হাবিবুল হক বিপ্লব »
ক্যালেন্ডার বা দিনপঞ্জি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অতি পরিচিত একটি বস্তু। আমরা সবাই কম বেশী বাংলা ক্যালেন্ডার, ইংরেজী ক্যালেন্ডার এবং আরবী ক্যালেন্ডারের সাথে পরিচিত। ইদানিং অনেকে চাইনা ক্যালেন্ডারের কথা জানে দেখলাম টিভিতে নিউজ দেখার কল্যাণে। আজ আমি আপনাদেরকে জানাবো পৃথিবীতে প্রচলিত এবং পরিচিত আরো কিছু ক্যালেন্ডারের সাথে। ভালো লাগলে জানাতে ভুলবেন না। তাহলে আপনাদের জন্য ইনফরমেশন জোগাড় করতে আনন্দ লাগবে।
বঙ্গাব্দ
১৪১৯ বঙ্গাব্দের আষাঢ় মাসে সনাতন বাংলা বর্ষপঞ্জী এবং সংস্কারকৃত বাংলা বর্ষপঞ্জীর পার্থক্য চিহ্নিত হয়েছে।
বঙ্গাব্দ, বাংলা সন বা বাংলা বর্ষপঞ্জি হল বঙ্গদেশের একটি ঐতিহ্য মণ্ডিত সৌর পঞ্জিকা ভিত্তিক বর্ষপঞ্জি। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সৌরদিন গণনা শুরু হয়। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে একবার ঘুরে আসতে মোট ৩৬৫ দিন কয়েক ঘণ্টা সময়ের প্রয়োজন হয়। এই সময়টাই এক সৌর বছর। গ্রেগরীয় সনের মতন বঙ্গাব্দেও মোট ১২ মাস। এগুলো হল বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন ও চৈত্র। আকাশে রাশিমণ্ডলীতে সূর্যের অবস্থানের ভিত্তিতে বঙ্গাব্দের মাসের হিসাব হয়ে থাকে। যেমন যে সময় সূর্য মেষ রাশিতে থাকে সে মাসের নাম বৈশাখ।
বাংলাদেশ এবং পূর্ব ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, অসম ও ত্রিপুরা অঞ্চলে এই বর্ষপঞ্জি ব্যবহৃত হয়। বঙ্গাব্দ শুরু হয় পহেলা বৈশাখ বা বৈশাখ মাসের প্রথম দিনে। বঙ্গাব্দ সব সময়ই গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জীর চেয়ে ৫৯৩ বছর কম। বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী আজকের তারিখ হল ২৭ আষাঢ়, ১৪২৩ বঙ্গাব্দ।
জুলিয়ান বর্ষপঞ্জি
জুলিয়ান বর্ষপঞ্জী খৃষ্টপূর্ব ৪৬ খ্রিষ্টাব্দে জুলিয়াস সিজার কর্তৃক প্রবর্তিত একটি ঐতিহ্যবাহী ক্যালেন্ডার। এটি রোমান বর্ষপঞ্জীর ভিত্তি করে প্রবর্তন করা হয়। এ বর্ষপঞ্জি খৃষ্টপূর্ব ৪৫ খ্রিষ্টাব্দে মিশরের রোমান বিজয়ের পর থেকে কার্যকর করা হয়। এটি রোমান সাম্রাজ্য, অধিকাংশ ইউরোপের একটি উদিয়মান ক্যালেন্ডার ছিল। এটি ধীরে ধীরে উন্নতিসাধনের মাধ্যমে ১৫৮২ সালে পোপ গ্রেগরি ১৩ কর্তৃক গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জী রুপে প্রবর্তন করা হয়।
জুলিয়ান পঞ্জিকায় বছর হিসাব করা হত ৩৬৫ দিনে এবং দিনগুলো ১২ টি মাসে ভাগ ছিল। প্রতি ৪বছর পর ফেব্রুয়ারি মাস অধিবর্ষ হত। জুলিয়ান বর্ষপঞ্জীতে গড়ে ৩৬৫.২৫ দিনে এক বছর হত। এটি ছিল একটি সম্পূর্ণ সৌর ভিত্তিক বর্ষপঞ্জী।
গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জী
গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জী, গ্রেগোরিয়ান বর্ষপঞ্জী, পাশ্চাত্য বর্ষপঞ্জী, ইংরেজি বর্ষপঞ্জী বা খ্রিস্টাব্দ হল আন্তর্জাতিকভাবে প্রায় সর্বত্র স্বীকৃত বর্ষপঞ্জী। ১৫৮২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি পোপ ত্রয়োদশ গ্রোগোরির এক আদেশানুসারে এই বর্ষপঞ্জীর প্রচলন ঘটে। সেই বছর কিছু মুষ্টিমেয় রোমান ক্যাথলিক দেশ গ্রেগোরিয় বর্ষপঞ্জী গ্রহণ করে এবং পরবর্তীকালে ক্রমশ অন্যান্য দেশসমূহেও এটি গৃহীত হয়।
পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি কর্তৃক বর্ষপঞ্জী সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা ছিল কারণ পূর্ববর্তী জুলিয়ান বর্ষপঞ্জীর গণনা অনুসারে একটি মহাবিষুব থেকে আরেকটি মহাবিষুব পর্যন্ত সময়কাল ধরা হয়েছিল ৩৬৫.২৫ দিন, যা প্রকৃত সময়কাল থেকে প্রায় ১১ মিনিট কম। এই ১১ মিনিটের পার্থক্যের ফলে প্রতি ৪০০ বছর অন্তর মূল ঋতু থেকে জুলিয়ান বর্ষপঞ্জীর প্রায় তিন দিনের ব্যবধান ঘটত। পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরির সময়ে এই ব্যবধান ক্রমশ বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ১০ দিনের এবং ফলস্বরূপ মহাবিষুব ২১ মার্চের পরিবর্তে ১১ মার্চ পড়েছিল। যেহেতু খ্রিস্টীয় উৎসব ইস্টারের দিন নির্ণয়ের সাথে মহাবিষুব জড়িত সেহেতু মহাবিষুবের সাথে জুলিয়ান বর্ষপঞ্জীর এই ব্যবধান রোমান ক্যাথলিক গির্জার কাছে অনভিপ্রেত ছিল।
গ্রেগোরিয়ান বর্ষপঞ্জীর সংস্কার দু’টি ভাগে বিভক্ত ছিল: পূর্ববর্তী জুলিয়ান বর্ষপঞ্জীর সংস্কার এবং ইস্টারের তারিখ নির্ণয়ের জন্য গির্জায় ব্যবহৃত চান্দ্র পঞ্জিকার সংস্কার। জনৈক চিকিৎসক অ্যালয়সিয়াস লিলিয়াস কর্তৃক দেয় প্রস্তাবের সামান্য পরিবর্তন ঘটিয়ে এই সংস্কার করা হয়।
থাই (শ্যামদেশীয়) সৌর বুদ্ধাব্দ
দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার থাইল্যান্ডে একটি সৌর বর্ষপঞ্জি প্রচলিত আছে যা বুদ্ধাব্দ নামেই পরিচিত। এই অব্দটিও “সূর্যসিদ্ধান্ত” দ্বারা প্রভাবিত এবং এই অব্দে সূর্যসিদ্ধান্তের সৌরবর্ষ গণনার পদ্ধতিটি অনুসৃত হয়ে থাকে। সূর্যের একেকটি রাশিতে অবস্থানের উপর ভিত্তি করে একেকটি মাস গণিত হয়। ভারতে প্রচলিত বঙ্গাব্দে এবং প্রাচীন শকাব্দেও অনুরূপ প্রণালীতেই গণিত হয় মাস এবং দিনাঙ্ক। এই অব্দে একেকটি মাসের নামকরণ হয়েছে সৌরমণ্ডলে অবস্থিত একেকটি রাশির সংস্কৃত নামানুসারে।
ইরানি বর্ষপঞ্জী
ইরানি বর্ষপঞ্জী অথবা পারস্য বর্ষপঞ্জী হল বৃহত্তর ইরানে প্রায় দুই সহস্রাব্দব্যাপী প্রচলিত বর্ষপঞ্জী। ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে জলবায়ু, ধর্মীয় ও প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে এই বর্ষপঞ্জী সংস্কার করা হয়েছে।
অধুনা ইরানি বর্ষপঞ্জী বা সৌর হিজরি হল ইরান ও আফগানিস্তানের জাতীয় বর্ষপঞ্জী। এই বর্ষপঞ্জী অনুসারে বছর শুরু হয় ইরানি সময়ে গণিত মহাবিষুবের দিনে। বর্ষশুরুর এই দিনটি নির্ণীত হয় গ্রেগোরিয়ান বর্ষপঞ্জীর তুলনায় অধিকতর নিখুঁত উপায়ে। কারণ মহাবিষুবের প্রকৃত সময় নির্ণয়ের ক্ষেত্রে এই বর্ষপঞ্জী গাণিতিক নিয়মের পরিবর্তে জ্যোতির্বিজ্ঞানের গণনার উপর নির্ভরশীল।
ইংরেজিতে এই বর্ষপঞ্জীর অব্দ চিহ্নিতকরণে অচ অর্থাৎ লাতিন শব্দ অহহড় চবৎংরপড়-র সংক্ষিপ্ত রূপ ব্যবহার করা হয়। ইরানি বর্ষপঞ্জীতে সাধারণতঃ ২১ মার্চ অথবা তার দুই একদিন আগে বা পরে বর্ষ শুরু হয়। এই অব্দের সাথে ৬২১ অথবা ৬২২ যোগ করে খ্রিস্টাব্দ নির্ণয় করা যায়।
বাইজেন্টাইন বর্ষপঞ্জী
বাইজেন্টাইন বর্ষপঞ্জী হল ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চ কর্তৃক ব্যবহৃত একটি সৌর ভিত্তিক পঞ্জিকা। এটি কনস্টান্টিনোপল সৃষ্টির যুগ (ঈৎবধঃরড়হ ঊৎধ ড়ভ ঈড়হংঃধহঃরহড়ঢ়ষব) বা বিশ্ব এর যুগ (ঊৎধ ড়ভ ঃযব ডড়ৎষফ) নামে পরিচিত। এটি ৯৮৮ থেকে ১৪৫৩ সাল পর্যন্ত বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যে ব্যবহৃত ক্যালেন্ডার।
বাইজেন্টাইন পঞ্জিকা মুলত জুলিয়ান বর্ষপঞ্জীর উপর ভিত্তি করে প্রণয়ন করা। এর বছর শুরু হয় সেপ্টেম্বরের ১ তারিখ থেকে।




















































