রাইডার

অরূপ পালিত »

কাউকে ভালোবেসে ধরে রাখতে না পারলে সারাজীবন কষ্ট পেতে হয়। না পারবে কাঁদতে না পারবে ভুলতে। মেহেদী জানতো কথাটা ঠিক। কিন্তু বুঝতে অনেক সময় পেরিয়ে যায়।
মেহেদী ঐন্দ্রিলাকে কি তোর পছন্দ?
হুঁ -কিন্ত মা,ওকে তো পাচ্ছি না।
তাহলে ওর মা-বাবার সাথে বস।
মা তুমি কি আমার সাথে থাকবে?
কেন বাবা, ভয় পাচ্ছিস?
হুঁ-মা ওরা যদি রিয়াক্ট করে-তাহলে?
বোকা! নিজের সিদ্ধান্ত নিজেকে নিতে হয়। সাহসী হতে হয়। দরকার হলে আমার কাছে নিয়ে আসিস। জানিস পুরুষ কখনোই রোগে মরে না। মরে টেনশনে। সে যখন একজন পছন্দের মানুষ পেয়ে যায় সেই মূহূর্ত থেকে সেই নারীর কাছে স্বেচ্ছায় নিজের খুশি বিসর্জন দিয়ে সব সুখ সমর্পণ করে।
এরপরের স্মৃতিটুকু যেন কুয়াশায় ঢাকা। কলিং বেলের শব্দে হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে যায় মেহেদীর।
চোখ খুলে দেখে-ভোর পেরিয়ে গেছে। শীতের সকালে গায়ে ঘাম, বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অস্থিরতা। যেদিন অফিসে কাজ বেশি থাকে ঠিক সেদিন যেন সবকিছু বিপরীত দিকে চলে যায়। এমডি স্যারের বিশেষ নির্দেশ-আজকে নয়টার আগে অফিসে পৌঁছাতে হবে।
মেহেদী এমন এক আবাসিক এলাকায় থাকেন সকাল হতে সেখানে সবজি এবং মাছের ভ্যানের জন্য সহজে সিএনজি বা অটোরিকশা কিছুই পাওয়া যায় না। তার ওপরে সেখানে ব্যাঙের ছাতার মতো কোচিং সেন্টার আর কিন্ডারগার্টেন। অনেক বাচ্চাদের মুখ থেকে দুধের সুবাস যায়নি তাদের নিয়ে সাতসকালে অভিভাবকদের টানাটানি। সংসার ধর্ম ছেড়ে স্কুলের সামনে মহিলাদের ভিড় লেগেই থাকে। তার মধ্যে যুক্ত হয় প্রাইভেট কারের বিরক্তি। বাচ্চাদের নামাতে গিয়ে পুরো রাস্তাটা দখল করে নেয় প্রাইভেট কার। পেছনের অন্য যাত্রীদের ভোগান্তির দিকে খেয়াল দেওয়ার সুযোগ নেই ওদের। প্রতিদিন টেক্সি পেতে দশ-পনেরো মিনিট হেঁটে বড়ো রাস্তার মোড়ে আসতে হয়। আজকেও খুব দ্রুত হাঁটতে থাকেন মেহেদী সাহেব।
পেছন থেকে ‘হ্যালো-স্যার’ বলে কেউ একজন ডাক দেয়। মেহেদী স্কুটিওয়ালা মহিলাকে চিনতে না পেরে আবার সামনের দিকে পা বাড়ান। মহিলা এইবার মেহেদীর সামনে গিয়ে স্কুটি থামায়।
কোথায় যাবেন স্যার?
আমাকে.?
জ্বি স্যার। আপনি চাইলে আপনাকে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারি।
আপনি কি রাইডশেয়ারিং..।
জ্বি স্যার। আপনি যাবেন কোথায়?
আগ্রাবাদ জাদুঘরের সামনে। আপনাকে কতো দিতে হবে?
অন্যদের কতো দেন?
৮০-১০০ টাকা।
আপনি আমাকে ৭০ টাকা দিলে চলবে।
মেহেদীর টেনশন কাজ করছে। একদিকে নারী রাইডার, অন্যদিকে পরিচিত কেউ যদি দেখে ফেলে। ল্যাপটপের ব্যাগটা সামনে রেখে ডিসটেন্স নিয়ে মেহেদী বসলেন। মনে মনে বেশ সঙ্কোচ হচ্ছে। গায়ে কোনো কারণে ধাক্কা লাগলে সে- কোন বিপদে ফেলতে পারে। অস্বস্তি, সংকোচ-সব মিলিয়ে অদ্ভুত অনুভূতি। কিছু দূর যাওয়ার পর মহিলা বললো-
স্যার, প্রায় দেখি আপনি এসময়ে তাড়াহুড়ো করে অফিসে যান। আপনার যদি কোনো আপত্তি না থাকে তাহলে আমি কি আপনার যাওয়াটা সাহায্য করতে পারি?
