শিশুতোষ ছড়ার রূপলাবন্য

ঘোষণা : এলাটিং বেলাটিং-এর ছড়া সংখ্যা-১ বের হলো। আমাদের আহ্বানে সাড়া দেওয়ায় লেখকদের প্রতি সবিশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। লেখকদের সাথে যোগাযোগ ও লেখা সংগ্রহে সহযোগিতা করেছেন ছড়াশিল্পী উৎপলকান্তি বড়ুয়া।

জসীম মেহবুব »

বাংলা শিশুসাহিত্যে ছড়া একটি উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে। বিশেষ করে ছড়ার অসামান্য অগ্রগতি আমাদের শিশুসাহিত্যকে করেছে সমৃদ্ধ, পরিপুষ্ট। অনেকে বড়দের বিষয় নিয়ে ছড়া লিখলেও ছড়ার আদি ও অকৃত্রিম প্রকাশ শিশুর মন ও মানসে। যেখানে বুদ্ধি ও বিচারের অধিকার নেই। শিশুদের কাছে বুদ্ধি ও বিচারের চেয়ে রসের মূল্য বেশি। যেখানে মস্তিস্ক অপেক্ষা হৃদয় বড়।
বাংলার লোকজ, শিশুতোষ ছড়ার শক্তির পরিচয় আমরা বার বার পেয়েছি। আমাদের লোকজ,শিশুতোষ ছড়া সবসময় মাথার ওপর মুকুট হয়ে জ্বলজ্বল করছে। এসব ছড়া রয়েছে আমাদের মগজে,মননে,দাদী-নানীর মুখে মুখে,পল্লীর খেটে খাওয়া মানুষের চোখের মণিকোঠায়, যা কখনো হারাবার নয়। বাংলার লোকজ, শিশুতোষ ছড়া হচ্ছে মায়ের মতই। ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন-‘ছেলে ভুলানো ছড়া পৃথিবীর সকল দেশের ছেলে মেয়েদের কাছে মায়ের দুধের মতই আদরের। ছড়াগুলো সরস প্রাণের জীবন্ত উৎস। শত বৎসর ধরে এসব ছড়া মায়ের দুধের মতই শিশুমনের পুষ্টি জুগিয়ে আসছে। ছেলেভুলানো/শিশুতোষ ছড়ার যে জিনিসটি আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে তা হল ছড়ার ন্যাচারাল দিক। যা কিছু স্বাভাবিক, প্রাকৃতিক,অকৃত্রিম শিল্পসুষমায় দ্রুবতারার ন্যায় দেদিপ্যমান, তাই শিশুসাহিত্য।
শিশুর ভেতর যেমন কৃত্রিমতা নেই, ছড়ার ভেতরও তেমনি থাকতে নেই কৃত্রিমতা। কৃত্রিমতা ছড়ার প্রধানতম শত্রু। ছড়া হচ্ছে ন্যাচারাল, স্বতঃস্ফূর্ত। গাছে গজিয়ে ওঠা কচি পাতাটির মতই। ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করবে। ছড়ার মত এত আদরণীয় অকৃত্রিম, কোমল, আর কী হতে পারে ? ভেবে পাই না।
বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য কয়েকটি শিশুতোষ ছড়ার উদ্ধৃতি দেয়া যাক –
ক)
দিনের আলো নিভে এলো সুয্যি ডোবে ডোবে
আকাশ ঘিরে মেঘ করেছে চাঁদের লোভে লোভে ।
মেঘের উপর মেঘ করেছে রঙের উপর রঙ
মন্দিরেতে কাসরঘণ্টা বাজল ঢঙ ঢঙ।
(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর )
খ.
চাঁদের বুড়ি থুত্থুড়ি চরকা কাটে না
ছোট বউয়ের ভারি গুমান বাটনা বাটে না।
ঘরের দাওয়ায় বড় বৌ ফুলসুপারি কাটে,
পান নেই চুন নেই পানসি গেছে হাটে।
(আহসান হাবীব )
গ.
বটির পাশে গোল আলু আর /সিমের বিচি কুলায়,
