ওবায়দুল সমীর »
সাঁঝ আকাশে বাঁকা চাঁদ উঠতেই গ্রাামের নামাজঘরের সামনে ছোট্ট রাহাত দৌড়ে এসে দাঁড়াল। আকাশের দিকে আঙুল তুলে সে চিৎকার করে উঠলো,
‘মা! দেখো, ঈদের চাঁদ উঠেছে!’
মা বারান্দা থেকে হেসে বললেন,
‘হ্যাঁ রে, কাল ঈদ। এবার তোকে কিন্তু ভোরেই উঠতে হবে।’
চাঁদের খবর মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ল পুরো গ্রামে। কেউ ছাদে উঠল, কেউ মাঠে গেল, কেউ আবার মোবাইলে ছবি তুলতে ব্যস্ত। রাহাতের বন্ধু মিতা, সাব্বির আর ছোট্ট রুবেলও ছুটে এলো। তাদের চোখে একরাশ আনন্দের ঝিলিক।
‘কাল কিন্তু সবাই একসঙ্গে ঈদগাহে যাবো, ঠিক আছে?’ সাব্বির বলল।
‘আর নামাজ শেষে সেমাই খেতে আমার বাড়িতে,’ মিতা যোগ করল।
রাহাত চুপ করে রইলো। সে জানে, রুবেলের নতুন জামা হয়নি। রুবেলের বাবা অসুস্থ, ঘরে টানাটানি চলছে। রুবেল হাসছিল বটে, কিন্তু তার চোখে লুকানো একটা কষ্ট রাহাত টের পেলো।
রাতে খাবার টেবিলে বসে রাহাত বাবাকে বলল,
‘আব্বু, আমার তো গত বছরের পাঞ্জাবিটাও ভালো আছে। নতুনটা যদি রুবেলকে দিই?’
বাবা একটু অবাক হয়ে তাকালেন। তারপর মৃদু হেসে বললেন,
‘তুই কি সত্যি মন থেকে বলছিস?’
‘হ্যাঁ আব্বু। ঈদে তো সবাই নতুন জামা পরে, না হলে কেমন লাগে!’
মা চুপচাপ শুনছিলেন। তিনি এসে রাহাতের মাথায় হাত রেখে বললেন,
‘তোর এই মনটাই ঈদের আসল আনন্দ।’
পরদিন ভোরে আজানের সুরে পুরো গ্রাম জেগে উঠল। ভোরের পাখিরা কিচিরমিচির করছে, বাতাসে শিউলি ফুলের গন্ধ। রাহাত তাড়াতাড়ি উঠে ওজু করে নামাজের জন্য প্রস্তুত হলো। কিন্তু আজ সে নিজের নতুন পাঞ্জাবি পরেনি। সে গত বছরেরটা পরেছে। তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে গেল।
রুবেলের ঘরে কড়া নাড়ল রাহাত। হাতে সুন্দর ভাঁজ করা প্যাকেট।
‘এইটা তোর জন্য, রুবেল।’
রুবেল অবাক।
‘আমার জন্য?’
‘হ্যাঁ, খুলে দেখ।’
প্যাকেট খুলতেই চকচকে নতুন পাঞ্জাবি বের হলো। রুবেলের চোখ ভিজে উঠল।
‘কিন্তু তুই?’
‘আমার তো আগেরটাই আছে। তুই পরলে আমি বেশি খুশি হবো।’
রুবেলের মা দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি কাঁপা গলায় বললেন,
‘বাবা, আল্লাহ তোমাকে ভালো রাখুক।’
ঈদগাহের মাঠে আজ অন্যরকম দৃশ্য। ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু সবাই এক কাতারে দাঁড়িয়েছে। সাদা টুপি আর রঙিন পাঞ্জাবিতে মাঠ যেন রঙিন ফুলের বাগান। নামাজ শেষে সবাই কোলাকুলি করছে।
রুবেল নতুন পাঞ্জাবি পরে যখন রাহাতকে জড়িয়ে ধরল, তার মুখের হাসি দেখে মনে হলো পুরো আকাশটা যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে গেছে।
মিতা এসে বলল,
‘আজ সবাইকে আমার বাড়িতে আসতেই হবে!’
মিতাদের উঠোনে বড় হাঁড়িতে সেমাই রান্না হচ্ছে। দুধের গন্ধে চারপাশ ম ম করছে। সাব্বির চামচ দিয়ে নাড়তে গিয়ে একটু ছিটিয়ে ফেলতেই সবাই হেসে উঠল।
খাওয়াদাওয়ার ফাঁকে রাহাত দেখল, পাশের বাড়ির বুড়ো কাকু একা বসে আছেন। তার ছেলেমেয়েরা শহরে থাকে, ঈদে আসতে পারেনি। রাহাত দৌড়ে গিয়ে বলল,
‘কাকু, আপনি এখানে একা কেন? চলুন, আমাদের সঙ্গে বসুন।’
বুড়ো কাকু মৃদু হেসে বললেন, ‘তোরা থাকলেই তো আমার ঈদ।’
সন্ধ্যায় আবার সেই বাঁকা চাঁদ আকাশে ঝুলে রইল। কিন্তু আজ রাহাতের মনে অন্যরকম শান্তি। সে বুঝল, নতুন জামা, সেমাই, কোলাকুলি সবই আনন্দের অংশ, কিন্তু আসল আনন্দতো ভাগাভাগিতেই লুকিয়ে আছে ।
রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে মা জিজ্ঞেস করলেন,
‘আজকের ঈদ কেমন লাগল?’
রাহাত একটু ভেবে বলল,
‘মা, আগে ভাবতাম ঈদ মানে শুধু নতুন জামা আর মজা। এখন বুঝলাম, ঈদ মানে সবাইকে নিয়ে খুশি হওয়া।’
মা হেসে বললেন,
‘ঠিক বলেছিস। বিভেদ ভুলে একসঙ্গে থাকার নামই তো ঈদ।’
বাইরে তখন হালকা বাতাস বইছে। দূরে কোথাও হাসির শব্দ ভেসে আসছে। ছোট্ট গ্রামটা আজ যেন আরও আপন হয়ে উঠেছে। বাঁকা চাঁদটি আকাশ থেকে যেন নীরবে দোয়া করছে- খুশি থাকুক সবাই, একসঙ্গে।






















































