হাবিবুল হক বিপ্লব
বৃদ্ধা পৌষ-শীত-জর্জর, শিরে কুহেলির জটা, / মিটিমিট
করি মেলিয়া আকাশে ঝাপসা দৃষ্টি কটা; / প্রভাতে
প্রদোষে লতা-পাতা-ঘাসে শিশিরের জাল বোনে- / কভু উদাসীন, রোদে পিঠ দিয়া বসি’রয় আনমনে।’ -যতীন্দ্রমোহন বাগচী
শীতের আগমনী বার্তা আমরা পেয়ে যাই পৌষ আসার দুই মাস আগেই । হেমন্তের আগমনের সাথে সাথে শিশির পড়া শুরু হয়। হালকা হালকা হিমেল হাওয়া আসতে থাকে। শিশিরে সিক্ত হয়ে আসে প্রকৃতি। সারারাত কুয়াশায় ডুবে থাকে সে। প্রকৃতির কী ঠান্ডা লাগে না? না কি প্রকৃতির কোনও হিমশীতলতার ভীতি নেই। আসলে প্রকৃতিই তো পৌষকে ডেকে এনেছে শীতের উত্তাপ গায়ে মেখে ছড়িয়ে দিতে সবখানে। এতে কেন সে নিজেকে গুটিয়ে নেবে। সেই তো জড়িয়ে নিয়েছে হিম অনুরাগ, গাছগুলো ঝরাপাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ধানকাটা আর ফসলের উৎসবে চারিদিকে মুখরিত থাকে। শীতের রসে যোগ হয় বাড়তি আয়োজন। পিঠার ধুম। তবুও শীতের আগমনে আমাদের চারপাশে কেমন যেন গুটিয়ে পড়া পরিবেশ দেখতে পাই। শীত মানুষকে কাবু করে ফেলে। শীত আসলে সব কিছু জবুথবু হয়ে পড়ে যেন। শীত সব কিছুকে সংকুচিত করে আনে। কাজে কর্মে একটু আড়ষ্টভাব লক্ষ্য করা যায়। তবে শীতের সকালের সোনা রোদ আর পিঠার কথা কেউ ভোলে না।
জীবনানন্দ দাশের কবিতায় – ‘পৌষ ফিরে আসে নরম জামের মতো চুল নিয়ে, ঘুঘুর বুকের মতো অস্ফুট আঙুলে। / পউষের শেষ রাতে আজো আমি দেখি চেয়ে আবার সে আমাদের দেশে / ফিরে এলো; রঙ তার কোমলতা জানে ওই টসটসে ভিজে জামরুল, / নরম জামের মতো চুল তার, ঘুঘুর বুকের মতো অস্ফুট আঙুল; / পউষের শেষ রাতে নিমপেঁচাটির সাথে আসে সে যে ভেসে / কবেকার মৃত কাক পৃথিবীর পথে আজ নাই সে তো আর; / তবুও সে ম্লান জানালার পাশে উড়ে আসে নীরব সোহাগে, / এলিন পাখনা তার খড়ের চালের হিম শিশিরে মাখায় ; / তখন এ পৃথিবীতে কোনো পাখি জেগে এসে বসেনি শাখায়।
আর গ্রামে শীতে রাতভর টপটপ পড়ে রসের ফোঁটা। শীতের ফল ও সবজি ওঠে বাজারে। আমাদের হাট ভেঙে গড়ে উঠেছে বাজার। সেখানে খেজুরের রস পাওয়া যায়। শীতের পাখিও। পৌষ মাসে উত্তর দিক থেকে হিমেল বাতাস বইতে থাকে। গ্রামের লোকজন পুকুর পাড়ে গোসল করতে গিয়ে অনেকক্ষণ রোদে বসে শরীর গরম করে, তারপর পানিতে নামে। বিকেল বেলা এই হিম বাতাস জোরে বইতে থাকে। ‘উত্তর বায় এলোমেলো / পউষ এল ! পউষ এল ! / হিমেল হাওয়া শিরশিরিয়ে / এল অচিন সড়ক দিয়ে / মাঠ, ঘাট, বন ঝিরিয়ে গেল / পউষ এল ! পউষ এল !
