সংকটে জ্বালানি খাত : মজুদদারি রুখতে চাই কঠোর ব্যবস্থা

বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির অস্থিরতা আর অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের এই সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশের জ্বালানি খাত এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট এবং এর ফলে জনজীবনে সৃষ্ট স্থবিরতা জাতীয় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ীর অধিক মুনাফার আশায় জ্বালানি তেল অবৈধভাবে মজুদ করার প্রবণতা দেশের কৃষি, শিল্প ও পরিবহন খাতকে খাদের কিনারায় ঠেলে দিচ্ছে। এই অশুভ চক্রের বিরুদ্ধে এখনই কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি বিকল্প পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সময়ের দাবি। তেলের অভাবে যখন গণপরিবহন বন্ধ থাকে, তখন গুদামজাত করে তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা কেবল ব্যবসাই নয়, বরং দেশদ্রোহিতার শামিল। মাঠ পর্যায়ের তদারকিতে প্রায়ই দেখা যায়, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও পাম্পে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিচ্ছে। এদের মূল লক্ষ্য থাকে সরকার কর্তৃক মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণার আগে তেল আটকে রেখে পরে কয়েকগুণ বেশি লাভে বিক্রি করা। এই মজুদদারি বাজার ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে দিচ্ছে, যার চরম মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ।
জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় প্রথম পদক্ষেপ হতে হবে বাজার তদারকি ও ত্বরিত বিচার। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে অবৈধ মজুদ উদ্ধার করতে হবে এবং সংশ্লিষ্টদের লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর কারাদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে। কেবল জরিমানা করে এদের থামানো সম্ভব নয়; কারণ অসাধু ব্যবসায়ীরা জরিমানার অর্থকে ব্যবসার খরচ হিসেবে ধরে নেয়। এছাড়া, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) থেকে সরবরাহকৃত তেল যেন সঠিক গন্তব্যে পৌঁছায়, তার জন্য ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও অনলাইন মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমাদের আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎসের দিকে নজর দিতে হবে। সৌরশক্তি ও বায়ুবিদ্যুতের ওপর গুরুত্ব বাড়ানো এখন অনিবার্য। বিশেষ করে সেচ কাজে সৌরচালিত পাম্পের ব্যবহার বাড়াতে পারলে ডিজেলের ওপর চাপ বহুগুণ কমবে। দেশের ভূখণ্ডে ও সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে হবে। নিজস্ব সম্পদের সঠিক ব্যবহার আমদানির ব্যয়ভার লাঘব করবে। ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে মানসম্মত গণপরিবহন এবং রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে হবে, যা সামগ্রিকভাবে জ্বালানি খরচ কমিয়ে দেবে। আপৎকালীন সময় মোকাবেলায় রাষ্ট্রীয়ভাবে অন্তত দুই থেকে তিন মাসের জ্বালানি মজুদের সক্ষমতা বা স্টোরেজ সুবিধা গড়ে তোলা জরুরি।
জ্বালানি হলো একটি দেশের উন্নয়নের রক্তপ্রবাহ। এই প্রবাহে যারা বাধার সৃষ্টি করে, তারা দেশের শত্রু। সরকার ও প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে মজুদদারদের সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে। পাশাপাশি নাগরিকদেরও জ্বালানি ব্যবহারে মিতব্যয়ী হতে হবে। মনে রাখতে হবে, কেবল আইনের প্রয়োগ নয়, বরং দেশপ্রেম ও সঠিক ব্যবস্থাপনার সমন্বয়েই আমরা এই জ্বালানি সংকট কাটিয়ে একটি স্থিতিশীল অর্থনীতির দিকে এগোতে পারব।