সম্প্রতি বিভিন্ন গবেষণা ও পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে যে, বাংলাদেশে মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ৮২ লাখে দাঁড়িয়েছে। এই সংখ্যাটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি আমাদের সামাজিক কাঠামো, জনস্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক ভয়াবহ অশনিসংকেত। একটি উন্নয়নকামী রাষ্ট্রের বিশাল জনশক্তি যখন মাদকের মরণনেশায় আচ্ছন্ন হয়, তখন সেই রাষ্ট্রের সামগ্রিক অগ্রগতি স্থবির হয়ে পড়া অনিবার্য।
যুবসমাজের অবক্ষয় ও সামাজিক অস্থিরতা
মাদকের এই বিষবাষ্পের সবচেয়ে বড় শিকার দেশের তরুণ ও যুবসমাজ। গবেষণায় দেখা গেছে, মাদকাসক্তদের একটি বিশাল অংশ কিশোর ও যুবক। ইয়াবা, আইস (ক্রিস্টাল মেথ) এবং ফেন্সিডিলের মতো মরণঘাতী মাদকগুলো শহর থেকে গ্রামগঞ্জে অত্যন্ত সহজলভ্য হয়ে পড়েছে। মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে এই তরুণরা জড়িয়ে পড়ছে চুরি, ছিনতাই, এমনকি খুনের মতো জঘন্য অপরাধে। পারিবারিক অশান্তি ও বিচ্ছেদের মূলে এখন বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই নেশা।
বাংলাদেশে মাদক উৎপাদন না হলেও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এটি আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সীমান্ত দিয়ে দেশে ঢুকছে বিভিন্ন মরণঘাতী ড্রাগ। প্রভাবশালী সিন্ডিকেট এবং স্থানীয় পর্যায়ের অসাধু চক্রের যোগসাজশে মাদক আজ হাতের নাগালে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত অভিযান সত্ত্বেও মাদকের সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ না হওয়া আমাদের প্রশাসনিক দুর্বলতা ও দুর্নীতির চিত্রকেই ফুটিয়ে তোলে।
মাদক নির্মূলে কেবল ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বা কঠোর আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়। এটি একটি বহুমুখী সমস্যা, যার সমাধানও হতে হবে সমন্বিত। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কাদের সাথে মিশছে, সে বিষয়ে বাবা-মাকে সচেতন হতে হবে। স্কুল-কলেজে মাদকের কুফল নিয়ে নিয়মিত আলোচনা ও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। মাদকাসক্তদের অপরাধী হিসেবে না দেখে রোগী হিসেবে বিবেচনা করে মানসম্মত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়াতে হবে।
৮২ লাখ মাদকাসক্তের এই বিশাল ভার বহনের ক্ষমতা বাংলাদেশের নেই। আমরা যদি এখনই মাদকের এই জয়যাত্রা রুখতে না পারি, তবে আমাদের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশ অভিশাপে পরিণত হবে। মাদকের শিকড় উপড়ে ফেলতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং ব্যাপক সামাজিক আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই। মনে রাখতে হবে, একটি মাদকমুক্ত সমাজই হতে পারে টেকসই উন্নয়নের মূল ভিত্তি।
মতামত সম্পাদকীয়


















