‘শীত থেকে বাঁচতে কাজী নজরুল ইসলাম নিজেকে হাঁড়িতে চড়িয়ে চুলার উপর রাখার কথা বলেছিলেন। তার রসবোধ ছিল প্রবল। যে কোনও কিছুকেই সহজে তিনি ব্যাঙ্গাত্মক করে তুলতে পারতেন। শীতের প্রচন্ডতা সম্পর্কে তার প্রমাণও আমরা দেখতে পাই। তিনি বলছেন, ‘হাঁড়িতে চড়িয়ে আমায় / উনুনে রাখ গো ত্বরায়। কবির এই ইচ্ছা বাস্তবে বাস্তবায়নের চেয়ে বড় সত্য হলো শীত যখন জেকে বসে তখন প্রায় সকলেরই মনে হয় মানসিকতা এমনটাই হয়। চোখ বাদে সমস্ত শরীর ঢেকেও যেন শীতকে মোকাবিলা করা যায় না। যদিও এরকম শীত শহর এলাকায় বলা যায় বেশ দুর্লভ।
শীতের দিনটা আসলেই মজার। শীতের সকালে পিঠে ও খেঁজুরের রস খেতে কতই না মজা লাগে ! তবে শীত সবার জন্য মজা বয়ে আনে না। যারা শীতের কাপড় পায় না তাদের জন্য এ ঋতু খুবই কষ্টের। মানুষ ছাড়াও বনের পশুপাখিও শীতকে তাই ভয় করে। কথায় আছে মোষের গায়ে শীত লাগায় পৌষ। শীতকালে শহরাঞ্চলে লেপ-কাঁথা একটু দেরিতে বের হলেও গ্রামাঞ্চলে শীতের কাঁপন লেগে যায় এসময় মানুষের শরীরে। সেই কাঁপন থেকে বাঁচতে যে যার সামর্থ্যের মধ্যে চেষ্টা করে থাকে। পথে ঘাটে যেখানে পারা যায় সেখানেই কিছু মানুষ, ছেলেপুলে একত্রে জড়ো হয়ে আগুন জ্বালায় শীতের প্রকোপ থেকে রক্ষা পেতে। আগুন দিয়ে শীতের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার প্রতিযোগিতা চলে। শীত কেমন তা সবাই জানি। কাজী নজরুল ইসলামও জানেন। তবুও তার জানা একটু অন্যরকম। সেটি তার জানাকে একটি কবিতায় একটু ভিন্নভাবে তুলে ধরেছেন। শীতের আগমন ও তার তীব্রতাকে ব্যাঙ্গাত্মক উপস্থাপনায় খুব সুন্দরভাবে তার কবিতায় দেখতে পাই- ‘একি হাড়-ভাঙা শীত এলো মামা / যেন সারা গায়ে ঘষে দিচ্ছে ঝামা / হইয়া হাড়-গোড় ভাঙা দ’/ ক্যাঙারুর বাচ্চা যেন গো, / সেঁদিয়ে লেপের পেটে / কাঁপিয়া মরি, ভয়ে থ! / গিন্নি ছুটে এসে চাপা দেয় যে ধামা’ কিংবা ‘বাঘা শীত, কাঁপি থরথর, / যেনে গা মালোয়ারীর জ্বর, / বেড়ালে আঁচড়ায় যেন / শাণিয়ে দন্ত নখর, / মা গো দাঁড়াতে নারি, চলি দিয়ে হামা।’
শীতের এই রূপ চিরন্তন। শীত পড়লে ঠিকই বোঝা যায় শীত ঋতু এসে গেছে, যেটা কিছু কিছু ঋতুর ক্ষেত্রে তেমন টের পাওয়া যায় না। শীত নিয়ে মানুষের চিন্তাভাবনার শেষ নেই। আহসান হাবীব-এর ‘শীতের সকাল’ কবিতা থেকে কবির শীত সম্পর্কে ভাবনা জানা যায়। ‘রাত্রিশেষ ! / কুয়াশায় ক্লান্তমুখ শীতের সকাল- / পাতার ঝরোকা খুলে ডানা ঝাড়ে ক্লান্ত হরিয়াল। / … / শিশির স্নাত ঘাসে মুখ রেখে শেষের কান্নায় / দু’চোখ ঝরেছে কার, / পরিচিত পাখিদের পায় / চিহ্ন তার মোছেনি এখনো, / আছে এখনো উজ্জ্বল – / কান্নার মাধুরীটুকু ঘাসে ঘাসে করে টলোমল।’



















