না! আমি অটোতে যাই, আপনাকে কষ্ট করতে হবে না।
স্যার কোন ভনিতা ছাড়াই বলি আমার বেশ টাকার প্রয়োজন। দেখুন একজন নারীকে তো সবাই আপনার মতো করে এতো সম্মান দিয়ে পাশে বসবে না। অফিস ছুটির পর যদি আপনাকে নিয়ে আসি আমারও বেশ উপকার হবে?
দেখুন আপনি একজন মহিলা। না চিনে আপনার সাথে প্রতিদিন এভাবে কেন রাইড শেয়ারিং করবো।
স্যার আপনাকে তো আমি বিনা পয়সায় নিচ্ছি না। তবে আপনি মনে হয় একটু ভুল করছেন। আমার মনে হয় সাধারণত আমরা ২৫+ বয়সী প্রতিটি নারীকে মহিলা বলি। নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়, নারী অধিকার, নারী শিক্ষা এসব ক্ষেত্রে নারী শব্দটির আলাদা মর্যাদা আছে। মেয়েটির বলার মধ্যে বেশ যুক্তিও আবেদন আছে। কথার সময় পেরোনো গেলো না, গন্তব্য এসে গেল।
ঠিক আছে কাল সকালে আসুন।
স্যার বিকেলে কেন নয়?
বিকেলের সময়টা আমার ফিক্সড থাকে না।
তারপর দিন মেয়েটি ঠিক সময়ে চলে আসে। রাতভর মেহেদীর ঘুম আসে না। মেয়েটির সম্পর্কে খুব জানতে ইচ্ছে করছে। ওর বলার ধরন ছিল আকর্ষণীয় ও মুগ্ধ করার মতো। ওর চোখ দুটো অসম্ভব মায়াবী। সে স্নিগ্ধ ও আত্মবিশ্বাসী চাহনিতে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না, ছিল অদ্ভুত গভীরতা যেন শান্ত দিঘির অতল জল। আজ সকালে মেহেদীর ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়নি। নিজে এসে হাজির। মেয়েটি আবেদনময়ী কন্ঠে মেহেদীকে স্কুটিতে বসতে বলে। মেয়েটির এলোমেলো চুলের গন্ধে কখন যে গন্তব্যে পৌঁছাল টের পায়নি।
নামার সময় মহেদী মানিব্যাগে হাত দিতে
-স্যার দু-তিন দিন একসাথে জমা হোক তারপর নিব।
মেহেদী আর কিছু বললেন না। কেবল হালকা করে মাথা নাড়লেন। স্কুটিটা স্টার্ট নিয়ে ধীরে ধীরে কিছুদূর এগুতে বাতাসে নিকাবটি সরে যায়। বাম চিবুকের নিচে ছোট্ট একটা তিল, একচিলতে মিষ্টি হাসি। স্কুটারের শব্দটা ক্রমে ক্ষীণ হয়ে এলো। তারপর সে ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
মেহেদী স্তব্ধ হয়ে অফিসের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে রইল। শহরের এই যান্ত্রিক কোলাহলের মাঝে ওই কয়েক সেকেন্ডের দৃশ্যটা যেন কোনো এক নিপুণ শিল্পীর জলরঙে আঁকা ছবি। মেয়েটার সাজগোজের কোন বালাই নেই। নিখুঁত গায়ের রঙে কালো তিলটা আগলে রাখা সেই হাসির স্নিগ্ধতা আর মায়াবী মুখ। মেয়েটির চোখের কোণে এক চিলতে আত্মবিশ্বাস ছিল, আর ওই তিলটা যেন হাসির পূর্ণতা দিচ্ছিল। কেন জানি পেছন ফিরে তাকাতে ইচ্ছে করল না। যদি দূর্বল হয়ে যায়। আবার ইচ্ছে করল তাকিয়ে দেখতে-সে কি এখনও দেখছে?
