রতন কুমার তুরী »
একটি দেশকে স্বাধীনতা এনে দিতে একজন কবির এমন কলম লড়াই সত্যই ফিলিস্তিনিদের জীবদ্দশায় স্মরণে রাখার মতো। শুধু কবিতাি ্দয়েও যে একজন মানুষ দেশের জন্য দুনিয়াব্যাপি লড়াই করতে পারে তা দারবিশ মাহামুদের কবিতা না পড়লে বোঝা যায়না। প্রকৃতপক্ষে কবি ও লেখক মাহমুদ দারবিশকে ফিলিস্তিনের জাতীয় কবি হিসাবে গণ্য করা হয়। ১৯৮৮ সালে তিনি ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র লেখেন, যা ছিল ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। তিনি তার কাজের জন্য বহু পুরস্কার পেয়েছেন। তিনি বেশ কয়েকটি সাহিত্য পত্রিকায় সম্পাদক হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। দারবিশ আরবি ছাড়াও ইংরেজি, ফরাসি ও হিব্রু ভাষায়ও কথা বলতেন।
মাহমুদ দারবিশ ১৯৪১ সালে পশ্চিম গ্যালিলির আল-বিরওয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সেলিম ও হুরেইয়া দারবিশের দ্বিতীয় সন্তান। নাকবার সময় তার গ্রাম ইসরাইলি বাহিনী দখল করে নেয় এবং পরিবারটি লেবাননে পালিয়ে যায়, প্রথমে জেনিনে এবং এরপর দামুরে। ইসরাইলি বাহিনী তাদের নিজ গ্রাম ধ্বংস করে দেয়, যাতে এর বাসিন্দারা নতুন ইহুদি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে তাদের বাড়িতে ফিরে যেতে না পারে। এক বছর পর দারবিশের পরিবার ইসরাইলের একর এলাকায় ফিরে আসে এবং দেইর আল-আসাদে বসতি স্থাপন করে।
দারবিশ জাদেদি থেকে দুই কিলোমিটার উত্তরে কাফর ইয়াসিফে উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯ বছর বয়সে তার প্রথম কবিতার বই প্রকাশিত হয়। ১৯৭০ সালে দারবিশ তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে পড়াশোনার জন্য যান। ১৯৭১ সালে তিনি কায়রোয় চলে আসেন। সেখানে তিনি একটি দৈনিক পত্রিকায় কাজ করেন। ১৯৭৩ সালে তিনি যখন পিএলও-এ যোগদান করেন, তখন তাকে ইসরাইলে পুনরায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। ১৯৭৩ সালে বৈরুতে তিনি একটি মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করেন এবং পিএলও’র প্যালেস্টাইন রিসার্চ সেন্টারে পরিচালক হিসাবে কাজ করেন। ১৯৮৭ সালে দারবিশ পিএলও’র নির্বাহী কমিটিতে নির্বাচিত হন। ১৯৮৮ সালে তিনি ফিলিস্তিনি জনগণের স্বাধীনতার ঘোষণা হিসাবে একটি ইশতেহার লেখেন।
১৯৯৩ সালে দারবিশ অসলো চুক্তির বিরোধিতা করে পিএলও নির্বাহী কমিটি থেকে পদত্যাগ করেন। এ বিষয়ে পরে তিনি উল্লেখ করেন : ‘চুক্তিতে আমি যা দেখেছি তা হলো ইসরাইলি সমস্যার একটি ইসরাইলি সমাধান এবং পিএলওকে ইসরাইলের নিরাপত্তা সমস্যা সমাধানে তার ভূমিকা পালন করতে হবে।’ ফাতাহ ও হামাসের মধ্যে গোষ্ঠীগত সহিংসতা নিয়ে দারবিশ সমালোচনা করেছেন।
১৭ বছর বয়সে দারবিশ নাকবায় শরণার্থীদের দুর্দশা এবং তাদের প্রত্যাবর্তনের অনিবার্যতা নিয়ে কবিতা লিখতে শুরু করেন। জীবদ্দশায় দারবিশের ৩০টিরও বেশি কবিতার বই এবং আটটি গদ্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। দারবিশের সাহিত্যকর্ম বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে। টেক্সাসের হিউস্টনের মেমোরিয়াল হারম্যান হাসপাতালে হৃদরোগের অস্ত্রোপচারের তিন দিন পর ৯ আগস্ট ২০০৮ সালে ৬৭ বছর বয়সে মাহমুদ দারবিশ মারা যান। ফিলিস্তিনিদের যাপিত জীবনে দারবিশ -এর কবিতা এক অবশ্যম্ভাবী অনুসঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখবও ফিলিস্তিনিরা ঘুম থেকে ওঠে দারবিশের কবিতা পড়ে। বিশ্ব পরিমন্ডলে দারবিশের কবিতা অসংখ্য মানুষকে ভাবিত করে। এমন একটি নিত্য সংঘাতময় দেশে জন্ম গ্রহণ করেও দারবিশ কীভাবে এতো সহজভাবে কবিতা,লিখেছিল এবং লেখনির মাধ্যমে তা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে ছিল তা আজও বিস্ময়।




















































