সংযম, আত্মশুদ্ধি এবং ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর এই মাসে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা থাকে নির্বিঘ্নে ইবাদত বন্দেগি করা এবং স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যের নিশ্চয়তা পাওয়া। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, প্রতি বছরের মতো এবারও রমজানকে সামনে রেখে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী মেতে উঠেছে ভেজাল, নকল ও মানহীন খাদ্যদ্রব্যের এক অশুভ প্রতিযোগিতায়। বাজার ছেয়ে গেছে অস্বাস্থ্যকর এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ খাদ্যপণ্যে, যা কেবল অনৈতিকই নয়, বরং চরম অমানবিক।
রমজানে ইফতার ও সেহরির টেবিলে যেসব খাবারের চাহিদা বেশি থাকে—যেমন ভোজ্যতেল, ডাল, চিনি, খেজুর, মুড়ি এবং বিভিন্ন ফলমূল—সেগুলোতেই ভেজালের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। ফল পাকানো ও তাজা রাখার জন্য ক্ষতিকর কার্বাইডের ব্যবহার, মুড়িতে ইউরিয়া মেশানো, কিংবা রাস্তার ধারের ইফতারিতে নিম্নমানের রঙ ও পোড়া তেলের যথেচ্ছ ব্যবহার এখন যেন নৈমিত্তিক ঘটনা। এছাড়া নামিদামি ব্র্যান্ডের মোড়ক নকল করে বাজারে ছাড়া হচ্ছে মানহীন গুঁড়ো দুধ ও মশলা। এসব খাবার গ্রহণের ফলে সাধারণ মানুষ পেটের পীড়া থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদী কিডনি ও লিভারের জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
অসাধু ব্যবসায়ীদের এই সিন্ডিকেট কেবল মানুষের স্বাস্থ্যই সংকটে ফেলছে না, বরং কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পকেটও কাটছে। তাদের কাছে ধর্মীয় পবিত্রতা কিংবা মানবিক মূল্যবোধের চেয়ে মুনাফাই মুখ্য। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক যে, প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের খবর পাওয়া গেলেও কাজের কাজ তেমন কিছুই হচ্ছে না। জরিমানার পরিমাণ অনেক ক্ষেত্রে এতই নগণ্য যে, ব্যবসায়ীরা তা দিয়ে পুনরায় একই অপকর্মে লিপ্ত হয়।
এখন সময় এসেছে কঠোর হওয়ার। কেবল লোকদেখানো অভিযান নয়, বরং ভেজাল ও নকল পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। বিএসটিআই ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে তাদের তদারকি ব্যবস্থা মাঠ পর্যায়ে আরও শক্তিশালী করতে হবে। প্রতিটি বাজারে নিয়মিত ল্যাবরেটরি টেস্টের মাধ্যমে পণ্যের মান নিশ্চিত করা এবং অপরাধীদের লাইসেন্স বাতিল করার মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
পাশাপাশি সাধারণ গ্রাহকদেরও সচেতন হতে হবে। সন্দেহজনক বা অতিরিক্ত উজ্জ্বল ও অস্বাভাবিক সস্তা পণ্য বর্জন করা জরুরি। তবে মূল দায়িত্বটি সরকারের। আমরা চাই না পবিত্র রমজান মাসে মানুষ ভেজাল খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভিড় করুক। জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। অসাধু ব্যবসায়ীদের এই লাগামহীন দৌরাত্ম্য বন্ধে প্রশাসন জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।



















































