পাহাড়খেকোদের থাবা ও জলাবদ্ধতা, কবে মুক্তি পাবে নগরবাসী

বন্দরনগরী চট্টগ্রামকে একসময় বলা হতো ‘প্রাচ্যের রানি’। পাহাড়, নদী আর সমুদ্রের এক অপূর্ব মিতালি এই শহরকে দিয়েছিল অনন্য রূপ। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক ভারসাম্য যেভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে, তাতে এই প্রাচীন জনপদ এখন তার অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। গত কয়েক সপ্তাহে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় কাটার যে মহোৎসব লক্ষ্য করা গেছে, তা কেবল পরিবেশগত অপরাধ নয়, বরং পুরো নগরীর জন্য এক অশনি সংকেত।
চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, আকবরশাহ, বায়েজিদ, খুলশী এবং লোহাগাড়া-সীতাকুণ্ডের মতো এলাকাগুলোতে একদল প্রভাবশালী চক্র প্রশাসনের চোখের সামনেই পাহাড় কেটে সাবাড় করছে। দিনের আলোতে গাছ নিধন আর রাতের আঁধারে মাটি সরিয়ে নেওয়ার ফলে পাহাড়গুলো এখন কঙ্কালসার হয়ে পড়েছে। এই পাহাড় কাটার সরাসরি প্রভাব পড়ছে চট্টগ্রামের চিরচেনা অভিশাপ—’জলাবদ্ধতা’র ওপর। পাহাড়ের কাটা মাটি বৃষ্টির পানির সাথে মিশে নগরের ড্রেন ও নালাগুলো ভরাট করে ফেলছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই কোমর সমান পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে চকবাজার, বাকলিয়া কিংবা আগ্রাবাদের মতো এলাকাগুলো।
বিগত কয়েক বছরে জলাবদ্ধতা নিরসনে হাজার হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে খাল খনন ও রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণের কাজও অনেকটা এগিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, যদি পাহাড় কাটা বন্ধ না হয় এবং সেই বালুমাটি এসে নালা-নর্দমা ভরাট করে ফেলে, তবে এই বিশাল ব্যয়ের সুফল কতটুকু মিলবে? এটি অনেকটা চালুন দিয়ে জল সেঁচার মতো অবস্থা। ড্রেন পরিষ্কার করা হচ্ছে, অথচ উৎস মুখ থেকে আসা পলি বন্ধ করার কোনো স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।
পাহাড় কাটার পেছনে কেবল এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী দায়ী নয়, বরং প্রশাসনের নির্লিপ্ততা এবং রাজনৈতিক প্রশ্রয়কেও দায়ী করছেন পরিবেশবাদীরা। আইন অনুযায়ী পাহাড় কাটা দণ্ডনীয় অপরাধ হওয়া সত্ত্বেও গ্রেফতার বা জেল-জরিমানা যেন কেবলই লোকদেখানো আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পাহাড় কাটার পর সেখানে অবৈধ বস্তি স্থাপন করা হচ্ছে, যা বর্ষাকালে পাহাড় ধসের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। প্রতি বছর বর্ষায় পাহাড় ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে, প্রশাসন তখন কয়েক দিন তৎপরতা দেখায়, কিন্তু তারপর আবার সব থিতিয়ে যায়। এই ‘মৌসুমি তদারকি’ দিয়ে চট্টগ্রামের প্রকৃতিকে রক্ষা করা সম্ভব নয়।
চট্টগ্রামের আপামর জনতা এখন একটি স্থায়ী সমাধান চায়। কেবল বড় বড় স্লুইস গেট বা পাম্প হাউজ দিয়ে জলাবদ্ধতা দূর হবে না, যদি না কর্ণফুলী নদীকে ড্রেজিং করে নাব্য ফিরিয়ে আনা হয় এবং পাহাড় কাটা কঠোর হস্তে দমন করা হয়। পাহাড় হলো এই শহরের ফুসফুস; ফুসফুস ছিদ্র করে যেমন মানুষ বাঁচতে পারে না, তেমনি পাহাড় বিলীন করে চট্টগ্রাম শহর টেকসই হতে পারে না।
এখনই সময় সিডিএ, সিটি কর্পোরেশন এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি করার। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে কোনো ধরনের চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে পাহাড় খেকোদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করতে হবে। চট্টগ্রামের পরিবেশ ও ঐতিহ্য রক্ষা করা কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়, এটি নাগরিক অধিকারের বিষয়। আমরা আশা করি, আসন্ন বর্ষার আগেই প্রশাসন কঠোর হবে এবং পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করবে। অন্যথায়, প্রকৃতি যখন তার প্রতিশোধ নেওয়া শুরু করবে, তখন এই আধুনিক মেগা প্রজেক্টগুলোও আমাদের রক্ষা করতে পারবে না।