বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে সমাপ্ত হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা বাদে এবারের নির্বাচন মোটামুটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে—এটি নিঃসন্দেহে স্বস্তির বিষয়। দীর্ঘ প্রতীক্ষা এবং নানা রাজনৈতিক মেরুকরণের পর সাধারণ মানুষ আবারও ব্যালটের মাধ্যমে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছে। সম্পূর্ণ ফলাফল এখনও হাতে না এলেও, প্রাথমিক প্রবণতা থেকে এটি স্পষ্ট যে জনমত একটি নির্দিষ্ট পরিবর্তনের পক্ষে কিংবা স্থিতিশীলতার ধারাবাহিকতায় রায় দিয়েছে। তবে ফলাফল যাই হোক না কেন, নির্বাচনের এই শান্তিপূর্ণ আবহ যেন শেষ পর্যন্ত বজায় থাকে, সেটিই এখন সময়ের প্রধান দাবি।
আমাদের দেশের নির্বাচনী সংস্কৃতির একটি অন্ধকার দিক হলো নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা। অতীতে দেখা গেছে, ভোটের ফল প্রকাশের পর বিজয়ী পক্ষ উল্লাসে মেতে ওঠে এবং অনেক ক্ষেত্রে পরাজিত পক্ষের ওপর হামলা, ভাঙচুর বা জানমালের ক্ষতি করার মতো ঘটনা ঘটে। আমরা দৃঢ়ভাবে আশা করি, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পর সেই পুরনো ও নেতিবাচক প্রথার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না। রাজনৈতিক দলগুলোকে মনে রাখতে হবে যে, নির্বাচনে হার-জিৎ থাকবেই, কিন্তু সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি যেন কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয়। প্রতিহিংসার রাজনীতি গণতন্ত্রকে বারবার পেছনের দিকে ঠেলে দেয়। তাই বিজয়ী পক্ষকে যেমন ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দিতে হবে, তেমনি পরাজিত পক্ষকেও জনরায় মেনে নিয়ে সুস্থ ধারার গঠনমূলক রাজনীতিতে মনোনিবেশ করতে হবে।
গণতন্ত্র কেবল একটি নির্বাচনের নাম নয়; এটি একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সেই প্রক্রিয়ার শুরু মাত্র। প্রকৃত গণতন্ত্র তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিটি প্রতিষ্ঠান স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পায় এবং জনগণের প্রতিটি কণ্ঠস্বরের মূল্যায়ন হয়। দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও টেকসই স্থিতিশীলতার জন্য সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে ঐকমত্য প্রয়োজন। নির্বাচনী বিভেদ ভুলে গিয়ে দেশ গড়ার কাজে সবাই আত্মনিয়োগ করবেন—এটিই দেশবাসীর প্রত্যাশা। বিশেষ করে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব হবে ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের সেবা করা। সংসদে বিরোধী দলের জোরালো ও যৌক্তিক ভূমিকাও গণতন্ত্রের সুস্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য।
একটি সফল নির্বাচনের পর আমাদের সামনের চ্যালেঞ্জ হলো অর্জিত শান্তিকে রক্ষা করা। সরকার, রাজনৈতিক দল, প্রশাসন এবং সাধারণ নাগরিক—সবাইকে সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। কোনো প্রকার উসকানি বা অপপ্রচারে কান না দিয়ে ধৈর্য ধরলে আমরা একটি সুন্দর ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার পথে এগিয়ে যেতে পারব। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে যে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা শুরু হলো, তার সুফল প্রতিটি ঘরে পৌঁছাক এবং বাংলাদেশ হয়ে উঠুক প্রকৃত অর্থেই একটি সুশাসিত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র। নির্বাচনী উৎসবের সমাপ্তি যেন এক নতুন সম্ভাবনার জন্ম দেয়।
মতামত সম্পাদকীয়



















































