বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশজুড়ে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) তীব্র সংকট সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চল এবং যেখানে প্রাকৃতিক গ্যাসের পাইপলাইন সংযোগ নেই, সেখানে রান্নার একমাত্র ভরসা এই এলপিজি সিলিন্ডার। কিন্তু বাজারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় এবং কৃত্রিম সংকটের মুখে পড়ে ভোক্তারা এখন দিশেহারা। এই সংকট কেবল সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটি নয়, বরং বাজার ব্যবস্থাপনায় চরম বিশৃঙ্খলা ও নজরদারির অভাবকেই প্রকট করে তুলেছে।
খুচরা বাজারে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে এলপিজি বিক্রি হচ্ছে। নির্ধারিত দামের চেয়ে সিলিন্ডার প্রতি দুই থেকে তিনশ টাকা অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ, যারা এমনিতেই নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতিতে হিমশিম খাচ্ছে, তাদের জন্য এই বাড়তি ব্যয় মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক এলাকায় সিলিন্ডার পাওয়ার জন্য হাহাকার সৃষ্টি হয়েছে; ডিলারদের কাছে ধরনা দিয়েও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত গ্যাস। এতে করে দৈনন্দিন রান্নাবান্না ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
এলপিজি সংকটের নেপথ্যে বেশ কিছু কারণ দৃশ্যমান। আমদানিকারকদের দাবি অনুযায়ী, ডলার সংকটের কারণে এলসি (ঋণপত্র) খুলতে দেরি হওয়ায় সময়মতো পণ্য আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দামের অস্থিরতা তো রয়েছেই। তবে সংকটের একটি বড় অংশ মানবসৃষ্ট। অভিযোগ রয়েছে যে, পাইকারি বিক্রেতা ও কিছু অসাধু সিন্ডিকেট মজুদদারি করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। তারা সরকার নির্ধারিত দামকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজস্ব মুনাফা লুটছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) প্রতি মাসে দাম সমন্বয় করলেও মাঠ পর্যায়ে তার বাস্তবায়ন নেই বললেই চলে।
এই সংকটের সময় প্রশাসনের যে ধরনের কঠোর ভূমিকা থাকার কথা ছিল, তা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। মাঝেমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চললেও তা প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য। অসাধু ব্যবসায়ীরা জানে যে, দু-একদিন জরিমানা দিলেও শেষ পর্যন্ত তারা সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিই সাধারণ ভোক্তাকে জিম্মি করে ফেলেছে।
এই অসহনীয় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারকে বহুমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, এলপিজি আজ আর কোনো শৌখিন পণ্য নয়, এটি সাধারণ মানুষের টিকে থাকার আবশ্যিক উপাদান। সংকটের এই আগুনে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ যেন আর না বাড়ে, সেদিকে সরকারকে দ্রুত নজর দিতে হবে। গুটিকয়েক ব্যবসায়ীর মুনাফার কাছে দেশের কোটি কোটি ভোক্তা জিম্মি হয়ে থাকবে—এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমরা আশা করি, সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে এবং ভোক্তাদের এই অসহনীয় ভোগান্তি থেকে মুক্তি দেবে।




















































