ফারুক হোসেন »
মধ্যরাত। নিঝুম চারিদিক। আশপাশে ঝিঁঝিপোকা ডাকছে। কোথাও দূর থেকে ভেসে আসছে বাঁশির শব্দ। বাঁশির শব্দ থেকে ঝরে পড়ছে বিয়োগ, ব্যথা, দুঃখ। কী সেই দুঃখ, যে দুঃখে বাতাস ক্রমশই ভারি হয়ে আসছে?
তপুর ঘুম আসছিল না। সে খাটে শুয়ে শুয়ে বারবার তাকাচ্ছিল ঘড়িটার দিকে। টিক… টিক… টিক…। শব্দটা যেন আজ অন্যরকম লাগছে। যেন কেউ হাঁটছে। ধীরে ধীরে। কারও জন্য। তপু আস্তে করে ডাকল, দাদু… তুমি ঘুমাইছো? খাটের পাশে মাদুরে শোয়া দাদু নরম গলায় বললেন, না রে দাদু ভাই! ঘুম আসে নাই। তপু উঠে বসে বলল, দাদু এই ঘড়িটা রাতে কথা কয় নাকি? দাদু একটু হেসে বললেন, সব ঘড়ি কথা কয় না। কিছু কিছু ঘড়ি শুধু মানুষের মনে কথা কয়।
তপু অবাক হয়ে বলল, মনের কথা কেমনে কয় দাদু? দাদু দেয়ালঘড়িটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। দাদুর চোখে কেমন জল চিকচিক করছে। দাদু বললেন, এই ঘড়িটা তোর দিদার খুব আদরের ছিল রে! নিজ হাতে দম দিত। বলত, ঘড়ি বন্ধ হওয়া মানে ঘরের প্রাণ থেমে যাওয়া। তপু ধীরে ধীরে খাট থেকে নেমে এসে দাদুর গা ঘেঁষে বসল। বলল, দিদা তো অনেক আগেই আকাশে চলে গেছেন! তাই না? দাদু মাথা নাড়লেন। বললেন, হ্যাঁ রে। কিন্তু এই ঘড়ির মধ্যে তার হাতের ছোঁয়া রইয়া গেছে। কথাটি বলেই দাদু অন্য দিকে তাকালেন। বাইরে হাওয়া উঠল। জানালার কাঠ কেঁপে উঠল। তপু ফিসফিস করে বলল, দাদু আজ ঘড়িটা কেমন জানি শব্দ করছে। মনে হচ্ছে ঘড়িটি কান্না করছে। দাদু এবার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বললেন, আজ তোর বাবার মৃত্যু দিবস রে তপু! আজ তোর বাবার মৃত্যু দিবস! তপু হঠাৎ থমকে গেল। তার ছোট্ট বুকটা কেঁপে উঠল। সে বাবাকে ঠিকমতো মনে করতে পারছে না। শুধু মনে আছে, বাবা খুব সাধারণ মানুষ ছিলেন। হাসিখুশি প্রাণবন্ত। তারপর মাও চলে গেলেন দূরের শহরে চাকরিতে। তপু তখন থেকেই দাদুর কাছেই বড় হচ্ছে।
তপু আস্তে স্বরে বলল, দাদু বাবা কি এই ঘড়ির শব্দ শুনত? দাদু মৃদু গলায় বললেন, খুব শুনত। ছোটবেলায় তোর বাবাও রাতে এই ঘড়ির দিকে তাকিয়ে থাকত। ঠিক তোর মতো। বলত, আব্বা এই ঘড়ি কি আমাদের দেখে? আমাদের কথা শোনে? তপুর হঠাৎ চোখ ভিজে উঠল। তপু বলল, বাবা এখন কোথায়? দাদু শান্ত গলায় বললেন, আল্লাহর কাছে! খুব শান্ত জায়গায় হয়তো ঘুমিয়ে আছে। হঠাৎ ঘড়িটার টিকটিক শব্দ থেমে গেল। ঘরটা একদম চুপ। তপু ভয় পেয়ে দাদুর হাত চেপে ধরল। দাদু… ঘড়ি থাইমা গেছে! দাদু ধীরে ধীরে উঠে বসলেন। দেয়ালের কাছে গিয়ে ঘড়িটা নামালেন। তারপর একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন। দাদুর কাঁধটা যেন একটু নুয়ে পড়ল। তপু দৌড়ে গিয়ে বলল, দাদু দম দাও! দিদা যেমন দিত। দাদু কাঁপা হাতে ঘড়ির চাবি ঘোরাতে গেলেন। কিন্তু হঠাৎ দাদুর হাতটা থেমে গেল মাঝপথে। তিনি ধীরে মাটিতে বসে পড়লেন। তপু ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, দাদু! কী হইছে তোমার? কথা কও দাদু! দাদু কষ্টে শ্বাস নিলেন। তপুর দিকে তাকালেন। দাদুর চোখে মুখে অব্যক্ত হাজারও কথা! যেন জীবনের অনেক ক্লান্তি দাদুকে পেয়ে বসেছে। দাদু বললেন, তপু ভয় পাইস না! মনে সাহস রাখিস! ঘড়ির কাটা থেমে গেলে ..আবার চলে ! কিন্তু মানুষ থেমে গেলে আর চলে না রে দাদু ভাই! মানুষ থেমে গেলে আর চলে না!
তপু খেয়াল করল দাদুর কথা যেন কোথাও আটকে গেল। তারপর দাদুর হাত থেকে ঘড়িটা আলতো করে গড়িয়ে তপুর কোলে এসে পড়ল। তপু কান্না করতে করতে দাদুকে ঝাঁকাতে লাগল এবং বলতে লাগল, দাদু ওঠো! দাদু ওঠো! তুমি এভাবে চলে যেতে পার না! আমার যে আর কেউ রইল না! তুমি চোখ খোলা রাখ দাদু! কিন্তু দাদুও চিরনিন্দ্রায় তলিয়ে গেলেন! তপু অবাক হয়ে স্থির দাঁড়িয়ে রইল! আজ বাহিরটা অন্ধকার। দূরে বাঁশির শব্দ ভেসে আসছে। ঝিঁঝিপোকা ডাকছে। রাত আরও গভীর হচ্ছে। তপুর ছোট্ট দুই হাতের ভেতর থেমে থাকা দেয়ালঘড়িটা স্থির হয়ে আছে। তপু দেয়ালঘড়ির দিকে তাকিয়ে আছে। তপুর চোখ থেকে টপটপ জল গড়িয়ে পড়ছে। তপু বুঝতে পারছে সব ঘড়ির শব্দ শুধু সময়ের কথা কয় না! কিছু ঘড়ির শব্দ মানুষের চলে যাওয়ার স্মৃতিও স্বরণ করিয়ে দেয়! মানুষ চলার পথে সেই শব্দ কেউ শুনতে পায়- কেউ হয়তো শুনতে পায় না!





















































