জঙ্গল সলিমপুর কি রাষ্ট্রের ভেতর আরেক রাষ্ট্র?

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এলাকাটি দীর্ঘকাল ধরেই এক গোলকধাঁধার নাম। সম্প্রতি সেখানে সন্ত্রাসীদের দমনে পরিচালিত অভিযানে হামলার মুখে পড়ে একজন র‍্যাব কর্মকর্তার প্রাণহানি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ। দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ডকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে অপরাধীরা সেখানে যেভাবে নিজেদের অভয়ারণ্য গড়ে তুলেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
জঙ্গল সলিমপুরের ভৌগোলিক অবস্থান একে অপরাধীদের জন্য একটি আদর্শ নিরাপদ আস্তানায় পরিণত করেছে। উঁচু-নিচু পাহাড়, গহীন জঙ্গল এবং যাতায়াতের নড়বড়ে ব্যবস্থার কারণে সাধারণ মানুষের সেখানে প্রবেশ প্রায় অসম্ভব। এই বিচ্ছিন্নতাকে কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণির ভূমিদস্যু, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী এবং পলাতক আসামিরা সেখানে গড়ে তুলেছে নিজস্ব এক জগত। অভিযোগ রয়েছে, পাহাড় কেটে অবৈধ বসতি স্থাপন থেকে শুরু করে মাদক ও অস্ত্রের কারবার—সবই নিয়ন্ত্রিত হয় এখান থেকে। এমনকি সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিও অনেক সময় বাধার মুখে পড়ে, যা সাম্প্রতিক অভিযানে নিহতের ঘটনাই প্রমাণ করে।
বছরের পর বছর ধরে সরকারের হাজার হাজার একর বনভূমি ও খাস জমি দখল করে সেখানে কলোনি স্থাপন করা হয়েছে। এই দখলদাররা নিজেদের শক্তিশালী বাহিনী তৈরি করেছে, যারা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রাখে। পাহাড়ের এই গহীন কোণে তাদের নিজস্ব বিচারব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রণ চলে বলে লোকমুখে প্রচলিত আছে। যখন কোনো এলাকা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং সেখানে অপরাধীরা শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তখন সেটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ‘মিনি রাষ্ট্র’ তৈরির শামিল। জঙ্গল সলিমপুর আজ ঠিক সেই পথেই হাঁটছে।
একজন চৌকস কর্মকর্তার মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, কেবল সাময়িক অভিযান চালিয়ে জঙ্গল সলিমপুরকে নিরাপদ করা সম্ভব নয়। পাহাড়ের প্রতিটি ইঞ্চি থেকে সন্ত্রাসীদের শেকড় উপড়ে ফেলতে হলে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা।
ড্রোন প্রযুক্তি এবং আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে পুরো এলাকার ম্যাপ তৈরি করতে হবে। সেখানে স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি বা প্রয়োজনে অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করতে হবে যাতে অপরাধীরা পুনরায় সংগঠিত হতে না পারে। এই এলাকায় অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ভূমিদস্যুদের মূল নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের রক্ত মাড়িয়ে কোনো অপরাধী চক্র টিকে থাকতে পারে না। জঙ্গল সলিমপুরকে সন্ত্রাসমুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। প্রশাসন যদি এখনই কঠোর হস্তে এই ‘সন্ত্রাসের স্বর্গরাজ্য’ গুড়িয়ে না দেয়, তবে ভবিষ্যতে চট্টগ্রাম অঞ্চলের নিরাপত্তা আরও বড় হুমকির মুখে পড়বে। আমরা চাই না আর কোনো মায়ের বুক খালি হোক কিংবা কোনো দুর্গম পাহাড় অপরাধীদের ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হোক। জঙ্গল সলিমপুরকে মূল ভূখণ্ডের আইনি কাঠামোর মধ্যে ফিরিয়ে আনাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।