পুলিশের নৈতিক স্খলন বিপন্ন জননিরাপত্তা

সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন জনমনে চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। জব্দকৃত বিপুল পরিমাণ ইয়াবা আত্মসাৎ করার অভিযোগে একজন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সহ ১০ জন পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের যেখানে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি, সেখানে খোদ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে মাদক আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ আসা কেবল হতাশাজনকই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য এক বড় অশনিসংকেত।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মূল দায়িত্ব হলো অপরাধ দমন এবং নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু যখন সে বাহিনীর সদস্যরা উদ্ধারকৃত মাদক পুনরায় বাজারে ছড়িয়ে দেয় বা ব্যক্তিগত লাভের জন্য আত্মসাৎ করে, তখন সাধারণ মানুষ কার ওপর আস্থা রাখবে? একজন ওসির নেতৃত্বে পুরো একটি ইউনিটের এই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়া প্রমাণ করে যে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং বাহিনীর ভেতরে শৃঙ্খলা ও তদারকির গভীর সংকট বিদ্যমান।
মাদক বর্তমান প্রজন্মের কাছে একটি মরণব্যাধি। এই বিষাক্ত ছোবল থেকে সমাজকে রক্ষা করতে গিয়ে অনেক পুলিশ সদস্য অকাতরে প্রাণ দিচ্ছেন। অথচ তাদেরই কিছু সহকর্মীর এমন অপকর্ম পুরো বাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে। জব্দকৃত মাদক গায়েব করে দেওয়া বা ব্যবসার সাথে যুক্ত হওয়া সরাসরি পেশাগত বিশ্বাসঘাতকতা। এটি কেবল নৈতিক স্খলন নয়, বরং ফৌজদারি অপরাধের শামিল। অপরাধীদের রক্ষক যখন ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন অপরাধীরা আরও সাহসী হয়ে ওঠে এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি জেঁকে বসে।
এই ঘটনায় কেবল বরখাস্ত বা বিভাগীয় ব্যবস্থাপনাই যথেষ্ট নয়। মাদকের সাথে জড়িত যে কারো পরিচয় যাই হোক না কেন, তাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর বিচার নিশ্চিত করতে হবে যেন ভবিষ্যতে কেউ ইউনিফর্ম পরে এমন দুঃসাহস না দেখায়। একইসাথে, থানায় জব্দকৃত মালামাল বা ‘আলামত’ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং কঠোর তদারকির মাধ্যমে লকার বা মালখানার নিরাপত্তা বৃদ্ধি করতে হবে। গুটিকয়েক দুর্নীতিবাজ সদস্যের জন্য পুরো বাহিনীর ভাবমূর্তি নষ্ট হতে দেওয়া যায় না। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে হলে পুলিশ বাহিনীকে প্রথমে ভেতর থেকে পরিচ্ছন্ন হতে হবে। আমরা আশা করি, যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে এই ঘটনার নেপথ্যের কারিগরদের কঠোর শাস্তি হবে এবং পুলিশ প্রশাসনে স্বচ্ছতা ফিরে আসবে।