সাম্প্রতিক কবিতার রূপান্তর : ভাষা, দৃষ্টি ও কবিতাবোধ

দ্বীপ সরকার »

কবিতা এমন এক শিল্প, যা সময়ের সঙ্গে নিজেকে ক্রমাগত বদলায়। সমাজের রূপান্তর, মানুষের অভিজ্ঞতার বিস্তার, প্রযুক্তির প্রভাব, বিশ্বায়নের চাপ এবং নতুন দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম—এসবই কবিতার রূপ, ভাষা, সুর, চিত্রকল্প ও ভাবনায় পরিবর্তন আনে। বিংশ শতকের শেষভাগ থেকে একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে এসে বাংলা কবিতা যে স্বর ও কাঠামো লাভ করেছে, তাকে এক কথায় সাম্প্রতিক কবিতার রূপান্তর বলা যায়।
এই রূপান্তরকে তিনটি প্রধান দৃষ্টিকোণ থেকে বোঝা যায়—ভাষার রূপান্তর, কবিতাবোধের পরিবর্তন এবং দৃষ্টির অভিমুখ।
১. ভাষার রূপান্তর: প্রচলিত থেকে বহুমাত্রিকঃ
ভাষা কবিতার প্রথম ও প্রধান উপাদান। তাই ভাষার পরিবর্তন মানেই কবিতার পরিবর্তন। সাম্প্রতিক সময়ে ভাষার কাঠামো, ছন্দ, শব্দবিন্যাস এবং প্রতীকের মধ্যে যে রূপান্তর ঘটেছে, তা অতীতের কোনও ধারার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।
ক) সহজ, খন্ডিত, দ্রুত—নতুন ভাষার বৈশিষ্ট্য ঃ পঞ্চাশ দশকের কবি শামসুর রাহমান একসময় বলেছিলেন, ‘কবিতার ভাষা হতে হবে মুক্ত, সংবেদনশীল ও সময়সচেতন।’ এই ‘সময়সচেতনতা’ আজকের কবিতায় আরও ভিন্ন অর্থে ধরা দিয়েছে। সাম্প্রতিক কবিরা তুলনামূলকভাবে ছোট বাক্য , দ্রুত চিত্রান্তর, কথোপকথনশৈলী ও নীরবতার ব্যবহার, খণ্ডিত বর্ণনা ব্যবহার করে নতুন মেজাজ তৈরি করেছেন।
উদাহরণ হিসেবে ইউরোপীয় কবি পল সেলান এর উদ্ধৃতি বলা যেতে পারে। তিনি বলেছিলেন ‘Poetry is a kind of homecoming—through language that has passed through its own fractures.’ (মুলভাব: ভাষা নিজেই ভাঙনের মধ্য দিয়ে যায়) বাংলা সাম্প্রতিক কবিতার ভাষা এই আত্ম ভাঙনেরই এক বাস্তব রূপ।
খ) লোকজ ও পথের ভাষার সংযোজন ঃ আধুনিক সময়ের স্বরকে ধারণ করতে গিয়ে কবিরা শুদ্ধ শব্দভাণ্ডারের পাশাপাশি—অঞ্চলিক ভাষা লোকজ শব্দ, ইংরেজি—বাংলা মিশ্র বাক্য, শহুরে স্ল্য্যাং, ইন্টারনেট শব্দভাণ্ডার (ডেটা, ইনবক্স, সার্ভার ইত্যাদি) কবিতার ভাষায় যুক্ত করেছেন। ফলে কবিতা হয়েছে আরও শরীরী, আরও বাস্তব।
কবি জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন—
‘কবিতার ভাষা অপরূপ সংগীত, যার মধ্যে শব্দ ও নীরবতা মিলেমিশে থাকে।’ — প্রবন্ধ: ‘কবিতা ও কবিতার ভাষা’ (প্রকাশিত: বোধ, পরে সংকলিত)।
‘যে শব্দের মধ্যে পৃথিবীর জীবন ও মরণ লুকিয়ে থাকে সেই শব্দের মধ্য দিয়েই কবিতা জন্ম নেয়।’— প্রবন্ধ: ‘বাংলা কাব্য ও সাহিত্য’।
‘কবিতা তার রূপে যেমন সত্য, তেমনি তার গূঢ় অনুভবেও সত্য।’—প্রবন্ধ: ‘কবিতা’। সাম্প্রতিক কবিদের হাতে এই দেহে যুক্ত হয়েছে বহুরূপী শব্দ, আর আত্মায় যুক্ত হয়েছে নতুন সময়ের ভিন্ন ব্যথা ও আনন্দ।
গ) রূপক—প্রতীকের পুনর্র্নিমাণ ঃ পুরনো প্রতীক যেমন নদী, বৃক্ষ, প্রেম, মৃত্যু—এগুলো নতুন অর্থ পায়। ডিজিটাল যুগে নদী কখনো হয় ডেটা—স্ট্রিম, অন্ধকার হয় আইসোলেশন, শরীর হয় বায়োমেট্রিক পরিচিতি। এই পুনর্র্নিমাণের মাধ্যমে কবিরা ভাষাকে সময়ের সঙ্গে সমান গতিতে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।