আজ আবারো অনেক দিন পর মনে হলো ঐন্দ্রিলাকে মিস্ করছে। সারাজীবন আফসোস থেকে যাবে মেহেদীর। ঐন্দ্রিলা কীভাবে মিসিং হয়েছে সে বিষয়ে ওর মা-বাবা সঠিক তথ্য দেননি।
ঐন্দ্রিলার নিখোঁজ হওয়াটা কোনো অকস্মাৎ ঘটনা ছিল না। যেদিন সে নিখোঁজ হয়, তার আগের রাতে মোবাইল সুইচড অফ ছিল। সকালে ফ্ল্যাটে গিয়ে দেখে সবকিছু ছিল স্বাভাবিক। ফ্ল্যাটের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল না। কোথাও জোরাজুরির চিহ্ন নেই। আলমারিতে কাপড়-চোপড় গুছানো। ড্রেসিং টেবিলে রাখা গয়নাগুলো ঠিক যেমন থাকার কথা, তেমনই ছিল। চেকবই, কাগজপত্র—সবই অক্ষত। কিন্তু মানুষটা নেই।
মিডিয়া প্রথমে প্রচার করলো—“রহস্যজনক নিখোঁজ”। পুলিশের ধারণা—পলিঅ্যামোরি “স্বেচ্ছায় গা ঢাকা দেওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ” আর ঐন্দ্রিলার মা-বাবা?
তাদের বক্তব্য সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলাতে থাকল। একদিন বললেন—সে মানসিক চাপে ছিল। আরেকদিন বললেন —বিয়ের আগে দ্বিধায় ভুগছিল। আবার কখনো ইঙ্গিত দিলেন—মেহেদীই সব জানে। মেহেদীর কাছে কিন্তু কোনো প্রশ্নেরই উত্তর ছিল না—শুধু ছিল স্মৃতি।
ঐন্দ্রিলা কি লোভী ছিল? নাকি কেউ তাকে এমন জায়গায় ঠেলে দিয়েছিল, যেখান থেকে আর ফেরার রাস্তা ছিল না? গোয়েন্দা সংস্থার স্পেশাল তদন্ত এগোয়।
ডায়েরি খোঁজা হয়—কিছুই পাওয়া যায় না। ফোন কল লিস্টে শেষ কয়েকটি নাম্বার অচেনা। কিন্তু কোনো সূত্রই পূর্ণতা পায় না। শেষমেষ মামলার মোড় ঘুরে যায়। সন্দেহের তীর এসে পড়ে মেহেদীর দিকে। ভালোবাসা তখন হঠাৎ অপরাধের সম্ভাবনায় রূপ নেয়। আদালতে দাঁড়িয়ে তাকে বারবার একই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়—আপনি কি এই ফ্ল্যাটে কোন বিশেষ লোককে পাঠাতেন? যিনি ঐন্দ্রিলার সঙ্গে..?
দুবছর জেলে থেকে আইনি লড়াইয়ের শেষে, শেষ পর্যন্ত আদালত রায় দেয়— অভিযোগ প্রমাণিত নয়। মেহেদী মুক্তি পায়। কী অদ্ভুত দুনিয়া মির্জা গালিবের কথা ঠিক ”পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মিথ্যা বলা হয় ধর্মগ্রন্থ ছুঁয়ে যেটা আদালতে। আর বেশি সত্য বলা হয় মদ ছুঁয়ে, যেটা পানশালায় ।
লিফটের ভেতরে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকালেন মেহেদী। তিন-চার দিনে এই মেয়ের মুখটা বেশ পরিচিত হয়েছে। এই ভালোলাগাকে প্রশ্রয় না দিয়ে এই জায়গাতে ফুলস্টপ দিতে হবে। এটা ছিল কেবল পথের সামান্য একটা অংশ-যার শুরু আছে, কিন্তু শেষটা নেই।
মেহেদী সারাদিন ক্রেডিট আর ডেবিট এর হিসেবে অনেককিছু ভুলে যায়। ডেস্কে বসে কম্পিউটার অন করেন। কাজের ফাইল খুলে কিছুক্ষণের জন্য ভুলে থাকেন, সময় এগোয় না। কিন্তু কোথাও যেন একটা ফাঁকা জায়গা থেকে যায়।
সমাজের চোখে সে আজীবনের জন্য সন্দেহভাজন। আর নিজের চোখে—সে একজন ব্যর্থ প্রেমিক, যে মানুষটাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবেসেছিল, তার নিখোঁজ হওয়ার রহস্য আজও খুলতে পারেনি। ঐন্দ্রিলার মৃত্যু—ঘোষিত হয়েছে। লাশ,কবর-শেষ বিদায় কিছুই নেই। কিন্তু মেহেদীর জীবনে—সে এখনো জীবিত। কারণ কিছু মানুষ নিজ থেকে নিখোঁজ হলে তাকে খুঁজে পাওয়া দুরূহ—তারা শুধু ধীরে ধীরে মানুষের ভেতরে বাস করতে শুরু করে।