সাম্প্রতিক সময়ে বিবিসি বাংলার একটি প্রতিবেদন দেশের জ্বালানি খাতের এক চরম অব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনাহীনতার চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং তেল পরিবহনের ব্যয় ও সময় সাশ্রয় করতে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত তেল পাইপলাইন ও মজুত অবকাঠামো দীর্ঘ সময় ধরে অলস পড়ে আছে।
তৎকালীন সরকারের মূল লক্ষ্য ছিল বিদেশ থেকে আমদানিকৃত অপরিশোধিত এবং পরিশোধিত জ্বালানি তেল গভীর সমুদ্র থেকে সরাসরি রিফাইনারি বা ডিপোতে পৌঁছে দেওয়া। এর জন্য নির্মিত হয়েছে ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং’ -এর মতো অবকাঠামো। এছাড়া চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণের প্রকল্পটিও ছিল যুগান্তকারী। লক্ষ্য ছিল দুটি, সময় সাশ্রয়; লাইটার জাহাজের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কয়েক দিনের কাজ কয়েক ঘণ্টায় নামিয়ে আনা। খরচ হ্রাস; পরিবহনের সময় চুরি এবং জাহাজ ভাড়ার পেছনে ব্যয় হওয়া কোটি কোটি টাকা সাশ্রয় করা।
কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, অবকাঠামো প্রস্তুত থাকলেও তার সুফল পাচ্ছে না সাধারণ মানুষ। হাজার কোটি টাকার পাইপলাইন মাটির নিচে পড়ে আছে, আর তেল পরিবহন হচ্ছে সেই পুরনো এবং ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতিতেই।
বাংলাদেশে বর্তমানে ডলার সংকটের কারণে জ্বালানি আমদানি সংকুচিত। এমন সময়ে যখন প্রতিটি পয়সা সাশ্রয় করা জরুরি, তখন এই বিশাল বিনিয়োগের ‘রিটার্ন’ না আসা দুঃখজনক। এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে বিদেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে, যার সুদ গুণতে হচ্ছে রাষ্ট্রকে। প্রকল্পগুলো সচল না থাকায় একদিকে যেমন বিনিয়োগকৃত অর্থের বিপরীতে কোনো আয় হচ্ছে না, অন্যদিকে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং ঋণের কিস্তি জাতীয় অর্থনীতিতে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই অচলাবস্থার পেছনে মূলত তিনটি কারণ স্পষ্ট, পাইপলাইন নির্মাণের সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অবকাঠামো বা আইনি জটিলতা নিরসনে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের চরম অভাব;
কারিগরি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা; প্রকল্পের কাজ শেষ হলেও অনেক ক্ষেত্রে ছোটখাটো কারিগরি ত্রুটি বা প্রশাসনিক অনুমোদনের অপেক্ষায় তা ঝুলে থাকে। তেল পরিবহনের পুরনো পদ্ধতিতে একটি বিশাল শক্তিশালী সিন্ডিকেট জড়িত। পাইপলাইন সচল হলে জাহাজ মালিক ও পরিবহন সংশ্লিষ্ট অনেকের অবৈধ আয়ের পথ বন্ধ হবে। প্রশ্ন জাগে, এই অপচয় কি তবে কোনো বিশেষ মহলের স্বার্থ রক্ষার্থেই বজায় রাখা হচ্ছে?
জ্বালানি খাত যেকোনো দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশে হাজার কোটি টাকার অবকাঠামো ফেলে রাখা এক ধরনের অপরাধের শামিল। এই অচলাবস্থা নিরসনে সরকারকে অবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে। কেন প্রকল্পগুলো চালু হচ্ছে না, তার সুনির্দিষ্ট কারণ এবং এর পেছনে দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
আমাদের মনে রাখতে হবে, অপচয়কৃত প্রতিটি টাকা জনগণের ট্যাক্সের টাকা। যদি দ্রুততম সময়ে এই পাইপলাইন ও মজুত সুবিধাগুলো কার্যকর করা না যায়, তবে এই বিশাল বিনিয়োগ অচিরেই জাতীয় সম্পদে পরিণত না হয়ে জাতীয় ‘বোঝায়’ পরিণত হবে। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে এই অলস ফেলে রাখা অবকাঠামোকে কাজে লাগানোর কোনো বিকল্প নেই।
মতামত সম্পাদকীয়




















































