আব্দুস সাত্তার সুমন »
নগরকান্দা গ্রামের পুবদিকে এক সারি তালগাছ। তার নিচেই খোকাদের ছোট্ট কাঁচা ঘর। খোকার বাবা দিনমজুর, মা গৃহিণী। সংসারটা বড় বিলাসী নয়, কিন্তু ভালোবাসার অভাব নেই। খোকা স্কুলে পড়ে চতুর্থ শ্রেণিতে। পড়াশোনার পাশাপাশি সে খুব দুষ্টুমি করতেও ভালোবাসে, তবুও মায়ের চোখে সে সবার সেরা ছেলে।
একদিন সকালবেলা খোকা ঘুম থেকে উঠে দেখে মা পুকুরঘাটে কাপড় কাচছেন। পুকুরের জলে রোদের ঝিলিক পড়ছে। খোকা কাছে গিয়ে বলল,
মা, আমি আজ স্কুলে যাব কিন্তু ফিরে এসে তোমাকে সাহায্য করব। তোমার কাজ অনেক দেখি!
মা মুচকি হেসে বললেন,
তুই ভালো ছেলে খোকা। তবে মনে রাখবি ভালো ছেলে মানে শুধু কাজ করা নাু ভালো কাজ করাও ভালো ছেলেদের কাজ।
খোকা কিছুক্ষণ পরে স্কুলের ব্যাগ কাঁধে তুলে বেরিয়ে গেল।
গ্রামের রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে খোকা দেখল, এক বৃদ্ধ লোক হাঁটছেন, হাতে এক থলে। হঠাৎ বাতাসে ওড়ে একটা কাগজের মতো কিছু দেখে খোকা চমকে গেল, ওটা একশো টাকার নোট! বৃদ্ধের থলের ফাঁক দিয়ে পড়ে গেছে।
খোকার চোখ চকচক করে উঠল। ওর মনে দুষ্টু ভাব এলু
এই টাকাটা পেলে আমি নতুন খাতা কিনব, একটা পেন্সিল বক্সও আনব।
তারপরই বুকের ভেতর একটা নরম কণ্ঠস্বর যেন তাকে বলল,
এটা কি ঠিক কাজ হবে, খোকা?
খোকা থেমে গেল। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল নিঃশব্দে। তারপর দৌড়ে গিয়ে বৃদ্ধের হাত ধরে বলল,
দাদু! আপনার টাকা পড়ে গিয়েছিল, দেখুন!
বৃদ্ধ অবাক হয়ে তাকালেন। মুখে বিস্ময়ু
বাবা, তুমি তো আমার বাঁচার ভরসা হলে! এই টাকায় আমি ওষুধ কিনব।
খোকা মাথা নিচু করে বলল,
এটা আমার না দাদু, এটা আপনার। আমার মা শেখায় অন্যের জিনিস নিলে সেটা আগুনের মতো পোড়ায়।
বৃদ্ধ হাত রেখে বললেন,
তোমার মা ধন্য! তুমি তার চেয়েও ধন্য।
সেদিন স্কুলে খোকা চুপচাপ ছিল। ক্লাসে শিক্ষক প্রশ্ন করলেন,
সন্তানরা বলো, সৎ মানুষ কারা?
সবাই কেউ না কেউ উত্তর দিল। কিন্তু খোকা চুপ।
শিক্ষক হাসলেন, খোকা, তুই কিছু বলবি না?
খোকা একটু ভেবে বলল,
স্যার, সৎ মানুষ সেই, যে এমন কাজ করে যাতে তার মা হাসে, আর অন্য কেউ কাঁদে না।
শিক্ষক থমকে গেলেন। তারপর বললেন,
এক কথায় সৎ জীবনের উত্তর বলে ফেললি খোকা।
ক্লাসে সবাই হাততালি দিল। খোকার মুখ লজ্জায় লাল, কিন্তু তার বুক ভরে গেল এক শান্ত আনন্দে।
বিকেলে বাড়ি ফিরে খোকা দেখল মা ভাত পরিবেশন করছেন।
মা বললেন,
বাবা, আজ স্কুলে কী শিখলি?
খোকা মাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
মা, আজ আমি শিখেছি, সৎ থাকা মানে কষ্ট হলেও নিজের মনকে পরিষ্কার রাখা।
মা চুপচাপ ছেলের মাথায় হাত রাখলেন।
বাবা, এটাই তো আসল শিক্ষা। যেদিন মানুষ এই শিক্ষা ভুলে যায়, সেদিন সে বইয়ে যত পড়ুক, তার মন অন্ধকারেই রয়ে যায়।
খোকা মায়ের বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে বলল,
মা, আমি প্রতিদিন মানুষ হবু তুমি যেমন চাও।
বাইরে তখন চাঁদ উঠেছে, আলোর রেখা এসে পড়েছে খোকাদের মাটির ঘরে। মা আর ছেলে দু’জনেই জানত সেই আলোর মতোই খোকার মনে জ্বলে উঠেছে সত্য ও সততার আলো।
নৈতিক শিক্ষা:
সততা হারিয়ে ফেললে মানুষ নিজের হৃদয়ের শান্তি হারায়।
মায়ের শিক্ষা পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র শিক্ষা।
ছোট কাজও যদি সৎভাবে করা যায়, সেটাই বড় কাজের সমান মূল্য রাখে।





















































