সাইফুল্লাহ কায়সার »
গ্রামের এক শান্ত প্রান্তে, যেখানে সবুজ মাঠ আর নদীর বাঁক এসে মিশেছিল, সেখানেই ছোট্ট একটি মাটির ঘরে থাকত যুবরাজ। সবে তার বারো বছর বয়স, কিন্তু চোখে ছিল একরাশ সরল জিজ্ঞাসা। বাবা মজিদ সরকার ছিলেন খেটে খাওয়া কৃষক, আর মা ছিলেন লক্ষ্মী গৃহিণী। তাদের ছোট্ট সংসারটি ছিল হাসি আর সুখের উষ্ণতায় ভরা।
কিন্তু একদিন আকাশ ভেঙে নেমে এল সেই অভিশাপ। এক ভয়ানক ঘূর্ণিঝড় প্রকৃতির সমস্ত আনন্দ কেড়ে নিল। আকাশ কালো হয়ে গেল, বাতাসের তীব্র আর্তনাদ যেন সব শেষ করে দিতে চাইল। মুহূর্তের মধ্যে নদীর গর্জনে তলিয়ে গেল তাদের বহু কষ্টে গড়া ভিটে-বাড়ি। সবকিছু হারিয়ে মজিদ সরকার ও তার পরিবার আশ্রয়হীন হয়ে পড়ল।
ঠিক সেই দুর্যোগের দিনে তাদের পাশে এসে দাঁড়ালেন মজিদের বাল্যবন্ধু রুহুল আমিন। তিনি নিঃশব্দে তাদের নিজের ভাঙাচোরা ছোট্ট একটি ঘরে থাকতে দিলেন। সেই ঘরটি ছিল কষ্টের প্রতীক। বর্ষা এলে চালের ফুটো দিয়ে অবিরাম ধারায় জল ঝরত, আর শীত এলে মাটির মেঝেকেও হার মানানো হাড়-কাঁপানো ঠান্ডা ঢুকে যেত ভেতরে। এমন অনেক দিন যেত, যেদিন তারা একবেলার খাবারও জুটোতে পারত না। এই সীমাহীন দুঃখের মধ্যেও যুবরাজের হৃদয়ের দুটো অবলম্বন সবসময় তার পাশে থাকত- কুকুর কাল্লু এবং বিড়াল শার্দূল।
শার্দূলের গায়ে ছিল ডোরাকাটা বাঘের মতো গাঢ় নকশা, যেন সে এক বন্য রাজপুত্র! দুই প্রাণীই যুবরাজকে ছায়ার মতো অনুসরণ করত, তাদের ভালোবাসায় ছিল এক গভীর নীরব প্রতিজ্ঞা।
সেদিন রাতে গ্রামের আকাশে নেমেছিল শীতের এক চরম প্রহর। কুয়াশার ঘন চাদর সব ঢেকে দিয়েছে। ঘরের ভেতরের ঠান্ডা যেন ছুরি দিয়ে চামড়া কেটে দিচ্ছিল। যুবরাজ শীতে কুঁকড়ে যাচ্ছিল, গায়ে দেওয়ার মতো ছেঁড়া কাঁথাটিও যথেষ্ট ছিল না। মজিদ সরকার ও তার স্ত্রী নীরব যন্ত্রণায় বিনিদ্র। তাদের কষ্ট দেখে কাল্লু আর শার্দূলের চোখেও যেন জল এসে গেল। তাদের নির্বাক চোখে ছিল একটিই সংকল্প-যুবরাজকে উষ্ণতা দিতেই হবে।
নিঃশব্দে তারা দু‘জন ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। অন্ধকারে তাদের পায়ের ছাপও পড়ছিল না। কাল্লু ছুটল মাঠের দিকে, ভিজে যাওয়া খড় এড়িয়ে শুকনো ধানের খড় খুঁজতে। আর শার্দূল ঘন ঝোপের নিচে জমে থাকা শুকনো, ঝরা পাতার স্তূপ থেকে উষ্ণতম অংশটুকু ঠোঁটে তুলে আনছিল। তীব্র শীত আর ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক উপেক্ষা করে সেই একটুখানি ভালোবাসা জোগাড় করতে তাদের কত না সংগ্রাম!
