কক্সবাজারের টেকনাফ উপকূলীয় সীমান্ত ও সাগরপথ বর্তমানে চোরাচালানের এক নিরাপদ ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি কোস্ট গার্ডের অভিযানে সেন্টমার্টিন দ্বীপ সংলগ্ন সাগরে মিয়ানমারে পাচারকালে বিপুল পরিমাণ সিমেন্টসহ ২০ জন পাচারকারীকে আটকের ঘটনাটি এই সংকটের গভীরতাকে আবারও সামনে এনেছে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নজরদারি সত্ত্বেও কেন এই অবৈধ কারবার থামানো যাচ্ছে না, তা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তথ্যমতে, টেকনাফের দুর্গম সাগরপথ ব্যবহার করে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী, জ্বালানি তেল এবং নির্মাণসামগ্রী মিয়ানমারে যাচ্ছে বিনিময়ে মরণঘাতী মাদক ইয়াবা ও আইসের বিশাল চালান দেশে ঢুকছে এবং বাইরে যাচ্ছে। প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের কথা বলা হলেও বাস্তবে চোরাচালানীদের তৎপরতা বিন্দুমাত্র কমেনি। উল্টো কৌশল বদলে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
এই পরিস্থিতির পেছনে প্রধানত তিনটি অন্তরায় কাজ করছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ- আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে মাঠপর্যায়ের সদস্যরা বারবার গ্রেপ্তার হলেও আইনি দুর্বলতার সুযোগে তারা সহজেই জামিনে বেরিয়ে আসছে। কারাগার থেকে বের হওয়ার পর বিকল্প কর্মসংস্থান বা যথাযথ নজরদারি না থাকায় তারা পুনরায় একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। চোরাচালান সিন্ডিকেটের মূল হোতা বা ‘গডফাদার’রা সবসময় আড়ালে থেকে যায়। মাঠপর্যায়ে কিছু শ্রমিক বা বহনকারী আটক হলেও নেপথ্যের কুশীলবরা ধরা পড়ে না। ফলে মূল আর্থিক যোগান ও পরিকল্পনা অব্যাহত থাকে, যা চোরাচালান বন্ধে প্রধান বাধা হিসেবে কাজ করছে।
টেকনাফের দীর্ঘ উপকূলীয় রেখা এবং দুর্গম পাহাড়ি পরিবেশ অপরাধীদের পালিয়ে থাকার সুযোগ করে দেয়। আধুনিক প্রযুক্তির অভাব এবং অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় এসব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হওয়ায় অভিযানগুলো মাঝেমধ্যেই ফলপ্রসূ হয় না।
সেন্টমার্টিনের সাম্প্রতিক অভিযান প্রমাণ করে যে, পাচারকারীরা এখন বড় বড় নৌযানে করে প্রকাশ্যেই অবৈধ বাণিজ্য চালাচ্ছে। এভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ পাচার হতে থাকলে তা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য যেমন হুমকিস্বরূপ, তেমনি দেশের অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব সুদূরপ্রসারী।
কেবল মাঠপর্যায়ের বাহকদের আটক করে এই ব্যাধি নিরাময় সম্ভব নয়। চোরাচালান নির্মূলে প্রথমত, স্থানীয় সেই গডফাদারদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে যাদের ইশারায় এই বিশাল কর্মযজ্ঞ চলে। দ্বিতীয়ত, সীমান্ত এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে। একইসাথে আইনের ফাঁকফোকর বন্ধ করে পাচারকারীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। টেকনাফ উপকূলকে চোরাচালানমুক্ত করতে হলে প্রশাসনের আপসহীন অবস্থান ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সততার কোনো বিকল্প নেই।




















































