চট্টগ্রাম বন্দর অচল : আন্দোলনের সমন্বয়ক আটক

সুপ্রভাত ডেস্ক »

চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকনকে আটক করেছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)। সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) দিবাগত রাতে বন্দর এলাকা তাকে আটক করা হয়।

চট্টগ্রাম বন্দর জোনের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. আমিরুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

এদিকে, বন্দর অচলের সাম্প্রতিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই শ্রমিক নেতাকে আটকের ঘটনায় শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকনকে আটকের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে চট্টগ্রাম শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)। সোমবার দিবাগত রাতে গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা এ নিয়ে প্রতিবাদ জানান।

প্রতিবাদ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন– জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সভাপতি এ এম নাজিম উদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার; শ্রম সংস্কার কমিশনের সদস্য ও টিইউসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি তপন দত্ত; স্কপ চট্টগ্রাম জেলার সমন্বয়ক এস কে খোদা তোতন ও ইফতেখার কামাল খান; ট্রেড ইউনিয়ন সঙ্ঘের সভাপতি খোরশেদুল আলম; বিএফটিইউসির সভাপতি কাজী আনোয়ারুল হক হুনি; বিএলএফের সভাপতি নুরুল আবসার তৌহিদ; সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের নেতা হেলাল উদ্দিন কবির এবং বাংলাদেশ জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক জাহেদ উদ্দিন শাহিন।

নেতারা বিবৃতিতে বলেন, প্রশাসন শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ পরিহার করে বারবার শ্রমিকদের সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। গতকাল বন্দরের পাঁচজন শ্রমিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, আর আজ ইব্রাহিম খোকনকে আটক করে প্রশাসন পরিকল্পিতভাবে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার উসকানিতে লিপ্ত হয়েছে বলে তারা অভিযোগ করেন।

তারা আরও বলেন, গভীর রাতে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট কর্মসূচি প্রত্যাহারের পর বন্দরের কার্যক্রম যখন স্বাভাবিক ও স্থিতিশীলভাবে চলছিল, ঠিক তখনই এমন পদক্ষেপ রহস্যজনক ও নেতিবাচক। এর মাধ্যমে একটি মহল ইচ্ছাকৃতভাবে বন্দর পরিস্থিতি অশান্ত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত– এমন আশঙ্কার কথাও তুলে ধরেন তারা।

স্কপ নেতারা অবিলম্বে ইব্রাহিম খোকনসহ গ্রেপ্তার সব শ্রমিক নেতাকর্মীর নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানান। একইসঙ্গে আন্দোলনরত বন্দর শ্রমিকদের বিরুদ্ধে জারি করা হয়রানিমূলক সাময়িক বরখাস্ত ও দমনমূলক আদেশ প্রত্যাহারের জোর দাবি জানান।

নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, দমনপীড়ন, গ্রেপ্তার ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলন দমন করা যাবে না। বন্দর ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার সংগ্রামে শ্রমিকরা অতীতেও আপস করেনি, ভবিষ্যতেও করবে না। প্রশাসন যদি উসকানিমূলক আচরণ থেকে সরে না আসে, তবে এর দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই বহন করতে হবে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। এই বন্দরের শ্রমিকদের কণ্ঠরোধ করে কোনো টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। তাই দমননীতি পরিত্যাগ করে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানে এগিয়ে আসার জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল (এনসিটি) ডিপি ওয়ার্ল্ডকে লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়ার প্রতিবাদে গত ৩১ জানুয়ারি থেকে কর্মবিরতি পালন করে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া অনির্দিষ্টকালের লাগাতার কর্মসূচির ফলে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যসহ বন্দরের প্রায় সব ধরনের অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

পরিস্থিতি সামাল দিতে বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) চট্টগ্রামে যান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি দফায় দফায় সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে বিকেলে শ্রমিকরা দুদিনের জন্য আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা দেন।

তবে ওইদিন আবার বন্দর কর্তৃপক্ষ আন্দোলনরত ১৫ শ্রমিক নেতার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) আবেদন করে। পাশাপাশি তারা যাতে দেশত্যাগ করতে না পারেন, সেজন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও সংস্থাগুলোকে অবহিত করার অনুরোধ করা হয়।

এর প্রতিবাদে শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলন করে চার দফা দাবিতে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ও বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের নেতা মো. হুমায়ুন কবীর ফের রোববার থেকে অনির্দিষ্টকালের এ ধর্মঘট পালনের ঘোষণা দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে রোববার সকাল থেকে বন্দরের বিভিন্ন জেটি, টার্মিনাল, কনটেইনার ডিপো, বহির্নোঙরসহ বন্দরের সব স্থানে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। তবে রোববার দিবাগত রাতে বন্দরের চলমান ধর্মঘট স্থগিতের ঘোষণা করা হয়। চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের নেতা মো. হুমায়ূন কবীর ও মো. ইব্রাহীম খোকনের সই করা বিজ্ঞপ্তিতে এ ঘোষণা দেওয়া হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দরে এনসিটি নিয়ে উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন এবং বিডার চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর সাংবাদিকদের দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী বর্তমান সরকারের আমলে এনসিটি চুক্তি না করার সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সন্তোষজনক আলোচনার প্রেক্ষাপটে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রমজানের পণ্য রিলিজের স্বার্থে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ধর্মঘট কর্মসূচি ৯ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থগিত ঘোষণা করা হয়।