তারপর তারা সেই খড় ও পাতার ‘উষ্ণ বর্ম’ অত্যন্ত যত্নের সাথে যুবরাজ এবং তার বাবা-মায়ের গায়ে চাপিয়ে দিল। একটু পরেই সেই ঠান্ডা ঘরে নেমে এল এক অলৌকিক শান্তি। দুপুরের রোদের মতো আরাম পেয়ে যখন তারা শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ল, কাল্লু আর শার্দূল তখন তাদের পাশে গা এলিয়ে শুয়ে পড়ল-তাদের চোখে মুখে ফুটে উঠল নিঃস্বার্থ তৃপ্তি।
ভোরে ঘুম ভাঙতেই যুবরাজ অবাক হয়ে দেখল-তার গায়ে খড় আর পাতার এক পুরু আস্তরণ! আর পাশে বসে আছে তার দুই প্রিয় বন্ধু। একরাশ কৃতজ্ঞতা নিয়ে যুবরাজ তাদের দুজনকে জড়িয়ে ধরে বলল, তোমরা না থাকলে আমরা আজ রাতে সত্যিই বাঁচতাম না। জবাবে কাল্লু ভালোবাসায় লেজ নাড়ল, আর শার্দূল মিউ মিউ করে গা ঘেঁষে দাঁড়াল। তাদের চোখে ছিল একটাই কথা- ভালোবাসাই জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়।
কষ্টের মধ্যেও যুবরাজের ভেতরের আশা মরেনি। একদিন সে বাবাকে বলল, বাবা, আমি আবার স্কুলে যেতে চাই। আমি জানি, পড়াশোনা করলে একদিন আমাদের ভালো দিন ফিরে আসবে। আমি তোমাকে আবার হাসি-খুশি দেখতে চাই।
মজিদ সরকার ছেলের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখ ভরে এলো, কিন্তু মুখে ফুটল এক দৃঢ় মৃদু হাসি। তিনি বললেন, হ্যাঁ বাবা, তুমি অবশ্যই স্কুলে যাবে। যত কষ্টই হোক, তোমাকে আমি পড়াবো।
এগিয়ে এলেন রুহুল আমিন কাকুও। বন্ধুর পাশে দাঁড়ানো তিনি নিজের কর্তব্য মনে করলেন। তিনি যুবরাজের জন্য নতুন বই, খাতা, এমনকি একটি ব্যাগও জোগাড় করে দিলেন।
যুবরাজের জীবনে আবার ফিরে এল স্কুলের দিনগুলি। আর স্কুল থেকে ফিরলেই কাল্লু দৌড়ে আসত, শার্দূল লাফিয়ে উঠত- যেন বলতে চাইত, “চলো, আজ আমাদের নতুন কিছু শেখাবে!”
ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে সবকিছু। যুবরাজের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ এবং মজিদ সরকারের সততা দেখে গ্রামের অন্য মানুষও সাহায্যের হাত বাড়ায়। মজিদের পরিবার আবার মাথা তুলে দাঁড়ানোর সাহস খুঁজে পায়।
যুবরাজ মনে মনে এক পবিত্র প্রতিজ্ঞা করল-বড় হয়ে আমি বাবা-মাকে নতুন, মজবুত একটি বাড়ি বানিয়ে দেব। আর কাল্লু আর শার্দূল হবে সেই ঘরের প্রথম দুই অতিথি।
এভাবেই অটুট বন্ধুত্ব, গভীর ভালোবাসা আর ভবিষ্যতের উজ্জ্বল আশা নিয়ে যুবরাজের জীবন নতুন এক ভোরের দিকে এগিয়ে চলল।





















































