বাংলা ভাষার ঊষালগ্ন দিগদর্শন

মোখতারুল ইসলাম মিলন »

বাংলা সাহিত্য ও সাংবাদিকতার ইতিহাসে ১৮১৮ সাল একটি মাইলফলক। এই বছরই প্রথম বাংলা ভাষায় মাসিক সাময়িকপত্র প্রকাশিত হয়, যার নাম ছিল ‘দিগদর্শন’। শ্রীরামপুর মিশনের ব্যাপটিস্ট মিশনারিরা এই ঐতিহাসিক পত্রিকাটি প্রকাশ করেন। জোশুয়া মার্শম্যান এবং জন ক্লার্ক মার্শম্যান ছিলেন এর প্রধান উদ্যোক্তা। দিগদর্শন শব্দের অর্থ হল ‘দিকদর্শক’ বা ‘পথপ্রদর্শক’। নামকরণেই এর উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মিশনারিরা চেয়েছিলেন এই পত্রিকা বাংলার সাধারণ মানুষের কাছে জ্ঞান ও তথ্যের আলো পৌঁছে দেবে। সে যুগে বাংলা ভাষায় মুদ্রিত সামগ্রী ছিল অত্যন্ত সীমিত। দিগদর্শন সেই শূন্যতা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
পত্রিকাটি শ্রীরামপুর থেকে মাসিক হিসেবে প্রকাশিত হতো। এতে ধর্মীয় প্রবন্ধ, নৈতিক শিক্ষামূলক রচনা, বিজ্ঞান, ইতিহাস ও ভূগোল সম্পর্কিত নানা তথ্য প্রকাশিত হতো। মিশনারিদের উদ্যোগে প্রকাশিত হলেও এটি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশে অসাধারণ অবদান রেখেছিল। প্রথমবারের মতো সাধারণ বাঙালি পাঠক নিয়মিত বাংলা ভাষায় লেখা পড়ার সুযোগ পেলেন। দিগদর্শনের আগে ১৮১৬ সালে গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য সম্পাদিত ‘বাংলা গেজেট’ নামে একটি সাপ্তাহিক সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। তবে সংবাদপত্র আর সাময়িকপত্রের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। সংবাদপত্র মূলত দৈনন্দিন ঘটনাবলী প্রকাশ করে, অন্যদিকে সাময়িকপত্র জ্ঞান, সাহিত্য ও চিন্তার বাহন। এই বিচারে দিগদর্শনই প্রথম বাংলা সাময়িকপত্র হিসেবে স্বীকৃত।

দিগদর্শনের ভাষা ছিল তৎকালীন বাংলা গদ্যের প্রাথমিক রূপ। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতরা যে বাংলা গদ্যরীতি তৈরি করেছিলেন, তারই ধারাবাহিকতায় এই পত্রিকা প্রকাশিত হয়। ভাষা ছিল সংস্কৃতঘেঁষা এবং কিছুটা জটিল, তবে সময়ের সাথে তা আরো সহজ ও প্রাঞ্জল হয়ে ওঠে। মিশনারিদের প্রচেষ্টায় শুরু হলেও দিগদর্শন বাঙালি সমাজে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক জাগরণের পথ প্রশস্ত করেছিল। এরপর একে একে প্রকাশিত হয় সমাচার দর্পণ, সম্বাদ কৌমুদী, তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা প্রভৃতি। উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণে সাময়িকপত্রের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। দিগদর্শন সেই যাত্রার প্রথম পদক্ষেপ। আজ থেকে দুইশ বছরেরও বেশি সময় আগে যে পত্রিকাটি বাংলা ভাষায় জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, তার উত্তরাধিকার আজও আমাদের সাহিত্য ও সাংবাদিকতার জগতে বহমান। দিগদর্শন শুধু একটি পত্রিকা নয়, এটি বাংলা ভাষার আধুনিকতার প্রথম বার্তাবাহক।