২. কবিতাবোধের পরিবর্তন— ভাবনার পরিসরে নতুন বিস্তার ঃ
কবিতাবোধ মানে কবির অভিজ্ঞতা, দৃষ্টি, সমাজ-মনস্তত্ত্ব, আত্মপরিচয় ও দার্শনিকতার ফসল। সাম্প্রতিক কবিতায় এই কবিতাবোধে ঘটেছে গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তর।
ক) ব্যক্তিক থেকে বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব ঃ রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, তাঁদের যতটা সম্ভব নিজের অনুভূতিগুলো প্রকাশ করা প্রয়োজন।
আজকের কবি এই ব্যক্তিক বেদনা—আনন্দকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেন। তার ‘আমি’ শুধুই একক নয়—বরং বহুস্বরের সমষ্টি। এই ‘আমি’—কখনো ভার্চুয়াল, কখনো স্মৃতিভিত্তিক, কখনো পরিসংখ্যান, কখনো প্রতিবাদময়, কখনো পরিবেশ—সচেতন। ফলে আত্মপরিচয়ের ভিতরেই অগণিত স্তর তৈরি হয়।
খ) ঔপনিবেশিকতা, পরিচয় ও দেহরাজনীতি ঃ সমকালীন বিশ্বে পরিচয়ের রাজনীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। নারীবাদী কণ্ঠ, অভিজ্ঞতা, জাতিগোষ্ঠীর ভাষা—বঞ্চনা, শ্রমজীবী মানুষের অর্থনৈতিক সংগ্রাম, শরণার্থী অভিজ্ঞতা—এসব আজ সাম্প্রতিক কবিতার প্রধান বিষয়।
কবি সিমোন দ্য বুভোয়ার তাঁর বিখ্যাত বই The Second Sex (১৯৪৯) তে লিখেছেন The body is not a thing, it is a situation: it is our grasp on the world and the sketch of our project. —অর্থাৎ, দেহ কোনো বস্তু নয়; এটি আমাদের পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্ক, আমাদের প্রকল্পের রূপরেখা। এই বাস্তবতার মধ্য দিয়েই সাম্প্রতিক কবিরা মানুষের ব্যক্তিগত ইতিহাসকে নতুন করে পড়েন।
গ) নাগরিক জীবন ও একাকিত্ব ঃ শহর আজকের কবিতার অন্যতম অক্ষ।বহুতল ভবন, যান্ত্রিক জীবন, যানজট, একাকিত্ব, মানসিক চাপ, মধ্যবিত্তের আতঙ্ক—সব মিলিয়ে শহুরে অভিজ্ঞতা কবিতার বিস্তৃত ভূন্ড তৈরি করেছে।
টিএস এলিয়ট কবিতার দৃষ্টিতে শহর অব্যাহত বিশৃঙ্খলা, ভগ্নছিন্নতা ও এলিয়েনেশনের প্রতীক, যা অনেক সমালোচক ল্যাবিরিন্থ হিসেবে বর্ণনা করেছেন— বাংলা কবিতাও এই গোলকধাঁধার ভাষা তৈরি করেছে নিজের মতো করে।
ঘ) পরিবেশ—সংকট ও গ্রহবাসী জীবনের ভয় ঃ জলবায়ু পরিবর্তন, বনভাঙা, নদীখেকো রাজনীতি—এসব নিয়ে নতুন ধরনের কবিতাবোধ গড়ে উঠেছে। প্রকৃতি আর সৌন্দর্যের প্রতীক নয়; এটি আজ ক্ষত, ভয়, বিলুপ্তির প্রতীক।
ঙ) ডিজিটাল অভিজ্ঞতা ও ভার্চুয়াল বাস্ততা ঃ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের অনুভূতিকে অন্যভাবে বিন্যস্ত করেছে। মানুষ এখন—নোটিফিকেশনের আনন্দে, ইনবক্সে ক্রোধে,অনলাইন সম্পর্কের অনিশ্চয়তায়, ভার্চুয়াল দেহের আকর্ষণে। এই অভিজ্ঞতা সরাসরি কবিতাবোধকে পরিবর্তন করেছে।
বিদ্রোহী কবি নাজিম হিকমত বলেছিলেন—The most beautiful sea has not been crossed yet. The most beautiful child has not grown up yet’ অর্থাৎ সবচেয়ে সুন্দর সাগর এখনো অতিক্রম করা হয়নি। সবচেয়ে সুন্দর শিশু এখনো বড় হয়নি। ডিজিটাল যুগের এই গোপন সত্যগুলোই আজ কবিতার গভীর স্তর তৈরি করছে।
৩. দৃষ্টির রূপান্তর: দেখার নতুন পদ্ধতি ঃ
কবিতার দৃষ্টি মূলত সময়, সমাজ, মানুষ ও পৃথিবীকে দেখার এক বিশেষ পদ্ধতি। সাম্প্রতিক কবিদের দৃষ্টিতে এসেছে তিনটি বড় পরিবর্তন।
