সমীকরণ
প্রণব মজুমদার
সবাই চলে যায়; যেতেই হয়
শুধু আসা যাওয়া হাসি আর কান্না
আগমনে কতো কোলাহল
অথচ প্রস্থানে শুধু হাহাকার!
জীবন দৈর্ঘ্যরে মাঝখানে
যুদ্ধ জয়-পরাজয়, লোভ-হিংসা
মিথ্যা ভালোবাসার মহড়া
সম্পর্ক তৈরি হয় স্বার্থে যেখানে
আজ আমি বন্ধু, কাল তোমার শত্রু!
জীবাত্মার চেয়ে ধর বেশ দামি!
রোগে ভুগে ভুগে নিঃসঙ্গ নির্ভেজাল
যে প্রিয় মানুষটি চলে গেল আজ
আত্মাহীন দেহ দেখে স্বজনের
অভিনয়, সম্পদ লোভে মায়াকান্না;
অথচ জীবন্ত নারী রোগ শয্যায়ও অবহেলিত
অন্তিম যাত্রায়ও পায় না পুত্রমুখ দর্শন
স্ত্রৈণ ছেলে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদে ভিডিও কলে
সৎকারের অপেক্ষায় মানুষটি শুয়ে
থাকে হিমঘরে, ডিপ ফ্রিজের মৃত মাছ মাংসের মতো
এমন স্বজনহীন একা জীবন চায়নি জননী
লোভীরা ভালোবাসে শুধু বৈভব
মায়া ও ভালোবাসা তুচ্ছ
হিসাব মিলে না, মিলে না
জাগতিক ভালোবাসার সমীকরণ।
হিম পবনের রাত
বশির আহমেদ
তোমার মন একটি প্রত্নতত্ত্ব,
মাটির মতো খুঁড়ে খুঁড়ে আবিষ্কার করি চিন্তার কোলাজ!
তোমার চোখে একদিন রোদ ফুল দেখেছিলাম,
ঠোঁটের কারুকাজে মদিরার মানচিত্র।
তোমার হাত তোমার পা, তোমার মসৃণ
শরীরের মোহনীয় ঘ্রাণে আমি বাতিক হয়েছিলাম।
মেডুসার গল্পের মতো জটিল ভেতরের রহস্য, তুমি রহস্যময়ী।
তোমার টলটলে কথন রুম্মান রসের মতো,
আমি নির্বুদ্ধিতার পরিচয় রেখে যাই পথে পথে।
নিঃশ্বাসের চাদরে গুজি লজ্জামুখ,
আত্মদহনে কেটে যায় হিম পবনের রাত
আমি নিজেই নিজেকে সংজ্ঞায়িত করি,
আমি এক ব্যর্থ প্রেমিক!
তিয়াস
নিবেদিতা বড়ুয়া
অচিন পাখিরে খুঁজে খুঁজে এসে গেছি বহুদূর।
তাবৎ নিলামে তুলে ধৈর্যের কাছে চেয়েছি অন্তরদর্শী ভ্রমণ।
জমেছে বুকে কাতর অভিমানের ভরাট যন্ত্রনার,
ক্লান্ত গোধুলি।
ঝুঁকে গেছে তার ঘটে যাওয়া জীবনের ঘ্রাণ।
তবু ফুরায় না আয়ুর প্রহর।
যাপনের গল্পে চড়ে বসে অনিশ্চিত গেরস্থালী।
শেষতক, অসংখ্য বাঁকের ভেতর নির্বাক
স্রোতের বিন্যাসে ধীর পায়ে, এগিয়ে যায়-
শ্বাশত নিলয় কিনার।
এই হিমরাতে গান করে অদৃশ্য এক পালাকার।
বিষণ্নতার চিরকুট
এম আব্দুল হালীম বাচ্চু
সকালের রঙে রং নেই যেন
শীতল ধূসর ক্যানভাস
জানালার ধারে ঝুলে আছে
ক্লান্ত রোদের খসড়া।
চায়ের কাপে কুয়াশা,
ভেতরে তার নীরবতার খেলা,
ঘড়ির কাঁটাও জানিয়ে দেয়
দুঃসংবাদের শিরোনাম!
রাস্তার ছায়ারাও মুখহীন
আয়নার মতো হাঁটে,
শব্দহীন বাতাসেও উড়ে আসে
বিষণ্নতার চিরকুট।
এই সকাল, বুকের ভেতর গড়েছে,
নীরব বিষাদের পাহাড়।
এক ডজন বিষণ্ন প্রণালী
জাকির সেতু
হাতের মুঠোয় তারাগুলো নিয়ে দিব্যি হেঁটে চলা কোহেকাফ
ঝটিকা মিছিলে জ্যোৎস্নার অজস্র শোকবার্তা।
নদী সাক্ষী স্বৈরাচারী মনের।
বাতাসের প্রণয়ে ডুবে যায় ব্যস্ত নগরী
মনের উপত্যকা হেলেঞ্চার অরণ্য।
শূন্যস্থানে শূন্যতা রেখে,
তেপান্তরে বিষণ্নতার দরজা আঁকা আগন্তুক।
বিরহ বুকের ভেতর নদী বয়ে যায়,
যেখানে তোমার নগ্ন পায়ের পদচিহ্ন
বিপর্যয়ের বসন্তকে করে আলিঙ্গন।
ইচ্ছে করে
সুশান্ত হালদার
ইচ্ছে করে
সূর্য্যটাকেই টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে ফেলি ভূ-তলে
ইচ্ছে করে
মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে চলে যাব জিউস ভবনে
অমরত্বের বাটি চুমে আমিও অমর হবো জরাসন্ধ কালে
ইচ্ছে করে
সাগর-নদী সাঁতরিয়ে চলে যাব বাল্টিক সাগরে
যেখানে ঊর্মির দোলাচালে বাজাবো বাঁশি নিরোর মতো করে
একাধারে জ্বলবে আগুন সিসিলি থেকে আর্মেনীয় পাহাড় জুড়ে
ইচ্ছে করে
বাতাসের ঝুঁটি ধরে থামিয়ে দিই মহাপ্রলয় কালে
নূহের ঝড়ে যেন ফিরে আসে ঘুঘু পাখি সবুজ তৃণ মুখে করে
ইচ্ছে করে
কাঁটাতারের ভোর
রেবেকা ইসলাম
আবদ্ধ হয়েছিল ভোরের ব্যালকনি,
কুয়াশার নীরব আলিঙ্গনে।
কাঁটাতারের বেড়ায় বিভক্ত ভোর
নির্লিপ্ত কফির বুদবুদে
অসমাপ্ত কবিতার হিজিবিজি রূপ।
আজকাল কিছুই আর আগের মতো নয়;
চলছে চলুক, যাচ্ছে যাক, হচ্ছে হোক।
মাহেন্দ্রক্ষণে, অতর্কিতে, আবির্ভূত হয়
অপ্রিয়, অনাহূত শব্দেরা।
মন্ত্রমুগ্ধ বিকেলে নেই শাদা বৈভব;
রণপায়ে হেঁটে হেঁটে
সময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
হয়তো এভাবেই একদিন সমাপ্তি ঘটবে
অবিশ্বাসে মোড়া এই জীবনের।



















































