ইলিশ নিয়ে বাঙালির একটি আবেগ আছে। রসনা তৃপ্তির জন্য না যতটা তার চেয়ে বেশি মানসিক তৃপ্তি। বর্ষা আসবে বর্ষা যাবে কিন্তু ইলিশ খাওয়া হবে না তা মানতে নারাজ বাঙালি। তবে দুঃখজনক হলো, বাঙালির বিশেষ করে বাংলাদেশের জাতীয় মাছটির স্বাদ নিতে পারছে না অধিকাংশ বাঙালি। ইলিশ এখন নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্তের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে। তা শুধু বড়লোকদের খাবারে পরিণত হয়েছে।
এক কেজি ওজনের কাছাকাছি সাইজের ইলিশের কেজি ২৫০০/২৬০০ টাকা। এর চেয়ে সামান্য বড় হলে তিন হাজার টাকার ওপরে প্রতি কেজি।
চাঁদপুরে যেখানে ইলিশের একরকম ঘাঁটি বলা যায়, সেখানেও এক কেজির মাছ ২৫০০ টাকার আশেপাশে, দেড় কেজির মাছ প্রতি কেজিতে তিন হাজার টাকার ওপরে।
এবছর দাম বেশি হওয়ার পেছনে মোটাদাগে মূল কারণ হিসেবে উঠে আসছে তা হলো, ইলিশ মাছের সরবরাহ কম হওয়া। অর্থাৎ ভরা মৌসুমে প্রত্যাশার তুলনায় কম মাছ পাওয়া যাচ্ছে। পাশের দেশ ভারতেও এখন ইলিশ রপ্তানি হচ্ছে না, আবার সেদেশে স্থানীয় যেসব ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে তার দাম বাংলাদেশের তুলনায় কম।
মৎস্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে যেখানে পাঁচ লাখ ৭১ হাজার মেট্রিক টন ইলিশ আহরণ হয়েছিল, সেটা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কমে পাঁচ লাখ ২৯ হাজার মেট্রিক টন হয়েছিল।
এবছর আবহাওয়া বেশিরভাগ সময়জুড়েই অনুকূলে না থাকায় ‘জেলেরা ইলিশ ধরতে গিয়েও বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন’ বলছেন মো. আনিছুর রহমান, যিনি একজন ইলিশ গবেষক এবং মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, নদী কেন্দ্র চাঁদপুরের সাবেক মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা।
এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, নদীতে অনেক জায়গাতেই নাব্যতা কমে যাওয়া। বিশেষত দক্ষিণাঞ্চলে সাগর থেকে নদীতে যে পথ ধরে ডিম ছাড়ার জন্য ইলিশ আসে, সেখানে অনেক জায়গাতেই পলি পড়ে ডুবোচর তৈরি হয়েছে। যেখানে ইলিশ অনেকটাই গভীর পানিতে চলাচল করে সেখানে নাব্যতার সমস্যা ইলিশের স্বাভাবিক গতিপথকে বাধাগ্রস্ত করে।
এই নাব্যতার সমস্যা শুধু দক্ষিণাঞ্চল নয়, দেশজুড়েই নদনদীতে প্রভাব ফেলেছে। ফলে ইলিশের বিচরণের পাশাপাশি নৌযান চলাচলেও ব্যাঘাতের কারণ হয়। এছাড়াও রয়েছে দূষণের মতো সমস্যা, যার কারণে মাছের খাবার ও বিস্তারের জন্য পরিবেশ অনেক দিক দিয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
যেসব সমস্যার কারণে সার্বিকভাবে মাছের বিস্তার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সেগুলোর সমাধান করা অতটা সহজ নয়। যেমন জলবায়ু সংকটে সমুদ্রের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া বা দূষণের মতো দিকগুলো ঠিক করতে যতটা সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন, সেই জায়গার ঘাটতি রয়েছে।