শেখ হাসিনার মামলার তদন্ত রিপোর্ট প্রসিকিউশনে, চার্জ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু

সুপ্রভাত ডেস্ক »

জুলাই-আগস্টের গণহত্যার ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার খসড়া তদন্ত রিপোর্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের হাতে এসেছে। এতে একাধিকবার অপরাধ প্রমাণের তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম।

বুধবার (২ এপ্রিল) বিকেলে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, “খসড়া তদন্ত রিপোর্টে পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছে, শেখ হাসিনাসহ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অপরাধের যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। চূড়ান্ত তালিকা পেলে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নেব। তবে এই খসড়া রিপোর্টের ভিত্তিতেই ফরমাল চার্জ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে।”

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজধানীর চাঁনখারপুল এলাকায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের পর থেকে এ মামলাটি আলোচনায় আসে। ওই দিন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছাত্রদের ওপর পুলিশের আর্মড ব্যাটালিয়ন গুলি চালায়, যেখানে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান দশম শ্রেণির ছাত্র আনাসসহ পাঁচজন। আহত হন আরও অন্তত ৩০ জন।

সেসময় দেশজুড়ে এ হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। বিশেষ করে তরুণ সমাজ এবং শিক্ষার্থীরা সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তখনকার ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে।

বিক্ষোভের চাপে পড়ে তৎকালীন সরকার প্রথমে নির্যাতন ও গুলি চালানোর বিষয়টি অস্বীকার করলেও পরে জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের চাপে একাধিক কমিটি গঠন করে তদন্ত চালায়। তবে সেই তদন্ত প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি, যা জনমনে সন্দেহের সৃষ্টি করে।

এরপর ২০২৪ সালের অক্টোবরে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নতুন অন্তর্বর্তী কালীন সরকার ক্ষমতায় আসে এবং ২ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিকভাবে শেখ হাসিনাসহ ২৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়। অভিযোগপত্রে বলা হয়, তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নির্দেশেই চাঁনখারপুলে গণহত্যার ঘটনা ঘটেছে।

নতুন সরকারের আমলে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং ট্রাইব্যুনাল বিষয়টি তদন্ত করতে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে সম্প্রতি প্রসিকিউশনের হাতে তদন্তের খসড়া রিপোর্ট হস্তান্তর করা হয়েছে।

গত ২৭ মার্চ চিফ প্রসিকিউটর জানান, ‘চাঁনখারপুলে গুলি চালিয়ে পাঁচজনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। ঈদের পর এটি ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হবে।’

তদন্ত প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার ভূমিকা কতটুকু স্পষ্ট হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্য-প্রমাণগুলো বেশ শক্তিশালী। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আইনি কাঠামোর মধ্যে আনার প্রস্তুতি চলছে।;

খসড়া তদন্ত রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর এখন পরবর্তী ধাপে ট্রাইব্যুনাল ফরমাল চার্জ গঠনের জন্য কাজ শুরু করবে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, চূড়ান্ত চার্জ গঠনের পর বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত গতিতে এগোবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে, শেখ হাসিনা ও তার দলের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে তার আইনজীবীরা দাবি করেছেন, এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা। তাদের মতে, “এই মামলা একেবারেই ভিত্তিহীন এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য করা হয়েছে।”

তবে আন্তর্জাতিক মহল থেকে বাংলাদেশ সরকারের এ পদক্ষেপের প্রতি সমর্থন আসছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইতোমধ্যেই ঘটনার স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই মামলার রায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। যদি শেখ হাসিনা দোষী সাব্যস্ত হন, তাহলে এটি হবে দেশের ইতিহাসে প্রথমবার কোনো সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মানবতাবিরোধী অপরাধে শাস্তির নজির।