ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে গত দেড় মাসে ২৭৪টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে প্রার্থীর ওপর আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে ১৫টি এবং হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে পাঁচটি। সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচন হলো উৎসবের নাম। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এই উৎসবের সাথে ‘সহিংসতা’ শব্দটি যেন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা থেকে শুরু করে ফলাফল প্রকাশ পর্যন্ত জানমালের যে ক্ষয়ক্ষতি আমরা প্রতিনিয়ত দেখে আসছি, তা কেবল দুঃখজনকই নয় বরং গণতন্ত্রের মূল চেতনার পরিপন্থী। জনমানুষের ম্যান্ডেট পাওয়ার লড়াই কেন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পরিণত হবে, সে প্রশ্ন আজ প্রতিটি সচেতন নাগরিকের।
নির্বাচনী সহিংসতা কমানোর জন্য সবার আগে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। রাজনৈতিক দলগুলোকে কেবল মুখে নয়, অন্তরে বিশ্বাস করতে হবে যে শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ পেশিতে নয়, বরং জনসমর্থনে। দলগুলোর উচ্চপর্যায় থেকে তৃণমূল পর্যন্ত শান্তি বজায় রাখার কঠোর নির্দেশনা থাকতে হবে। কোনো কর্মী বা সমর্থক সহিংসতায় জড়ালে দল থেকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করলে তা অপরাজনীতি রোধে সহায়ক হবে।
দ্বিতীয়ত, নির্বাচন কমিশনের (ইসি) স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা এখানে মূল চাবিকাঠি। কমিশনকে কেবল একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে টিকে থাকলে হবে না, বরং তাদের কার্যক্রমের মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে। নির্বাচনের সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সম্পূর্ণ পেশাদারিত্বের সাথে ব্যবহার করা এবং যেকোনো উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে দ্রুত ও পক্ষপাতহীন পদক্ষেপ নেওয়া ইসির অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অতিঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলো চিহ্নিত করে আগাম নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে বড় ধরনের সহিংসতা এড়ানো সম্ভব।
তৃতীয়ত, অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি রোধে শূন্য সহনশীলতা দেখাতে হবে। নির্বাচনের আগে ও পরে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং লাইসেন্সকৃত অস্ত্রের অপব্যবহার বন্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা জরুরি। পাশাপাশি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে যারা দাঙ্গা বা সহিংসতা উসকে দেয়, তাদের কঠোর নজরদারির আওতায় আনতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে ডিজিটাল অপপ্রচার রোধ করা এখন সময়ের দাবি।ভোটারদের সচেতনতা ও অংশগ্রহণই পারে সহিংসতামুক্ত নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করতে। নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকে একটি ভয়হীন পরিবেশ তৈরিতে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, বুলেটের চেয়ে ব্যালট শক্তিশালী—এই সত্য তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে যখন সাধারণ মানুষ নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজের পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারবে। কোনো একটি জয় যেন কারো কান্নার কারণ না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা প্রতিটি রাজনৈতিক শক্তি ও প্রশাসনের পবিত্র দায়িত্ব। আমরা চাই একটি সংঘাতহীন, অংশগ্রহণমূলক এবং উৎসবমুখর নির্বাচন, যা আমাদের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে আরও বেগবান করবে।
এ মুহূর্তের সংবাদ
















































