চট্টগ্রামের অবৈধ ইটভাটা ও বিপন্ন পরিবেশ

পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যাচ্ছে, চট্টগ্রামের ১৫টি উপজেলায় বর্তমানে ৪২৫টি ইটভাটা রয়েছে, যার মধ্যে মাত্র ৭৬টি বৈধ। অর্থাৎ, প্রায় ৮২ শতাংশ ইটভাটায় কোনো ধরনের পরিবেশগত বা অবস্থানগত ছাড়পত্র নেই। উচ্চ আদালতের কঠোর নির্দেশনা থাকার পরও জনবল সংকট আর তদারকির অভাবকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে যেভাবে অবৈধ কার্যক্রম চলছে, তা কেবল উদ্বেগজনক নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের প্রতি এক চরম অবজ্ঞা।
পরিবেশ আইন অনুযায়ী, জনবসতি, কৃষিজমি এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চলের নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে ইটভাটা স্থাপন নিষিদ্ধ। কিন্তু চট্টগ্রামের চিত্র তার উল্টো। আইনের তোয়াক্কা না করে পাহাড়ের পাদদেশ বা ফসলি জমির বুকেই দাপটের সাথে জ্বলছে আগুনের কুন্ডলী। গত ছয় মাসে মাত্র ২৪টি অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদ এবং ৬৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা আদায়ের বিষয়টি দৃশ্যত বড় পদক্ষেপ মনে হলেও, মোট অবৈধ ভাটার সংখ্যার তুলনায় তা নগণ্য। এই ধীরগতির অভিযান এবং নামমাত্র জরিমানা অসাধু ব্যবসায়ীদের দমনে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
অবৈধ এসব ইটভাটার সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে কৃষিখাতে। ইট তৈরির প্রধান কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে আবাদি জমির ‘টপ সয়েল’ বা উপরিভাগের উর্বর মাটি। মাটির এই উপরিভাগের স্তরটি দীর্ঘ বছরের জৈব প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়, যা একবার নষ্ট হলে পুনরায় আগের অবস্থায় ফিরে আসতে কয়েক দশক সময় লাগে। কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি ব্যবহার করার অর্থ হলো দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলা। এছাড়াও, ইটভাটার বিষাক্ত ধোঁয়ায় আশপাশের ফলদ ও বনজ বৃক্ষ নিস্তেজ হয়ে পড়ছে এবং জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। পাহাড় সংলগ্ন এলাকায় পাহাড়ি মাটি কেটে ইটে রূপান্তর করার ফলে ভূমিধসের ঝুঁকিও বাড়ছে বহুগুণ।
পরিবেশ অধিদপ্তর প্রায়শই বাজেট স্বল্পতা এবং জনবল সংকটের কথা বলে তাদের দায় এড়াতে চায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি নির্দিষ্ট জেলায় যখন ৩৪৯টি ইটভাটা অবৈধভাবে বছরের পর বছর চলে, তখন প্রশাসনের নজরদারি কোথায় থাকে? শুধুমাত্র সাময়িক অভিযান বা জরিমানা করে এটা রোখা সম্ভব নয়। অবৈধ ইটভাটাগুলো ধ্বংস করার পর সেগুলো যাতে পুনরায় চালু হতে না পারে, তার জন্য কঠোর মনিটরিং প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অভিযানের কয়েকদিন পরই রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে মালিকরা আবার কাজ শুরু করেন।
এই সংকট থেকে উত্তরণে কেবল পরিবেশ অধিদপ্তরের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং ভূমি অফিসকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। উচ্চ আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নে কোনো রকম ছাড় দেওয়া যাবে না। অবৈধ ঘোষিত প্রতিটি ভাটার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংযোগ স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন করতে হবে। পোড়া ইটের বদলে পরিবেশবান্ধব ‘ব্লক ইট’ বা হলো ব্লকের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। সরকারি নির্মাণ প্রকল্পে ব্লক ইটের শতভাগ ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে কৃষিজমির মাটি কাটার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
চট্টগ্রামের জীববৈচিত্র্য ও উর্বর মাটিকে বাঁচাতে হলে এই ‘মরণফাঁদ’ ইটভাটাগুলোর লাগাম এখনই টেনে ধরতে হবে। আমরা চাই না উন্নয়নের নামে প্রকৃতি ধ্বংস হোক। মনে রাখতে হবে, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে কোনো অবকাঠামোগত উন্নয়নই টেকসই হবে না। পরিবেশ রক্ষা এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই।