মাহবুব উল আলম চৌধুরী : সীমারেখা ও সাহিত্যের যাত্রা

সনেট দেব »

বাংলার সাহিত্য ও সমাজচেতনার আকাশে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাদের নাম কেবল লেখা বা ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না; তারা জীবন্ত আদর্শ, আন্দোলনের প্রতীক। মাহবুব উল আলম চৌধুরী সেই প্রতিটি নামের মধ্যে অন্যতম। তিনি ছিলেন সাহিত্যিক, সম্পাদক, সাংবাদিক এবং সমাজসেবক—একজন মানুষের জীবন ও সমাজের প্রতি এক অদম্য দায়বদ্ধতার প্রতীক। তাঁর কর্মজীবন এবং চিন্তাধারা আমাদের দেখায় যে সাহিত্যের প্রকৃত শক্তি কেবল ভাষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সমাজ পরিবর্তনের এক শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে।
চৌধুরীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদানগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো তাঁর প্রতিষ্ঠিত পত্রিকা ‘সীমান্ত’। এটি কেবল সংবাদপত্র ছিল না; এটি ছিল সমাজের অন্ধকারের দিকে আলো ফেলার সাহসী প্রচেষ্টা। ‘সীমান্ত’-এর প্রতিটি সংখ্যা ছিল সামাজিক, রাজনৈতিক এবং মানবিক প্রতিবাদের প্রতীক। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধ, কবিতা এবং সম্পাদকীয় সবই সমাজের বাস্তবতার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। এখানে উঠে আসতো সমাজের অবহেলিত, প্রান্তিক ও বঞ্চিত মানুষের কণ্ঠস্বর—যারা অন্যথায় ইতিহাসের পাতায় স্থান পেত না।
তাঁর সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল মানবিক, অন্তর্মুখী এবং সমাজমুখী। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাহিত্য কেবল কল্পনা বা রূপকথা নয়; এটি মানুষের সচেতনতা বাড়াতে পারে, ন্যায় ও সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে পারে। সমাজের অসঙ্গতি, রাজনৈতিক অন্যায় এবং মানুষের বঞ্চনার ছবি তাঁর সম্পাদকীয় ও কবিতায় ফুটে উঠত। চৌধুরী জানতেন, সমাজের সমস্যাগুলি সরাসরি চিহ্নিত করা সহজ নয়, তাই তিনি সাহিত্য ও সাংবাদিকতার এক সমন্বিত শক্তি ব্যবহার করে তা প্রকাশ করতেন।
মাহবুব উল আলম চৌধুরীর জীবনচরিত্রকে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে তাঁর কথাটি: “কাদতে আসিনি, ফাসির দাবি নিয়ে এসেছি।” এটি শুধু ব্যক্তিগত সাহসের প্রতীক নয়, বরং তাঁর জীবন ও কর্মের দর্শনের সারমর্ম। তিনি কখনও হতাশা বা ভয়কে নিজের কাছে স্থান দেননি। সাহিত্য, প্রতিবাদ এবং মানবাধিকার ছিল তাঁর এক অঙ্গীকার, এক সাহসী পদক্ষেপ।
মাহবুব উল আলম চৌধুরীর কবিতা “কাদতে আসিনি, ফাসির দাবি নিয়ে এসেছি” কেবল কবিতা নয়; এটি এক জীবন্ত বিপ্লবের শ্বাস, এক সাহসী মনুষ্যত্বের ঘোষণা। এটি তাঁর একুশের প্রথম কবিতা হিসেবে পরিচিত, বাংলা সাহিত্যে এটি এক নতুন আত্মপ্রকাশের প্রতীক। কবিতার প্রতিটি শব্দ যেন চট্টগ্রামের বুকে প্রতিধ্বনিত হয়—নির্যাতিত মানুষের জন্য কণ্ঠ, সমাজের অবহেলিত অংশের জন্য প্রতিবাদ। এখানে কেবল শোকের বা ব্যথার প্রতিফলন নয়; বরং এটি এক দৃঢ় সংকল্প, এক সাহসী অঙ্গীকার। কবিতার প্রতিটি লাইন পাঠককে প্রশ্ন করতে বাধ্য করে—আমি কি সত্যিই মানুষের ন্যায় এবং স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়াতে প্রস্তুত? এটি শুধুই ভাষার সৌন্দর্য নয়, বরং একটি চ্যালেঞ্জ, যা পাঠককে নীরবতার সীমা ভেঙে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করে।
এই কবিতা কেবল রাজনৈতিক প্রতীক নয়; এটি চৌধুরীর ব্যক্তিগত দর্শনের প্রতিফলন। তিনি জানতেন, সত্যিকারের সাহস এবং ন্যায়ের জন্য লড়াই আসে মানুষের অন্তরের গভীর থেকে। “কাদতে আসিনি, ফাসির দাবি নিয়ে এসেছি” সেই অন্তর্দৃষ্টি, যে চেতনা দিয়ে একজন লেখক, কবি বা সমাজকর্মী সমাজের কাঁটাতার অতিক্রম করতে পারে, অন্ধকারের সামনে সাহসীভাবে দাঁড়াতে পারে।
কবিতার সামাজিক ও সাহিত্যিক প্রভাবও গভীর। এটি শুধু চট্টগ্রাম বা বাংলাদেশের জন্য নয়; যে কোনো নিপীড়িত সমাজের মানুষের জন্য অনুপ্রেরণা। কবিতার শক্তি, এই প্রত্যয়—যা প্রথমে কাগজের পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হলেও আজও পাঠককে আন্দোলিত করে, সাহস যোগায় এবং ন্যায় ও সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর আহ্বান জানায়।
‘সীমান্ত’ পত্রিকার প্রতিটি লেখা ছিল এক গবেষণা এবং মানবিক দায়বদ্ধতার প্রকাশ। এখানে প্রকাশিত হয়েছে শিক্ষার অবক্ষয়, দারিদ্র‍্য, সাংস্কৃতিক বিপন্নতা, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা—সবই বিশ্লেষিত। চৌধুরী কেবল সমস্যার বর্ণনা দেননি; পাঠককে সচেতন করেছেন এবং কাজের প্রেরণা দিয়েছেন।
তিনি সমাজসেবা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় ছিলেন। চট্টগ্রামের প্রান্তিক নবনাট্য সংঘ, শান্তি-ফৌজ এবং বিভিন্ন সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি নতুন প্রজন্মকে সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তিনি বুঝতেন, সাহিত্য কেবল বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে।
মাহবুব উল আলম চৌধুরীর জীবন ও কাজের মাধ্যমে বোঝা যায়, সাহিত্যের প্রকৃত শক্তি সমাজে প্রভাবিত করার ক্ষমতায় নিহিত। তাঁর লেখায় প্রতিফলিত হয় মানবিক দর্শন, যা বলে—মানুষকে সচেতন করতে হবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে সাহসী হতে হবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি চট্টগ্রামের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে অমলিন প্রভাব ফেলেছে।
‘সীমান্ত’ পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা ও গুরুত্বপূর্ণ লেখা যেমন—শওকত ওসমানের সমালোচনা, মোতাহের হোসেন চৌধুরীর নিবন্ধ, আবুল ফজলের সমসাময়িক বিশ্লেষণ—সবই চৌধুরীর সম্পাদকীয় নীতিকে সামনে নিয়ে এসেছে। তিনি সবসময় বিশ্বাস করতেন, সাহিত্য শুধু লেখা নয়; এটি মানুষের জীবনে পরিবর্তনের প্রতীক।
মাহবুব উল আলম চৌধুরীর জীবন ও কর্ম আমাদের শেখায় যে, সাহিত্যের প্রকৃত শক্তি কেবল শব্দে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানবিকতা জাগিয়ে তুলতে পারে, সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে পারে এবং মানুষকে সাহসী হতে প্রেরণা দিতে পারে। ‘সীমান্ত’ পত্রিকা, তার কবিতা ও সম্পাদকীয়—সবই সেই প্রমাণ, যেখানে সাহিত্য এক সময়ের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং মানবিক প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে। “কাদতে আসিনি, ফাসির দাবি নিয়ে এসেছি”—এই বাক্যটি শুধু চৌধুরীর সাহসের প্রতীক নয়, বরং আমাদের সকলের জন্য এক চিরন্তন আহ্বান: ভয়ের সামনে স্থির থাকো না, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াও, এবং সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল থাকো। তার সাহিত্য ও মানবিক দর্শন আজও আমাদের প্রজন্মকে স্মরণ করিয়ে দেয়, সাহসী মন সীমারেখা অতিক্রম করতে পারে এবং মানুষের অন্তরের অন্ধকারে আলো জ্বালাতে পারে। সত্যিই, চৌধুরীর জীবন ও কাজ আমাদের শেখায়, সাহিত্যের শক্তি তখনই পূর্ণতায় প্রকাশ পায় যখন তা মানবতার, ন্যায়ের এবং সত্যের পক্ষে লড়াইয়ের অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।