জঙ্গল সলিমপুরের দেড় লাখ মানুষ জিম্মিদশা থেকে মুক্ত: ডিসি জাহিদ

নিজস্ব প্রতিবেদক»

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকাকে দীর্ঘদিন ধরে ‘রাষ্ট্রের ভিতর আরেক রাষ্ট্র’ হিসেবে ব্যবহার করে আসা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর অভয়ারণ্য ভেঙে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তিনি বলেছেন, যৌথ বাহিনীর অভিযানের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের জিম্মিদশা থেকে মুক্তি পেয়েছে এ এলাকার প্রায় দেড় লাখ মানুষ।

মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) অভিযান-পরবর্তী সময়ে জঙ্গল সলিমপুরে স্থাপিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।

জেলা প্রশাসক বলেন, দীর্ঘদিন ধরে একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী জঙ্গল সলিমপুরকে তাদের অবৈধ কর্মকাণ্ডের ঘাঁটিতে পরিণত করেছিল। সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে তারা পাহাড় কাটা, পরিবেশ ধ্বংস, অবৈধ দখল, চাঁদাবাজি এবং অস্ত্র তৈরি ও বেচাকেনাসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিল। এতে এলাকাটি কার্যত সন্ত্রাসের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছিল।

তিনি বলেন, “চট্টগ্রামের কোথাও সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য থাকতে দেওয়া হবে না। জঙ্গল সলিমপুরকে একটি আদর্শ, নিরাপদ ও উন্নত এলাকায় রূপান্তর করতে আমরা কাজ করছি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ণ রেখে স্থানীয় জনগণকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা প্রশাসনের মূল লক্ষ্য।”

র‌্যাব সদস্য নিহতের পর জোরালো হয় অভিযান
জেলা প্রশাসক জানান, ২০২১ ও ২০২২ সালে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জঙ্গল সলিমপুরে একাধিক অভিযান পরিচালনা করা হলেও নানা প্রতিকূলতার কারণে তা পুরোপুরি সফল হয়নি। তবে গত ১৯ জানুয়ারি সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে গেলে সন্ত্রাসীদের হামলায় র‌্যাবের ডিএডি মোতালেব সরকার নিহত হওয়ার ঘটনায় পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে। ওই ঘটনার পর সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনতে প্রশাসন নতুন করে কঠোর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়।

এর ধারাবাহিকতায় গত ৯ মার্চ র‌্যাব, পুলিশ, আনসার, বিজিবি, সেনাবাহিনী ও ম্যাজিস্ট্রেটসহ প্রায় চার হাজার সদস্যের সমন্বয়ে একটি বৃহৎ যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়। জেলা প্রশাসক বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত দক্ষতা ও পরিকল্পিত অভিযানের ফলে কোনো প্রাণহানি ছাড়াই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর অভয়ারণ্য ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছে এবং এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনঃনিয়ন্ত্রণে এসেছে।

এলাকায় র‌্যাব-পুলিশ ক্যাম্প, তবে ভোগান্তি আছে
অভিযানের পর এলাকায় একটি পুলিশ ও একটি র‌্যাব ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে, যা ৯ মার্চ থেকে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তবে বিদ্যুৎ ও পানির মতো মৌলিক সুবিধার অভাবে ক্যাম্পে দায়িত্ব পালনরত সদস্যদের কিছুটা ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে বলে জানান জেলা প্রশাসক।

তিনি বলেন, স্থানীয় প্রশাসন ও সিটি কর্পোরেশনের সহায়তায় আপাতত খাবার ও পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা হলেও এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধানে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এলাকায় স্থায়ী ক্যাম্প নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে মতবিনিময়, সদস্যদের জন্য মিষ্টি ও তরমুজ
পরিদর্শনকালে জেলা প্রশাসক বিভিন্ন ক্যাম্প ঘুরে দেখেন এবং দায়িত্বপালনরত সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। তাদের মনোবল বৃদ্ধির লক্ষ্যে তিনি প্রায় দুই শতাধিক পুলিশ সদস্যের জন্য মিষ্টি ও তরমুজ নিয়ে যান। একইসঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে তাদের বর্তমান অবস্থা, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং প্রয়োজনীয় সেবার ঘাটতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেন।

এ সময় তিনি স্থায়ী ক্যাম্প নির্মাণের জন্য প্রস্তাবিত স্থানসমূহও পরিদর্শন করেন।

সড়ক, পানি, স্যানিটেশন ও আশ্রয় সুবিধায় উদ্যোগ
জঙ্গল সলিমপুরের সার্বিক উন্নয়নে বেশ কয়েকটি তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, আলীনগর এলাকার সড়কের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। ইতোমধ্যে এলজিইডির মাধ্যমে দ্রুত উন্নয়ন কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে।

এছাড়া এলাকাবাসীর জন্য শিক্ষা, চিকিৎসা ও স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে দুটি ডিপ টিউবওয়েলের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আপাতত তাবুর ব্যবস্থা করা হলেও বর্ষা মৌসুম বিবেচনায় টিনের ঘর নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

ক্যাম্পে দায়িত্বরত র‌্যাব ও পুলিশসহ প্রায় ২০০ সদস্যের জন্য পর্যাপ্ত টয়লেট সুবিধা না থাকায় দ্রুত এ সমস্যার সমাধান করা হবে বলেও জানান তিনি।

দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রণহীন এলাকা
উল্লেখ্য, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ বসতি স্থাপন, পাহাড় কাটা এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ ও নিয়ন্ত্রণহীন এলাকায় পরিণত হয়। ২০২২ সালে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে বিপুল সংখ্যক অবৈধ স্থাপনা অপসারণ এবং পাহাড়ি জমি উদ্ধার করা হলেও পরবর্তীতে পুনরায় অবৈধ দখল ও সন্ত্রাসী তৎপরতা বেড়ে যায়।

বর্তমানে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে এবং প্রশাসনের উপস্থিতি আরও সুদৃঢ় হয়েছে বলে দাবি করেছে জেলা প্রশাসন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অবৈধ দখল প্রতিরোধ, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

পরিদর্শনকালে উপস্থিত ছিলেন র‌্যাব-৭ অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সৈয়দ মাহবুবুল হক, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) শেখ মোহাম্মদ সেলিম, এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবদুল মতিন এবং সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফখরুল ইসলামসহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।