ছোট্ট রাইসার ঈদের জামা

ফারুক হোসেন সজীব »

ছোট্ট রাইসা। সে বাবা মায়ের সাথে শহরে বাস করে। রাইসার বয়স খুব বেশি নয়। মাত্র সাত বছর। কিন্তু তার মনটা খুব-ই নরম আর দয়ালু। সে স্কুলে যায়। ছবি আঁকতে ভালোবাসে। গল্পের বই পড়তে ভালোবাসে। ঈদ প্রায় চলে এসেছে। শহরের রাস্তাগুলো উৎসবের আমেজে মেতে উঠেছে। দোকানের কাঁচের ভেতরে রঙিন জামা ঝুলছে। কোথাও লাল, নীল, ঝলমলে সোনালি কাজ করা। রোজ ইফতার শেষে সন্ধ্যা হলেই বাজারের দোকানগুলোতে আলো জ্বলে ওঠে। মানুষজন নতুন জামা কিনতে ভিড় করে।
একদিন বিকেলে রাইসা তার মা বাবার সাথে বাজারে গেল। সে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ চোখে জামাগুলো দেখছিল। তার চোখ যেন সব রঙ গিলে নিচ্ছে। মা হেসে বললেন, রাইসা কোন জামাটি তুমি নিবে সোনামণি? রাইসা একটু ভেবে নিল। তারপর একটি হালকা গোলাপি জামার দিকে আঙুল দেখাল। জামাটির গায়ে ছোট ছোট ফুল আঁকা, আর নিচে নরম ঝালর। এইটা নিব মা! এই জামাটি খুব সুন্দর! বাবা জামাটা হাতে নিয়ে দেখলেন। তারপর হেসে বললেন, ঠিক আছে রাইসা সোনামণি! এটাই হবে তোমার ঈদের জামা।
জামাটা হাতে পেয়ে রাইসার আনন্দ যেন আর ধরে না। সে বারবার জামাটা বুকে জড়িয়ে ধরছিল। বাড়ি ফেরার পথে হঠাৎ বাবা বললেন,
শোনো! এই ঈদে আমরা গ্রামে যাব।
রাইসা অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকাল। সত্যি বাবা? আমরা গ্রামে যাব?
হ্যাঁ মা। তোমার দাদুর বাড়িতে। সবাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।
রাইসা এত খুশি হলো যে, সে পুরো রাস্তা জুড়ে গল্প করতে লাগল। গ্রামে গেলে কী কী করবে সে। কার সাথে খেলা করবে। কী কী দেখবে?
ঈদের দুই দিন আগে তারা গ্রামে পৌঁছাল। গ্রামে ঢুকতেই রাইসার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। চারদিকে সবুজ মাঠ। গাছপালা। খোলা আকাশ। দূরে পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। গোয়ালে গরুগুলো হাম্বা হাম্বা করছে। কাঁচা রাস্তা ধরে ছেলেমেয়েরা দৌড়াচ্ছে।
রাইসা যখন দাদু বাড়িতে পৌছাল। সাথে সাথে গ্রামের ছোট্ট ছোট্ট মেয়েরা তার সাথে খেলা করতে এলো। ছোট্ট রাইসা দ্রুত তাদের সাথে বন্ধুত্ব করে ফেলল। তারপর তারা একসাথে লুকোচুরি খেলল। দৌড় প্রতিযোগিতা করল। গাছের নিচে বসে গল্প করল। কিন্তু খেলতে খেলতে রাইসা একটা জিনিস খেয়াল করল। কয়েকজন বাচ্চার জামা খুব পুরনো। কারও জামা ছেঁড়া। কারও জামা রঙ-ই যেন হারিয়ে গেছে। রাইসা একটু অবাক হয়ে তার খালামণিকে জিজ্ঞেস করল, ওরা নতুন জামা পরেনি কেন? খালামণি একটু চুপ করে থেকে বললেন, সবাই তো নতুন জামা কিনতে পারে না মা!
