এম আব্দুল হালীম বাচ্চু »
ফেব্রুয়ারির প্রতিটি সকাল তাওহীদ হাসানের কাছে অন্যরকম আবেগ নিয়ে আসে। রাস্তার ধারে ফুটন্ত লাল ফুল, দেয়ালে লেখা কবিতার লাইন- “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানোৃ”-সবকিছু যেন তাকে নীরবে ডাকতে থাকে। বাতাসে ভাসে এক অদৃশ্য গর্ব, এক নিঃশব্দ সাহস, যা সে স্পষ্ট করে বোঝে না, কিন্তু অনুভব করে গভীরভাবে।
তাওহীদ হাসান ক্লাস নাইনের ছাত্র। পড়াশোনায় ভালো, কিন্তু ক্লাসে বাংলায় কথা বলতে গেলেই তার গলা আটকে আসে। বন্ধুদের মৃদু হাসি তার ভেতরে অদ্ভুত এক ভয় তৈরি করে। সে হেসে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু ভয়টা লুকানো যায় না।
একদিন স্কুলে ঘোষণা হলো-ভাষা দিবস উপলক্ষ্যে ভাষা শহিদদের নিয়ে গল্প বলা প্রতিযোগিতা হবে। বাংলার শিক্ষক বললেন,
-“এটা শুধু প্রতিযোগিতা নয়, এটা আমাদের পরিচয়ের কথা।”
এ কথা শুনে তাওহীদ হাসানের বুক ধুকধুক করে উঠল। সে গল্প লিখতে ভালোবাসে, কিন্তু মঞ্চে দাঁড়িয়ে কথা বলা তার কাছে পাহাড়সম ভয়।
বাড়ি ফিরে সে অস্বাভাবিক রকম চুপচাপ। বড়ো চাচা বিষয়টা বুঝতে পেরে জিজ্ঞেস করলেন,
“কী হয়েছে তাওহীদ, আজ এত চুপ কেন?”
তাওহীদ ধীরে বলল,
“চাচ্চু, সবাই এত সুন্দর করে বাংলায় কথা বলে আমি পারি না। আমার ভয় লাগে।”
চাচ্চু মৃদু হেসে বললেন,
“আমরাও একদিন ভয় পেয়েছিলাম। কিন্তু মায়ের ভাষার জন্য সেই ভয় পেছনে ফেলেছিলাম।”
চাচ্চুর কণ্ঠে ১৯৫২ সালের এক শীতল ফেব্রুয়ারির গল্প জীবন্ত হয়ে উঠল-রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা ছাত্রদের সাহস, তাদের রক্তের দাম, নিঃশব্দ অথচ দৃঢ় প্রতিবাদ। চাচু বললেন,
“ভাষা শুধু কথা বলার জিনিস নয়। ভাষা মানে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো।”
সেদিন রাতে তাওহীদ ঘুমোতে পারল না। খাতা খুলে সে লিখতে বসে গেল এক কিশোরের গল্প, যে ভয় পেত, কিন্তু ভাষার ডাক তাকে সাহসী করে তোলে।
২১শে ফেব্রুয়ারি এলো। শহিদ মিনারে ফুল দিতে গিয়ে সে দেখল ছোটো ছোটো বাচ্চারাও গাইছে- “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো”। তার চোখে অজান্তেই পানি এসে গেল।
স্কুলের মঞ্চে তার নাম ডাকা হলো। হাত কাঁপছিল, গলা শুকিয়ে আসছিল। হঠাৎ চাচুর কথা মনে পড়ল-“ভাষা মানে মাথা উঁচু।”
সে গভীর নিশ্বাস নিলো, তারপর বলতে শুরু করল। গল্পটা ছিল সহজ, কিন্তু সত্য। তার কণ্ঠে ভয় আর ভালোবাসা একসঙ্গে মিশে গেল। হলঘর নিস্তব্ধ হয়ে রইল।
শেষ লাইনে সে বলল, “আমি ভয় পেয়েছিলাম, কিন্তু আমার ভাষা আমাকে সাহস শিখিয়েছে।”
এক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর উষ্ণ হাততালি। সে পুরস্কার পেয়েছিল কি না, সেটা তাওহীদের মনে নেই। কিন্তু সে বুঝে গিয়েছিল- ফেব্রুয়ারি শুধু একটি মাস নয়।
বাংলার সেই রক্তঝরা ইতিহাসের কারণেই আজ ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়। ফেব্রুয়ারি মানে নিজের ভাষায় নিজের কথা বলার অদম্য সাহস, যা শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো পৃথিবীকে শিখিয়েছে মাথা উঁচু করে কথা বলতে।



















































