সাইয়্যিদ মঞ্জু »
কিছু দিন কেবল ইতিহাসের সালতামামি বদলায় না, বদলে দেয় মানুষের জীবন ও হৃদয়ের গতিপথ। একাত্তরের সেই দিনগুলো ছিল তেমনই অগ্নিঝরা, যখন প্রতিটি বাঙালিকে হয় লড়াকু সৈনিক, নয়তো নীরব সাক্ষী হতে হয়েছিল। বাংলাদেশের ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন মহেশখালী দ্বীপও হানাদার বাহিনীর বিষাক্ত থাবা থেকে রেহাই পায়নি। সেই উত্তাল সময়ে, এই স্মৃতিকথার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন আমার বাবা আজিজুর রহমান, যিনি তখন মাত্র বারো বছরের এক কিশোর, এবং তাঁর স্নেহময়ী জননী, আমার দাদি হাজেরা খাতুন।
বাবার মুখে শোনা এই গল্পগুলো একাত্তরের ডায়েরির পাতা, যেখানে লেখা আছে ভয়, প্রতিরোধ আর মানবিকতার অদেখা অধ্যায়। এটি কেবল একটি যুদ্ধকালীন স্মৃতিকথা নয়, বরং এটি প্রমাণ করে যে স্বাধীনতার চেতনা কোনো বয়স মানে না।
শুরুটা ছিল একেবারেই সাধারণ। সেদিন সকালে দাদি হাজেরা খাতুনের ইচ্ছা হলো পিঠা তৈরি করবেন। ছেলেকে পাঠালেন গোরকঘাটা বাজারে, উদ্দেশ্য- দুটো ভালো দেখে কলার কাঁদি নিয়ে আসা। বারো বছরের কিশোর আজিজুর রহমান, হাতে বাজারের ব্যাগ আর হাতে পাকা কলার কাঁদি ঝুলিয়ে ফিরছিল আপন মনে। বিদু মাস্টারের বাড়ির কোণ পার হতেই তার চোখে পড়ল সামনের দৃশ্য। রাস্তার মোড়ে সাক্ষাৎ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। তাদের পদাতিক বুটের শব্দে যেন মাটির বুক কেঁপে উঠছিল।
ভয়ে তার বুক কেঁপে উঠল, হাতে-পায়ে রক্ত চলাচল বন্ধ হওয়ার উপক্রম। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পাক সৈন্যরা তাকে ঘিরে ধরল। কলাগুলো দেখতে পেয়েই তাদের চোখে যেন এক আদিম ক্ষিদে ঝলসে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে তারা ১২ বছরের ছেলেটির হাত থেকে কলার কাঁদি কেড়ে নিয়ে যেন ক্ষিদে মেটানোর উৎসবে মেতে উঠল। সেই সৈন্যদের চেহারায় ছিল এক নৃশংস উল্লাস, যা এক কিশোরের হৃদয়ে গভীর ছাপ ফেলেছিল।
কিশোর আজিজুর তখন কাঁপছে, মনে শুধু বাঁচার আকুতি। সৈন্যরা যখন কলা খাওয়া নিয়ে ব্যস্ত, সেই সুযোগে হঠাৎ করেই এক অদ্ভুত সাহস এল তার মনে। সে হাতের ঝাপটা মেরে পশ্চিম দিক, নিজের বাড়ি কুতুবজুমের দিকে দৌড় দিল। দৌড়, কেবল দৌড়-পেছনে ছুটছে মৃত্যুভয়। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসার আগেই সে যখন বাড়ির উঠোনে পৌঁছাল, তখন সে হাঁপানির শেষ সীমায়। দাদি হাজেরা খাতুন ছেলেকে অক্ষত অবস্থায় ফিরে পেয়ে সৃষ্টিকর্তার দরবারে হাজারো শুকরিয়া আদায় করলেন। মায়ের আঁচলের নিচে আশ্রয় নিয়ে সেদিন বাবা বুঝেছিলেন, স্বাধীনতা শুধু একটি ভূখণ্ড নয়, একটি নিরাপদ আশ্রয়ও বটে।
