মনন ও দ্রোহের কবি হেলাল হাফিজ

আরফান হাবিব »

বাংলা কবিতার ধারায় হেলাল হাফিজ এমন এক কণ্ঠস্বর, যিনি বিচ্ছিন্নতা, প্রতিকূলতা, প্রেম, দেশপ্রেম এবং অন্তর্গত মানবচেতনার দহনকে একসূত্রে গেঁথে এক অনন্য কাব্যস্বর নির্মাণ করেছেন। তাঁর কবিতায় যেমন স্বাধীনতার চেতনায় উজ্জীবিত দ্রোহ আছে, তেমনি আছে প্রণয়ের নরম ছায়াঘন আবেশ। এই দুই বিপরীত সুর একত্রিত হয়ে তাঁর কবিতাকে করেছে বহুমাত্রিক ও বহুরৈখিক। মানুষের জীবনের কালচক্রে প্রোথিত সুখ-দুঃখ, চৈতন্য ও অচৈতন্যের রংধনুময় আলো-ছায়া-সবই তাঁর কবিতায় ভাস্বর হয়ে ওঠে। মনেরও একটা জানালার প্রয়োজন হয়। হেলাল হাফিজের কবিতায় উচ্চারিত কষ্টের প্লাবন পাঠকের মনোরোগ উপসম করে।
হেলাল হাফিজের কবিতার কেন্দ্রে আছে মানুষের মানসিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক মুক্তি। স্বাধীনতার আগে ও পরে বাংলাদেশের ইতিহাসের জটিল সময়গুলো যে-মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে, তাদের স্বপ্ন-বেদনা, আশা-হাহাকার তাঁর কবিতায় অনিবার্যভাবে স্থান পেয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ তাঁর কবিতার এক প্রধান প্রেরণা। যুদ্ধের আগুন, অশ্রু ও রক্তাক্ত অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়েই তিনি বোধ করেছেন স্বাধীনতার প্রকৃত তাৎপর্য। তাঁর বিখ্যাত কবিতায় তিনি লিখেছেন-স্বাধীনতা মানে শুধু একটি পতাকা নয়, বরং এমন এক বিশ্ব যেখানে ভূমিহীন কৃষক, পথশিশু, শ্রমজীবী নারী-সকলেই মানবিক মর্যাদা পাবে। কবি প্রশ্ন তোলেন স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতিগুলো কোথায় হারিয়ে গেল। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন সেই অঙ্গীকারগুলোর কথা- পাতা কুড়োনির মেয়ের ওম পাওয়া, যুদ্ধশিশুর সম্মানজনক জীবন, সাম্যের কৃষি, যৌথ সুখ। এই প্রশ্নগুলো তাঁর কবিতাকে দিয়েছে রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ঐতিহাসিক তীক্ষ্মতা। যদিও দ্রোহ তাঁর কবিতার একটি প্রধান স্তম্ভ, তবু হেলাল হাফিজ মূলত একজন গভীর রোমান্টিক কবি। প্রেম তাঁর কবিতায় শুধু অনুভূতি হিসেবে উপস্থিত নয়; এটি একটি দার্শনিক চেতনা, এক ধরনের মানসিক আলোকতীর্থ। তাঁর প্রেমে আনন্দ আছে, বেদনা আছে, আছে হৃদয়াগ্নির তীব্র তাপ। ‘হলো না, হলো না’ – এই দীর্ঘশ্বাসে ভরা কবিতায় ব্যক্তিগত ব্যর্থতা অতিক্রম করে তিনি শেষ পর্যন্ত মানবিক কল্যাণে আশ্রয় নেন-
“আমার হলো না তাতে কি হয়েছে? তোমাদের হোক।”
এই একবাক্যেই হেলাল হাফিজের প্রেমের মানবিক রূপ স্পষ্ট-নিজের ক্ষতেও তিনি অপরের প্রতি সদয়। তাঁর অপর আরেকটি বিখ্যাত প্রেমের প্রশ্ন- “ভালোবাসা এসে যদি বলে-চলো যেদিক দু’চোখ যায়, যাবে?” এই প্রশ্নের সরলতায় আছে গভীর আবেগ এবং অনিশ্চিত জীবনের প্রতি আত্মসমর্পণ। প্রেম তাঁর কাছে কখনো আত্মজিজ্ঞাসা, কখনো নীরব প্রতীক্ষা, কখনো উষ্ণ আকুলতা। যেমন-
‘‘একবার ডাক দিয়ে দেখো আমি কতোটা কাঙাল
কতো হুলুস্থূল অনটন আজন্ম ভেতরে আমার।’’