ক) বাস্তবতার বহুরূপী পাঠ ঃ বাস্তব আর একমুখী নয়। এটি কখনো বাস্তব, কখনো ভার্চুয়াল, কখনো মনস্তাত্ত্বিক, কখনো স্মৃতিভিত্তিক, কখনো স্বপ্নময়।
ফরাসি দার্শনিক জঁ বোদরিয়ার বলেছিলেন ‘The simulacrum is never that which conceals the truth- it is the truth which conceals that there is none.’ সিমুলাক্রাম কখনও সেই কিছু নয় যা সত্য লুকিয়ে রাখে— বরং সত্যই তা লুকিয়ে রাখে যে, কোনো সত্য আসলে নেই।
সাম্প্রতক কবিতায় এই ‘প্রতিলিপি বাস্তব’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
খ) ভাঙনকে দেখার নতুন রং ঃ আজকের কবি ভাঙনকে ভয় পান না। ভাঙা সম্পর্ক, অসম্পূর্ণতা, অস্থিরতা, সময়ের টুকরো—এসবই তার সৃজনশীল শক্তি। জার্মান কবি রিলকে বলেছিলেন ‘Let everything happen to you: beauty and terror. Just keep going. No feeling is final.’ অর্থাৎ সব ঘটুক তোমার সঙ্গে— সৌন্দর্য এবং ভয়। শুধু চালিয়ে যাও। কোনো অনুভূতি স্থায়ী নয়। এই বোধ সাম্প্রতিক কবিতার দৃষ্টিকে আরও গভীর করেছে।
গ) ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতার ভিতর বড় বাস্তবতা দেখার ক্ষমতা ঃ আজকের কবি জানেন—একটি ছোট ঘটনা, স্মৃতি বা মুহূর্ত থেকেই মহাজাগতিক অনুভব তৈরি হতে পারে। কবি লোরকা বলেছিলেন—‘কবিতা ছোট জিনিসের মধ্যে লুকিয়ে থাকা অসীমতা।’এই ধারণাই সাম্প্রতিক কবিকে সাধারণকে অসাধারণভাবে দেখতে শিখিয়েছে।
৪. বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে সাম্প্রতিক রূপান্তর ঃ
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কবিতার রূপান্তর আরও বিশেষ মাত্রা পেয়েছে। ক) মুক্তিযুদ্ধ ও ইতিহাস—পাঠের নতুন ব্যাখ্যাঃ তরুণরা মুক্তিযুদ্ধকে নতুন দৃষ্টিতে দেখে—ব্যক্তিগত স্মৃতি, পরিবারিক ক্ষত, রাজনৈতিক পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে। খ) শহর-কেন্দ্রিক কবিতার বিস্তারঃ ঢাকার বিশৃঙ্খলা, শহুরে দরিদ্রতা, মধ্যবিত্তের সংগ্রাম—এসবই নতুন চিত্রকল্প তৈরি করেছে। গ) নারীর দৃষ্টিকোণঃ নারীর পরিচয়, দেহ-রাজনীতি, প্রতিরোধ, স্বাধীনতা—এসব নিয়ে সাম্প্রতিক কবিতা সমৃদ্ধ হয়েছে। ঘ) পরীক্ষামূলক কবিতাঃ স্ল্যাম পোয়েট্রি,ভিজ্যুয়াল কবিতা, ছোট কবিতা, ছন্দমুক্ত ধারা বর্ণনা—এসবই নতুন নির্মাণশৈলী তৈরি করেছে।
সবশেষে বলা যেতে পারে সাম্প্রতিক কবিতার রূপান্তর মূলত মানুষের জীবন—রূপান্তরেরই প্রতিফলন। ভাষা বদলেছে—এটি এখন আরও দ্রুত, আরও খোলা, আরও বহুস্তর। কবিতাবোধের ভেতর যুক্ত হয়েছে পরিচয়, নগরবাস, প্রযুক্তি, দেহ, পরিবেশ ও রাজনীতির নতুন প্রশ্ন। আর দৃষ্টি হয়ে উঠেছে বহুমাত্রিক—বাস্তবতার বাইরে আরও নতুন বাস্তবকে দেখার ক্ষমতা অর্জন করেছে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন—ইংরেজি কবিতা সংকলন (Stray Birds) এ এরকম লিখেছেন ‘If you shed tears when you miss the sun, you also miss the stars.’ অর্থাৎ যদি তুমি সূর্যকে মিস করার সময় অশ্রু ঝরাও, তবে তুমি তার সঙ্গে তারাদের দেখার সুযোগও হারাবে। কবিতা সেই প্রতিধ্বনিত হৃদয়ের ভাষাই বহন করে—যেখানে আছে ভাঙনের সৌন্দর্য, সত্যের তীব্রতা, এবং ভবিষ্যতের প্রত্যাশা।