জঙ্গল সলিমপুর হোক অপরাধমুক্ত, চাই স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড সংলগ্ন জঙ্গল সলিমপুর এখন আর কেবল একটি ভৌগোলিক এলাকা নয়, বরং এটি বছরের পর বছর ধরে ‘মগের মুল্লুকে’ পরিণত হয়েছে। পাহাড় কেটে ধ্বংস করা, অবৈধ বসতি স্থাপন এবং নিজস্ব সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে একটি ‘বিচ্ছিন্ন রাজ্য’ গড়ে তোলার যে দুঃসাহস এক শ্রেণির ভূমিদস্যু দেখিয়েছে, তা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্য চরম অবমাননাকর। সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জোরালো অভিযান এবং অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, আমরা তাকে স্বাগত জানাই। তবে এবারের অভিযান যেন কেবল লোকদেখানো বা সাময়িক না হয়—সেদিকেই আমাদের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘ সময় ধরে অপরাধীদের অভয়ারণ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কয়েক দশক ধরে এখানে সরকারি পাহাড় দখল করে সাধারণ মানুষের কাছে প্লট বিক্রির এক রমরমা বাণিজ্য চলেছে। শুধু ভূমি দখলই নয়, মাদক কারবার, অস্ত্র ব্যবসা এবং এমনকি পলাতক অপরাধীদের লুকানোর নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছিল এই পাহাড়। এখানে সরকারি প্রশাসনের প্রবেশাধিকার এক সময় প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একটি স্বাধীন দেশের ভেতরে কীভাবে একটি গোষ্ঠী নিজস্ব আইন ও বাহিনী দিয়ে সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলে, তা রীতিমতো বিস্ময়কর এবং উদ্বেগের।
সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত অভিযান স্থানীয় বাসিন্দাদের মনে কিছুটা আশার সঞ্চার করেছে। বড় বড় স্থাপনা উচ্ছেদ এবং চিহ্নিত অপরাধীদের গ্রেফতারের খবর গণমাধ্যমে এসেছে। তবে পাহাড়ের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সিন্ডিকেটের শিকড় অনেক গভীরে। এদের রাজনৈতিক ছত্রছায়াও কম নয়। তাই প্রশাসনের প্রতি আমাদের দাবি, এই উচ্ছেদ অভিযান যেন কোনো চাপের মুখে থমকে না যায়। যারা সাধারণ মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে সরকারি জায়গা বিক্রি করেছে এবং যারা এই পাহাড়খেকোদের গডফাদার, তাদের প্রত্যেকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, অভিযান শেষ হওয়ার কিছুদিন পরেই দখলদাররা আবার স্বরূপে ফিরে আসে। তাই জঙ্গল সলিমপুরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কেবল অভিযান চালালে চলবে না, বরং সেখানে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও স্থায়ী নজরদারি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
জঙ্গল সলিমপুরকে চট্টগ্রামের ‘ফুসফুস’ হিসেবে ফিরিয়ে আনতে হলে কঠোর হওয়ার বিকল্প নেই। কোনো বিশেষ ব্যক্তির স্বার্থের চেয়ে জনস্বার্থ এবং পরিবেশ রক্ষা বড়। সরকারকে মনে রাখতে হবে, পাহাড় দখলদারদের ছাড় দেওয়া মানে প্রকৃতি ধ্বংসের পাশাপাশি অপরাধীদের উৎসাহিত করা। আমরা চাই, জঙ্গল সলিমপুর থেকে শেষ দখলদারটি বিতাড়িত না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলুক এবং সেখানে রাষ্ট্রের আইনি আধিপত্য শতভাগ প্রতিষ্ঠিত হোক। অপরাধীদের কঠোর শাস্তি ও এলাকাটিকে একটি সুশৃঙ্খল পর্যটন বা বনায়ন এলাকা হিসেবে গড়ে তোলাই হোক বর্তমান প্রশাসনের লক্ষ্য।