হানাদার বাহিনীর লক্ষ্যবস্তুতে কুতুবজুম গ্রামের যে কয়েকটি পরিবার পড়েছে, দৈলার পাড়ার খান সাহেবের বাড়ি, মধ্যম পাড়ার লুতুর বাপের বাড়ি, আমাদের বাড়ি (খরুমিয়ার ছেলে কবির আহমদের বাড়ি) এবং পশ্চিম পাড়ার মাস্টার কামালের বাড়ি। এই পরিবারগুলো ছিল তাদের সন্দেহের তালিকায়। গোটা গ্রামে তখন উৎকণ্ঠার সবাই জানে, যেকোনো মুহূর্তে নেমে আসতে পারে ধ্বংসলীলা।
উত্তরের দিকে তাকাতেই দেখা গেল আগুনের লেলিহান শিখা। খান সাহেবের বাড়িতে আগুন দেয়া হয়েছে! আকাশে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছিল, যা দেখে গ্রামের সবার মনে নিশ্চিত হলো: এবার বুঝি আর রক্ষা নেই। পাক বাহিনীর দল এবার আমাদের দিকেই আসছে। দাদি হাজেরা খাতুন তখন আল্লাহর নাম জপছেন।
কিন্তু ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল। মহেশখালীর জটিল ভূ-প্রকৃতি হয়তো সেদিন তাদের বাঁচিয়ে দিল। যে পথ ধরে তাদের আমাদের বাড়ি আসার কথা ছিল, তারা ভুল করে অন্য পথে চলে গেল। সেই মুহূর্তের ভুল সিদ্ধান্তই আমাদের বাড়িটিকে রক্ষা করে। আগুনের বিভীষিকা খুব কাছ থেকে দেখে, মৃত্যুর শীতল স্পর্শ অনুভব করে সেই যাত্রায় বেঁচে যাওয়া ছিল দাদি আর বাবার জীবনের এক অলৌকিক ঘটনা। সেই দিন থেকে তারা বুঝেছিলেন, প্রতিটি বেঁচে থাকা মুহূর্তই এক একটি বিজয়।
কিশোর আজিজুর রহমান যুদ্ধ কেবল আত্মরক্ষার ছিল না, তা ছিল মানবতাকে বাঁচিয়ে রাখারও যুদ্ধ। সকালে মাছ ধরার নৌকা ভিড়ল ঘটিভাঙার চরে। নৌকা থেকে নেমে বাবা দেখেন, চরের প্যারা বনের আড়ালে আশ্রয় নিয়েছে অসংখ্য হিন্দু পরিবার। ঘরবাড়ি ছেড়ে তারা অনিশ্চিত জীবনের যাত্রী। তাদের চোখে ছিল গভীর শূন্যতা, মুখে ছিল না কোনো কথা, কেবল ক্ষুধাকাতর দৃষ্টি।
মানুষের এই সীমাহীন দুঃখকষ্টের ছবি দেখে বারো বছরের বাবার মন কেঁদে উঠল। পকেটে হয়তো খুব বেশি অর্থ ছিল না, কিন্তু ছিল এক বিশাল হৃদয় ও সাহসের সঞ্চার। তিনি সেই মুহূর্তে আর কিছু না ভেবে, নিজের নৌকাতেই রান্না শুরু করলেন। যতটুকু চাল-ডাল ছিল, তা দিয়ে মামা নূরুল আমিন কে নিয়ে সামান্য খাবার তৈরি করে সেই ক্ষুধার্ত, আশ্রয়হীন মানুষগুলোর মুখে তুলে দিলেন। সেদিন নিজের মুখে ভাত তুলে দেওয়ার চেয়ে, বাবার কাছে এই কাজটিই ছিল পরম তৃপ্তির।
যুদ্ধ মানুষকে ভয় দেখায়, বিভেদ সৃষ্টি করে; কিন্তু এই বারো বছরের কিশোরের কাজ প্রমাণ করেছিল, যুদ্ধের দিনেও মানবতা কখনও হার মানে না। ঘটিভাঙার চরের সেই সকাল ছিল এক নীরব প্রতিজ্ঞা-যে দেশ স্বাধীনতার জন্য লড়াই করে, সে দেশের মানুষ কখনও একাকীত্বে ভোগে না। এই উদারতা, এই নিঃশর্ত সহযোগিতা ছিল একাত্তরের অগ্নিঝরা দিনের আসল চেতনা। আমার পিতার ডায়েরি মানে কেবল তারিখ আর ঘটনা নয়; এটি সাহস, আত্মত্যাগ আর মমতার এক জীবন্ত দলিল। এই স্মৃতিগুলোই আমাদের শেখায়, স্বাধীনতা সহজে আসেনি, এর পেছনে রয়েছে লক্ষ মানুষের নির্ভীক আত্মত্যাগ ও নিঃশর্ত ভালোবাসা।






















