এই কথাটা শুনে রাইসার মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। সেদিন রাতে সে অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল। পরদিন সকালে সে বাবার কাছে গিয়ে বলল, বাবা আমরা কি কিছু বাচ্চার জন্য জামা কিনতে পারি? বাবা অবাক হয়ে ছোট্ট রাইসার দিকে তাকালেন। তারপর মৃদু হেসে বললেন, অবশ্যই পারি। সেই দিনই বাবা রাইসাকে নিয়ে বাজারে গেলেন। কয়েকটা ছোট ছোট জামা কিনলেন। লাল, নীল, হলুদ। বিকেলে রাইসা নিজে হাতে সেই জামাগুলো গ্রামের কয়েকজন বাচ্চাকে দিল। একটি ছোট্ট ছেলে জামাটা হাতে নিয়ে অবাক চোখে বলল,
এটা কি আমার জামা?
রাইসা হেসে বলল, হ্যাঁ এটা তোমার জামা। ছেলেটি আনন্দে লাফিয়ে উঠল। আরেকটি মেয়ে নতুন জামা পেয়ে এত খুশি হলো যে, সে বারবার আয়নায় নিজেকে দেখছিল। সেই বিকেলে অনেক বাচ্চার মুখে হাসি ফুটল। তারা নতুন জামা পরে দৌড়াতে লাগল। খেলতে লাগল। রাইসা তাদের দেখে খুব খুশি হলো। সন্ধ্যার একটু আগে রাইসা দেখল, একটু দূরে একটি ছোট্ট মেয়ে চুপচাপ বসে আছে।
তার পরনে জামাটা খুব পুরনো। রাইসা কাছে গিয়ে বলল, তুমি এখানে বসে আছ কেন? মেয়েটি মাথা নিচু করে বলল, আমার ঈদের নতুন জামা নেই। রাইসার বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। রাইসা বুঝতে পারল, তারা যত জামা কিনেছে সেগুলো সবাইকে দিয়েছে। অবশিষ্ট আর জামা নেই। রাইসা চোখ দুটি ভিজে উঠল। সে ধীরে ধীরে আকাশের দিকে তাকাল। তখন ঈদের চাঁদ উঠেছে। চারদিকে নরম আলো ছড়িয়ে পড়েছে। রাইসা মনে মনে ভাবল, কেন সবাই নতুন জামা পায় না? সেই রাতে সে মায়ের পাশে বসে খুব শান্ত গলায় বলল, মা আমি বড় হয়ে অনেক পড়াশোনা করব। মা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কেন মা?
রাইসা বলল, আমি বড় হয়ে একটা বড় চাকরি করব। তখন অনেক টাকা আয় করব। মা হেসে বললেন, তারপর? রাইসা বলল, তারপর প্রতি ঈদে গ্রামের সব বাচ্চাকে নতুন জামা কিনে দেব। যেন কেউ আর পুরনো জামা পরে বসে না থাকে। মায়ের চোখ ভিজে উঠল। তিনি রাইসাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। পরদিন ঈদের সকাল এল। গ্রামের সব বাচ্চা নতুন জামা পরে আনন্দে মেতে উঠল। কেউ মাঠে দৌড়াচ্ছে। কেউ মিষ্টি খাচ্ছে। কেউ বন্ধুদের সাথে খেলছে।
রাইসাও তার গোলাপি ঈদের জামা পরে বন্ধুদের সাথে খেলল। কিন্তু ছোট্ট রাইসার কেবলি সেই ছোট্ট মেয়েটির কথা মনে পড়ল! আহা! ছোট্ট মেয়েটি কেমন মন খারাপ করে বসে ছিল! মনে হচ্ছি মেয়েটির যেন এই পৃথিবীতে কেউ নেই! তারপর রাইসা এবং রাইসার বাবা অনেক খুঁজেছে মেয়েটিকে একটি নতুন জামা দেবার জন্য কিন্তু সেই ছোট্ট মেয়েটিকে আর তারা খুঁজে পায়নি। তারপর থেকে রাইসা শপথ করেছে। সে অনেক পড়াশোনা করবে। অনেক বড় হবে। অনেক বড় চাকরি করবে। তারপর একদিন ঈদ আসবে। সেদিন সে গ্রামের সমস্ত গরীবদের ঈদের নতুন জামা কিনে দেবে! ছোট্ট রাইসা চোখের সামনে যেন সেই খুশির ঈদকে দেখতে পাচ্ছে!