সবুজ মণ্ডল »
একজীবনে মানুষের কয়টা নাম থাকতে পারে সেটা প্রায়শই ভেবে কূল পায় না মেয়েটা! জন্মকুণ্ডলীতে দেওয়া রুক্মিনী নামটা তো রীতিমতো তার মনেই থাকে না। প্রতিষ্ঠানিক নামের ভিড়ে এ নামটার জৌলুশ ফিকেপ্রায় বলা যায়। ঈদ-পূজোর ছুটিতে অনাদরে একেলা ক্যাম্পাসের হলজীবন ছেড়ে সপ্তাহখানেকের জন্য মেয়েটা যখন ঘরে ফিরতো, মনে হত যেন নীড়হারা পাখি খুঁজে পেয়েছে প্রশান্তির শেষ আশ্রয়স্থল। এ সময়টুকুতে মা ঘেঁষা মেয়েটা মায়ের মুখে ‘মণি’, বাবার মুখে ‘বাপ্পী’ -এহেন নাম শুনে মাঝেমধ্যে খেই হারিয়ে ফেলতো আদতে তার মূল নামটাই বা কী!
পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে চাকরি নামক নাগরিক বেড়াজালে মেয়েটা জড়াতে না জড়াতেই মা-বাবা কেমন যেন উঠে পড়ে লাগলো কন্যাদায় এড়াতে! এমন তো না যে সে সাবলম্বী না কিন্তু তাও এহেন বিমাতাসুলভ আচরণে মেয়েটার ভীষণ রাগ হতো বৈকি!
দক্ষিণায়নের দিন তখনো ফুরোয়নি, মকরসংক্রান্তি এলো এলো বলে। পৌষের এমনি এক হিমসন্ধ্যায় মা-বাবা মেয়েটাকে নিয়ে গেল পরিচিত এক রেস্টুরেন্টে অচেনা-অজানা এক যুবকের সামনে! বুঝতে বাকি রইলো না মা-বাবার মনে চাপা ইচ্ছেটা কী। অফিসফেরত মেয়েটার চোখমুখে তখনো হিমকুয়াশার মতোই ঘোরলাগা ক্লান্তি। কিন্তু একি! এ কেমনতর পাত্র যে কিনা একা একাই চলে এলো বিয়ের পাত্রী দেখতে। মনের ভেতর শত শঙ্কার ঘোর কুয়াশার মেঘ কেটে অদ্ভুত এক বিস্ময়চিহ্ন মেয়েটার মনে দাগ কাটলো! খানিকপর মা বাবাও উঠে অন্যত্র চলে গেলেন পাত্র-পাত্রী দুজনের মধ্যে কথা বলার সুযোগ করে দিয়ে। শীতকাল মেয়েটার বরাবরই অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কাঁপা ঠোঁটে ভাঙা গলায় তাও সাহস করে অচেনা মানুষটাকে জিজ্ঞেস করে বসলো-
কেমন আছেন?
কুশলাদি বিনিময়, খুচরো কিছু কথাবার্তা শেষ হতে না হতেই মা-বাবা এসে আবার পাশে বসলেন মেয়েটার।
এতক্ষণে বোধকরি মেয়েটা কিছুটা স্বস্তি বোধ করলো। মেয়েটা ভাবতে লাগলো, অচেনা মানুষের সামনে এমন অভিজ্ঞতার চেয়ে চাকুরির মৌখিক পরীক্ষাই ঢের ভালো বৈকি!
দেখা হবার পর ছেলেটা নিজের অজান্তে মেয়েটার একটা নাম ঠিক করে-‘রৌদ্রময়ী’। অর্থ-মর্মার্থ না জেনেই হয়ত আবেগের খেয়ালে দেওয়া নাম। প্রথমদিনের দেখা শেষে বাসায় ফিরে ছেলেটা রৌদ্রময়ীর ইনবক্সে মেসেজ দেয়- বাসায় পৌঁছালাম, ঠিকঠাকভাবে পৌঁছেছেন তো?
একটা দিন দেখা হতে না হতেই ছেলেটার এমন আধিখ্যেতায় মেয়েটা আধো বিরক্ত আধো কৌতুহলী। দিন গড়াতে গড়াতে অচেনা মানুষটার সাথে টুকিটাকি চ্যাটিং এ কথাবার্তার সুবাদে লোকটার প্রতি কেমন যেন একটা অদৃশ্য টান অনুভব করতে শুরু করে রৌদ্রময়ী। ইনবক্সটাই যেন হয়ে ওঠে দুজনের অলিখিত সংসার। মাত্র একসপ্তাহের পরিচয়ে রৌদ্রময়ীকে ফোন দেয়ার মতো সাহস করে উঠতে পারে না ছেলেটা। কী আর করা বাধ্য হয়ে রৌদ্রময়ী-ই ফোন দিয়ে বসে সাতপাঁচ না ভেবে। ফোনে কথা হতে না হতেই ছেলেটা বেহায়ার মতো রৌদ্রময়ীকে এক বিকেলে ঘুরতে বের হবার প্রস্তাব দিয়ে বসে! ইতিউতি না ভেবে মেয়েটাও সম্মতি জানিয়ে বসলো।
হালকা হিমবাতাসে পড়ন্তি সন্ধ্যায় রৌদ্রময়ী ছেলেটাকে নিয়ে যায় পছন্দের একটা ক্যাফেতে । ছোটখাটো কথা ভিড়ে ছেলেটা তার পড়ে থাকা জ্যাকেটের ভেতর থেকে জাদুকরের মতোই একগুচ্ছ হলুদ গোলাপ বের করে দিয়ে বসে রৌদ্রময়ীর হাতে। ছেলেটার এমন আকস্মিকতায় রৌদ্রময়ী খানিকটা তব্দা খেয়ে গেলো বৈকি! একথা ওকথার ভিড়ে খাবারের প্লেটের খাবার শেষ হয়ে যায় কিন্তু কথা ফুরোয় না দুজনের।
সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত তখন নয়টা, ছেলেটাকে উঠতে হবে, বেশ খানিকটা দূর যেতে হবে লোকাল বাসে। বিদায় নিয়ে ছেলেটা রওনা দেবে, এমন সময় রৌদ্রময়ী শান্ত গলায় তখন বলে
আমাদের কথা যেন একজীবনেও না ফুরোয়!
আমি থেকে আমাদের হওয়ার ছোট্ট এ স্বপ্নের কথা বুকপকেট ভর্তি করে বিদায় নেয় ছেলেটা। আর কানে বাজতে থাকে-
মনে পড়ে আজ সে কোন জনমে বিদায় সন্ধ্যাবেলা
আমি দাঁড়ায়ে রহিনু এপারে তুমি ওপারে ভাসালে ভেলা।





















































