করা হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। খনন পরবর্তী সময়ে প্রভাবশালী মহলের হাত থেকে খালগুলোকে রক্ষা করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর তদারকি প্রয়োজন। স্থানীয় জনগণকে এই রক্ষণাবেক্ষণের প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করতে হবে যাতে খননকৃত খালগুলো আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত না হয়।
৫৪ জেলায় একযোগে খাল খনন কর্মসূচি শুরু হওয়া আমাদের উন্নয়নের যাত্রায় একটি মাইলফলক। এটি যেমন একদিকে কৃষকের মুখে হাসি ফোটাবে, অন্যদিকে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য বাংলাদেশ বিনির্মাণে সাহায্য করবে। আমরা আশা করি, এই কর্মসূচি কেবল লোকদেখানো কোনো প্রকল্পের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং যথাযথ তদারকি ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে এটি একটি টেকসই মডেলে পরিণত হবে। জলাধার রক্ষা মানেই দেশ রক্ষা—এই মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে খাল খনন প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন আজ সময়ের দাবি।
এ মুহূর্তের সংবাদ


















