এই অনুচ্চারিত ব্যথাই তাঁকে করে তোলে আধুনিক প্রেমের কাব্যভাষার একজন প্রগাঢ় নির্মাতা। হেলাল হাফিজের কবিতা অনেকাংশেই আত্মচরিতমূলক। এতে আছে তাঁর জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত ভাঙন, হারানো দিনগুলোর বেদনাচিহ্ন, একাকিত্বের নিঃশব্দ শীতলতা। তাঁর আত্মজিজ্ঞাসায় যেমন বিচ্ছেদের কষ্ট আছে, তেমনি আছে গভীর জীবনদর্শন। ‘কষ্ট নেবে কষ্ট’-কবিতায় তিনি যে বহুরঙা কষ্টের তালিকা দেন, তা কেবল ব্যক্তিগত দাহ নয়; এটি মানবজীবনের সমগ্র অভিজ্ঞতার মানচিত্র। লাল, নীল, কালো, পাথরচাপা সবুজ- কষ্টের এসব রং দিয়ে তিনি মানুষের অন্তর্জগতকে নতুনভাবে চেনান।
এছাড়া প্রত্ন-স্মৃতি তাঁর কবিতায় বারবার ফিরে আসে। তালপাখা, ক্যালেন্ডারের ব্যথিত পৃষ্ঠা, পুরোনো মেলার স্মৃতি-এসব চিহ্ন তাঁর কবিতাকে দেয় হৃদয়ের ‘সরল সিম্ফনি’। আবেগ কখনোই কৃত্রিম নয়; বরং জীবনের বৈরী অভিঘাতের ভেতর থেকে উঠে আসে এক ধরনের নীরব দীর্ঘশ্বাস।
হেলাল হাফিজের কবিতায় ব্যক্তিসত্তা কখনোই সমাজ-রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। তিনি জানেন-প্রেমিকেরও সময় আছে রাস্তায় নামার, দেশের জন্য দাঁড়াবার। তাই তিনি লেখেন বিপুল শক্তিতে-
“এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।”
এ বাক্য শুধু রাজনৈতিক আহ্বান নয়; এটি এক অস্তিত্ব-সিদ্ধান্ত। নিজের অবস্থান, নিজের ভালোবাসা, নিজের অবদমন-সবকিছুকেই নতুন সংজ্ঞায়িত করার সময়ের ডাক। এই সমাজ-ইতিহাস-প্রেমের সংমিশ্রণই হেলাল হাফিজকে আলাদা করে।
হেলাল হাফিজের কবিতা তাঁর শব্দের শক্তিতে দীপ্ত। তিনি শব্দ ও চিত্রকল্পকে এমনভাবে মেলান যে তা পাঠকের মনের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। রোমান্টিক স্বপ্ননির্ঝর ও কাব্যিক দুঃসাহস উভয়ই তাঁর শব্দের শরীরে মিশে থাকে। কখনো ড্রামাটিক মনোলগের ভঙ্গি, কখনো একেবারে অন্তরঙ্গ ভাষা-এই বৈচিত্র্য তাঁর কাব্যের নান্দনিক শক্তি। তাঁর প্রেমের কবিতা যেমন স্নিগ্ধ, তেমনি তাঁর দেশপ্রেম ও দ্রোহের কবিতা সমান্তরালভাবে দৃঢ়। অন্যদিকে তাঁর আত্মজিজ্ঞাসা কবিতার ভেতর গড়ে তোলে এক ধরনের অতীন্দ্রিয় স্বর-
“নারী তুমি এক শৈল্পিক তাবিজ; দুঃখের আরেক নাম হেলাল হাফিজ।”
নিজেকে এমন নিরাভরণভাবে প্রকাশ করা বাংলা কবিতায় বিরল। হেলাল হাফিজের কবিতায় প্রেম ও দ্রোহ বিরোধী নয়; বরং একে অন্যকে সমৃদ্ধ করে। দ্রোহ তাঁর প্রেমের গভীরতা বাড়ায়, আর প্রেম তাঁর দ্রোহকে মানবিক করে তোলে। ‘অমিংমাসিত সন্ধি’ কবিতায় তিনি বলেন-
“এসো দু’জন প্লাবিত হই প্রেমে।”
প্রেম এখানে ব্যক্তির পরিমাপ ছাড়িয়ে এক মহাজাগতিক ঐক্যের দিকে গমন করে। তাই তাঁর কবিতা জীবনকে কেবল বোধের স্তরে নয়, অনুধাবনের স্তরেও স্পর্শ করে। তিনি দেখিয়েছেন- ব্যক্তিচেতনা ও সমষ্টিচেতনা-উভয়ই মানুষের পরিপূর্ণতার দুটি অপরিহার্য পরিধি।
হেলাল হাফিজ এমন এক কবি, যিনি প্রেমকে দিয়েছেন মহিমা, দ্রোহকে দিয়েছেন বোধের তীক্ষ্মতা, আর স্মৃতি-বেদনা-আশাকে দিয়েছেন এক অনন্য ভাষা। তাঁর কবিতার গভীরে আছে মানুষের আদি আকাঙ্ক্ষা-স্বাধীনতা, ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও স্বপ্নের বাস্তবায়ন। তাঁর কবিতা পাঠককে কেবল সৌন্দর্যের অভিজ্ঞতাই দেয় না; দেয় মানবিক সাহস, দেয় অন্তর্গত আলোকের স্পর্শ। বাংলা কবিতায় তাই হেলাল হাফিজ চিরকালই থাকবেন—দ্রোহের দীপশিখা হাতে দাঁড়ানো এক রোমান্টিক আলোকযোদ্ধা হয়ে।