সম্প্রতি জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে একটি অবোধ শিশুর প্রাণহানির সংবাদ আমাদের স্তম্ভিত করেছে। তুচ্ছ ভূমিখণ্ড নিয়ে বিরোধ যখন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয় এবং তার শিকার হয় একটি নিষ্পাপ শিশু, তখন বুঝতে হবে সমাজের নৈতিক অবক্ষয় কোন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। মীরসরাইয়ে জায়গা-জমি সংক্রান্ত্র বিরোধের জেরে দুই পক্ষের মারামারির এক পর্যায়ে তিন বছরের এক শিশু প্রাণ হারিয়েছে। শিশুটির নাম আব্দুল্লাহ। সে ছিল নুরুল আলম রাসেল নামের এক ব্যক্তির একমাত্র সন্তান। বুধবার দুপুর ২টার দিকে উপজেলার জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের দক্ষিণ সোনাপাহাড় মস্তাননগর এলাকার মোস্তফা ভূঁইয়া বাড়িতে এই ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় তিনজনকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এই ঘটনা কেবল একটি পরিবারের শোক নয়, বরং আমাদের সামগ্রিক সামাজিক পচন এবং মানবিক মূল্যবোধের চরম দেউলিয়া হওয়ার প্রমাণ।
আমাদের সমাজে ভূমি নিয়ে বিরোধ দীর্ঘদিনের। কিন্তু আধুনিক সময়ে এই বিরোধ যে বীভৎস রূপ ধারণ করছে, তা রীতিমতো শঙ্কার কারণ। এক টুকরো জমির জন্য নিজের আত্মীয়-স্বজন বা প্রতিবেশীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া, এমনকি শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করা আজ যেন সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। মানুষের ভেতরে পরমতসহিষ্ণুতা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। রাগের মাথায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলা এবং নিষ্ঠুরতায় মেতে ওঠা একটি বিকৃত মানসিকতার প্রতিফলন। যখন বিবাদের কেন্দ্রবিন্দুতে নারী ও শিশুদের টেনে আনা হয়, তখন তা আর কেবল ‘মারামারি’ থাকে না, তা হয়ে ওঠে চরম কাপুরুষতা।
যেকোনো সামাজিক বা পারিবারিক সংঘাতের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয় নারী ও শিশুরা। শিশুদের কোনো পক্ষ থাকে না, বিবাদের কারণ বোঝার সক্ষমতাও তাদের নেই। অথচ বড়দের জিঘাংসার প্রথম শিকার হচ্ছে তারাই। যে সমাজে একটি শিশু তার নিজ আঙ্গিনায় নিরাপদ নয়, যেখানে তুচ্ছ সম্পদের লোভে শিশুর রক্ত ঝরানো হয়, সেই সমাজকে আমরা কোনোভাবেই ‘সভ্য’ বলতে পারি না। নারীদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য নারীদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়, যা আমাদের বিচারহীনতার সংস্কৃতিরই বহিঃপ্রকাশ।
কেন মানুষ সামান্য কারণে আইন হাতে তুলে নিচ্ছে? এর প্রধান কারণ হলো বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা। ভূমি সংক্রান্ত মামলাগুলো বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, যার ফলে মানুষের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে এবং তারা নিজেরাই বলপ্রয়োগ করে ফয়সালা করতে চায়। পাশাপাশি, এ ধরনের জঘন্য হত্যাকাণ্ডের যদি দ্রুত এবং দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত না করা হয়, তবে অপরাধীরা আরও দুঃসাহসী হয়ে ওঠে।
এই নিষ্ঠুরতা বন্ধে কেবল কঠোর আইন যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা ও নৈতিক জাগরণ। তুচ্ছ সম্পদের চেয়ে মানুষের জীবনের মূল্য যে অনেক বেশি, এই উপলব্ধি প্রতিটি পরিবারে জাগ্রত করতে হবে।
একটি শিশুর মৃত্যু কেবল একটি প্রাণ হারানো নয়, বরং এটি আমাদের বিবেক ও মনুষ্যত্বের পরাজয়। আমরা যদি এখনই এই নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে সোচ্চার না হই, তবে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি অনিরাপদ ও বিভীষিকাময় সমাজ রেখে যাব। আমরা আর কোনো শিশুর রক্তাত্ব নিথর দেহ দেখতে চাই না। রাষ্ট্র ও সমাজকে আজ এক হয়ে এই বর্বরতার অবসান ঘটাতে হবে।
মতামত সম্পাদকীয়



















