নতুন বউয়ের শাড়ির আঁচল /লুটিয়ে পড়ে ধুলায়।
বউয়ের চোখে লোনা পানি /দুই ননদে কানাকানি,
সূর্য যখন মাঝ আকাশে /ভাত ওঠেনি চুলায়,
এসব শুনে শ্বশুর মশাই /তক্ষুনি গাল ফুলায় । (আবু হাসান শাহরিয়ার)
ঘ.
ঝিরঝিরানো ঝাউয়ের পাতা/বাতাস বাজায় বাঁশি
চাঁদের আলো ঝলমলানো /উপচে পড়ে হাসি।
নিলচে হলুদ সন্ধাতারা/আলোর পিদিম জ্বালে
সেই আলোতে টোল পড়েছে/খোকনসোনার গালে। (ফারুক নওয়াজ)
ঙ.
নদী আঁকছে খোকন আমার/মাছ ছেড়ে দাও জেলে
নৌকো ভাসাও ও মাঝিভাই/ঘাটের বাঁধন ফেলে।
রাজহাঁসেরা সাঁতার কাটে /খোকন আমার ভালো
সুয্যিঠাকুর রং দাও গো/চাঁদ মামা দাও আলো । (রতনতনু ঘাটী)
চ.
আজিমপুরের আজব মেয়ে/এত্তটুকুন মিল্লি,
বাবুই পাখির পিঠে চড়ে/ঘুরতে গেল দিল্লি ।
বাবুই পাখি বড্ড বাবু /চায় যেতে সে পাটনা
আনতে কিনে বস্তা পুরে/গোল মরিচের বাটনা । (মুস্তাফা মাসুদ)
এমন অসংখ্য ছড়ায় বাংলা ছড়ার অঙ্গন ঝলমলে হয়ে আছে । অন্ধকারে জোনাকপোকার আলোর ন্যায় ছড়াগুলো জ্বলজ্বল করছে। আমাদের ছড়াকারদের কলমে উঠে আসা এসব ছড়া মুক্তোর দানার ন্যায় আলো ছড়াচ্ছে। সেই আলোতে উজ্জ্বল হয়ে উঠছে শিশুর মুখ । মায়েরা ছড়া পাঠ করে শিশুদের বেড়ে ওঠার পথ দেখিয়ে দেন ।
তাদের মানস গঠনে ছড়ার ভূমিকা অপরিসীম । শিশুর কৌতূহলী মনে ছড়ার একটি স্থায়ী প্রলেপ লেগে শিশুর বেড়ে ওঠাকে করে আলোকময়। সেই আলোকোজ্জ্বল পথ ধরে শিশুর এগিয়ে চলা আমাদের সমাজ-সংস্কৃতি অঙ্গনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। তা না হলে থেমে যাবে সব কোলাহল, সব উচ্ছলতা আর আগামী পৃথিবীর পথচলা।
এমন সব মজার ছড়া পড়লেই বোঝা যায় ছড়ার অন্তর্নিহিত শক্তিমত্তা কতখানি । সে শক্তির পরিচয় আমরা বারবার পেয়েছি। একজন বিদেশি লোকবিজ্ঞানি বলেছেন- সেই আদিম যুগে শিশুর মত সহজ-সরল মানুষেরা শিশুর অনুসন্ধিৎসা এবং সারল্য দিয়ে তৈরি করেছেন এইসব ছড়া। তাঁর মতে স্বপ্ন থেকেই অধিকাংশ ধাঁধা, ছড়া ও লোকপুরাণের জন্ম। বর্তমানে সববয়সি পাঠকের কথা ভেবে ছড়া রচিত হলেও এর সিংহভাগ পাঠক আমাদের শিশুরা। শিশুদের জন্য রচিত ছড়াতেই তার মৌলিকত্ব ফুটে ওঠে।
আমাদের পূর্ববর্তী ছড়াকাররা যে ছড়াগুলো রচনা করে গেছেন তার অধিকাংশই শিশু মনোরঞ্জননির্ভর। আমাদের শিশুদের মন-মেজাজের দিকে লক্ষ্য রেখেই তাদের ছড়াগুলো আপনাআপনি ফুটে উঠেছে। সেইসব ছড়া টিকে আছে এবং টিকে থাকবে,যাতে রয়েছে আমাদের শিশু মনোরঞ্জনের নানা বৈচিত্রময় উপাদান। এই ধারা থেকে বিচ্যুত হওয়ার কোন সুযোগ নেই। কেননা, এ আমাদের একান্ত নিজস্ব ধারা। নদীর বহমান স্রোতধারার ন্যায়, আমাদের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের ন্যায় এ ধারা বইছে প্রজন্ম প্রজন্মান্তরে।