জাদুর পেনসিল

ফারহানা খানম »

রাফিনের সবচেয়ে ভালো লাগে আঁকতে। স্কুলে যে সময় সবাই ছুটির ঘণ্টা শুনে দৌড় দেয়, রাফিন তখনও খাতা খুলে রংপেন্সিল ঘষে। ওর খাতা ভর্তি রংমাখা স্বপ্ন। নদী, ঘোড়া, নৌকা, কুকুর, অজগর, এমনকি নিজেই একটা উড়ন্ত ট্রেন এঁকেছে একদিন! কিন্তু সমস্যা একটাই, ওর আঁকা কেউ বোঝে না। স্কুলে শিক্ষক বলেন, তুমি তো ছাগল একে বলে হরিণ বানাও রাফিন! এটা পাখি না প্যাঁচা?
রাফিন মন খারাপ করে বলে, ও তো ঘুমন্ত ঈগল ছিল!
একদিন বিকেলে, ওর নানা বাড়ি থেকে ফেরা হলদে রঙের ট্রাঙ্ক খুঁজতে গিয়ে মায়ের পুরোনো টিফিনবক্সের ভেতরে ও পেয়ে গেল একটা চকচকে পেন্সিল। কালো শরীর, রুপালি লেখা, ‘আঁকো আর দেখো’। রাফিন ভাবল পুরোনো খেলনার মতোই কিছু হবে। কিন্তু ওই রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে একটা কুকুরের ছবি এঁকে ফেলল খাতার এক কোণে। আচমকা খাতা ঝাঁকুনি খেয়ে উঠল। হঠাৎ সেই কুকুরটার চোখ খুলে গেল! এরপর ধীরে ধীরে কাগজের মধ্যে থেকে কুকুরটা উঠে এসে বিছানার নিচে ঘাপটি মেরে বসে পড়ল!
রাফিন ভয়ে চিৎকার করত যাচ্ছিল, কিন্তু কুকুরটা জিভ বের করে আদুরে ভঙ্গিতে ওর দিকে তাকাল। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে রাফিন আবিষ্কার করল, এ তো সত্যিকারের কুকুর! শুধু পেন্সিল দিয়ে আঁকলেই বাস্তব হয়ে যায়!
পরদিন ভোরে রাফিন একটা নতুন প্ল্যান করল। সে একে ফেলল একটা ফুটবল, একটা গাছের নিচে বসে থাকা পাখির ঝাঁক, এমনকি একটা ঘোড়ার গাড়িও! সব কিছুর জীবন্ত হয়ে ওঠা দেখে প্রথমে ভয় পেলেও, একসময় ব্যাপারটা তার খেলনা বানানোর মতো মজা লাগতে লাগল। কিন্তু রাফিন তখনও জানত না, ম্যাজিক সবসময় আনন্দ দেয় না।
একদিন ক্লাসে এক বুললি ছেলেকে ভয় দেখানোর জন্য আঁকতে চাইল এক বিশাল ডাইনোসর। ডাইনোসর উঠে এল, ঠিকই। কিন্তু সেটি ছেলের দিকে না গিয়ে, ধুম করে জানালা ভেঙে স্কুলের বাইরে বেরিয়ে গেল। চিৎকার, ধাওয়া, আতঙ্কে স্কুলে হুলস্থুল! সেই রাতে রাফিন ঠিক করল, এমন খেলা আর চলবে না। পেন্সিলটা বন্ধ করে রাখবে। তবু কিছু একটা তাকে না না করে না।
পরদিন সকালে ও হেঁটে স্কুলে যাচ্ছিল, হঠাৎ দেখে একটা ছোট্ট মেয়ে রাস্তার ধারে বসে কাঁদছে। পাশে ছেঁড়া ব্যাগ, জীর্ণ জামা। মুখ মলিন।
রাফিন বলল, কাঁদছ কেন?
মেয়েটি বলল, আমার বই ছিল না। পরীক্ষায় বসতে দিল না স্যার।
রাফিন ব্যাগ থেকে পেন্সিলটা বের করল। বলল, চুপ করে থাকো তো! আমি একটা জাদু দেখাই।
ও খাতায় এঁকে ফেলল একটা নতুন ব্যাগ, নতুন বই, চকচকে জামা। এবং হ্যাঁ, একটা হাসিমুখ।
পেন্সিল আবার নিজের কাজ করল। মেয়েটার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। হাতে নিজের ছবি ধরে ও হেসে উঠল। সে দিন রাফিন বুঝল, ম্যাজিক আসলে ভয় পাওয়ার জিনিস না। ভুলে ব্যবহার করলে ক্ষতি, কিন্তু যদি দুঃখ দূর করতে কাজে লাগে তাহলে সেটাই সবচেয়ে বড় ক্ষমতা।
সেই থেকে রাফিন এখন শুধুই চুপচাপ ছবি আঁকে। কখনো কোনো অভুক্ত পাখির খাবার, কখনো কোনো বাচ্চার খেলনা, কখনো কারো ফেলে আসা হাসি। কেউ জানে না, পেছনে রয়ে গেছে এক রহস্যময় পেন্সিল। শুধু রাফিন জানে, সেই পেন্সিল দিয়ে আঁকা ভালোবাসা কোনোদিন মুছে যায় না।